আমরা যদি প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবণতার বিরুদ্ধাচারণ করি, প্রকৃতি আমাদের উপর প্রতিশোধ নেবেই। দশকের পর দশক ধরে দেশের বনভূমি ও পাহাড়ে যথেচ্ছাচার চলছে। বিশেষত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাহাড় ও টিলাগুলোতে যত্রততত্র বৃক্ষ নিধন, পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি, পাহাড়ে অবৈধ আবাসন ও অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে এসব এলাকার পাহাড়গুলোকে ঝঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে। এখন পাহাড় ধসের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি জনপদের মানুষ প্রাকৃতিক প্রতিশোধের শিকার হচ্ছে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারে একের পর এক পাহাড় ধসে অন্তত দেড় ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গতকালও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে ৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত উখিয়ার স্থানীয় জনসাধারণ ধ্বসস্তূপ থেকে হতাহতদের উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে পাহাড় ধসে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ক্রমবর্ধমান মৃত্যু ও হতাহতের ঘটনা, অন্যদিকে বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছে মানুষ। সেই সাথে তিস্তা, যমুনাসহ দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানিবৃদ্ধি ও নদী ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। শত শত পরিবার বাস্তুহীন হয়ে পড়ছে। এহেন বাস্তবতায় দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোতে দুর্গত পরিবারগুলোর পুর্নবাসনে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যথেচ্ছ পাহাড় কাাঁ, বনভূমি উজাড় এবং দখলবাজির কারণে গত দুই দশকে ৫৯ হাজার একর বনভূমি বেদখল হয়ে গেছে। এসময় পাহাড় ও ভূমিধসে অন্তত ৩৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে লক্ষাধিক মানুষ এমন মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বসবাস করছে। অন্যদিকে নদীর উজানে বাঁধ দেয়ার কারণে নদীর নাব্য বা পানি ধারণ ক্ষমতা অনেক কমে যাওয়ায় বর্ষার শুরুতেই নদনদীর দুকূল ছাপিয়ে সারাদেশের বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে। অতিবৃষ্টির সাথে সাথে পদ্মা-তিস্তার উজানে ফারাক্কা ও গজলডোবার স্লুইসগেটগুলো খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে আকস্মিক বন্যার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। এতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার ফসলহানি ও নদী ভাঙনে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। দশকের পর দশক ধরে দেশের মানুষ এহেন বাস্তবতার শিকার। এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, অভিন্ন নদীর উপর অবৈধ বাঁধ নির্মাণ, পানি প্রত্যাহার ও আগাম সতর্কতা ছাড়াই যখন তখন বাঁধের পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশে এই দুর্যোগের সৃষ্টি করছে ভারত। যা ভারতের পানি আগ্রাসনেরই উদাহরণ। গত পাঁচ দশকে আমাদের সরকার ভারতের সাথে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি নদী শাসন ও ভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতেও পারেনি। অন্যদিকে বনভূমি ও পাহাড়ের সুরক্ষায়ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সীমাহীন ব্যর্থতা রয়েছে। বন ও পাহাড় সুরক্ষা, নদ-নদীর নাব্য রক্ষা ও পানি বণ্টনে সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রাণহানি ও নদীভাঙনের কবলে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সরকারের সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বিস্তৃত করার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেয়ে পাহাড় ও বনভূমি রক্ষা ও নদীভাঙন রোধে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড় ধসে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রাণহানির ঘটনা মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। লাখ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় শিবিরে পরিণত হওয়া কক্সবাজারের উখিয়া, কুতুপালং, টেকনাফের সুপ্রাচীন প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, সৌন্দর্য, জীব-বৈচিত্র্য ও প্রাণ-প্রকৃতির এই বিপর্যয় অর্থনৈতিক মানদণ্ডে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা শরনার্থী সংকট একটি আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক সংকট। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক মহলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ দশলক্ষাধিক শরনার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। এতবড় জনগোষ্ঠির আশ্রয়, সুরক্ষা, ভরন-পোষণের দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপর বর্তায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্ব একদিকে রোহিঙ্গা সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্নে বিস্ময়কর নিরবতা-নিষ্ক্রিয়তা অবলম্বন করছে, অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দিয়ে তাদের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রাপ্ত অর্থ সহায়তার বড় অংশই এসব দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের ভ্রমণ, অবস্থান ও ভরন-পোষণে ব্যয় হয়ে যায়। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সহায়তার পুরোটা যদি রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়ন এবং প্রতিবেশ-পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যয় করা হতো তাহলে ভূমি ধসের শিকার হয়ে রোহিঙ্গা শিবিরের মানুষ এমন ভয়ঙ্কর প্রাণহানির শিকার হতো না। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন, নজরদারি ও পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে দেশের যেসব স্থানের মানুষ নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যার সম্মুখীন হচ্ছে, সেসব বন্যার্ত ও ভাঙন কবলিত মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। চারদশকের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড বৃষ্টিতে চট্টগ্রাশ শহরসহ নিচু এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। এটি হঠাৎ করেই ঘটেনি। একদশকের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম এই দুর্যোগের শিকার হলেও সরকারের কোনো উদ্যোগই তেমন কাজে আসেনি। নদ-নদী, প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়গুলো সাময়িক কর্মকৌশলের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশের বনাঞ্চল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ পাহাড় ও টিলাবেষ্টিত জনপদগুলোর নিরাপত্তায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। গঙ্গা ব্যারাজ, তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে আর সময় ক্ষেপণের সুযোগ নেই। এসব মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি এই মুহূর্তে সরকারকে পাহাড় ধস ও নদীভাঙন কবলিত এলাকাগুলোতে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
