Thursday, October 15, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে ও পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরবাংলাদেশে ফেলে দেওয়া ইলেকট্রনিক পণ্য বা ই-বর্জ্য থেকে প্রতিবছর সোনা-রুপাসহ প্রায় ৫০...

বাংলাদেশে ফেলে দেওয়া ইলেকট্রনিক পণ্য বা ই-বর্জ্য থেকে প্রতিবছর সোনা-রুপাসহ প্রায় ৫০ কোটি ডলার মূল্যের মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করা সম্ভব: টিআইবির গবেষণা

ফেলে দেওয়া মোবাইল, মাদারবোর্ড আর পুরোনো টিভির স্তূপের ভেতরে লুকিয়ে আছে বিপুল সম্পদ। বাংলাদেশের ই-বর্জ্য থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০ কোটি ডলার মূল্যের মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার সম্ভব। কিন্তু বর্জ্য সংগ্রহের দুর্বল ব্যবস্থা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের সীমিত সক্ষমতায় এর বড় অংশই নষ্ট হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য।

বুয়েটের মাধ্যমে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালিত পৃথক এক গবেষণা বলছে, দেশে উৎপন্ন ই-বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশই আনুষ্ঠানিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের বাইরে থেকে যায়। ২০১৭ সালের ওই হিসাবে মাত্র ৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি হতো। ফলে বিপজ্জনক বর্জ্যের পাশাপাশি সোনা, রুপা, তামা ও টিনের মতো ধাতুও উদ্ধার হচ্ছিল না।

বুয়েটের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের গবেষণায় দেখা গেছে, এক টন পরিত্যক্ত র‍্যাম থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ গ্রাম সোনা মেলে। পরীক্ষাগারে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ই-বর্জ্য থেকে ৯৯ শতাংশের বেশি তামা, ৯৪ শতাংশের বেশি রুপা ও প্রায় ৮৬ শতাংশ টিন পুনরুদ্ধার করা যায়। তবে বড় পরিসরে এ কাজের প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি।

২০১৮ সালে দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছিল, প্রতিবছর যা বাড়ছে প্রায় ২০ শতাংশ হারে। বুয়েটের পূর্বাভাস, ২০৩৫ সাল নাগাদ বছরে ই-বর্জ্য দাঁড়াবে ৪৬ লাখ ২০ হাজার টনে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যে সারা দেশে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক ই-বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র ১৬টি; ১৪টি ঢাকা ও আশপাশে, দুটি চট্টগ্রামে। সাভারের জেআর রিসাইক্লিং সলিউশনের মালিক এম এ হোসেন বলেন, পরিবেশবিধি মেনে একটি কারখানা গড়তে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা লাগে, সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রায় ২২টি লাইসেন্স ও অনুমোদন। তাঁর কারখানায় তামা, পিতলসহ নানা ধাতু উদ্ধার হয়, কিন্তু সোনা নয়। তাঁর ভাষ্য, ‘সোনা পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তি অত্যন্ত ব্যয়বহুল, অন্তত ৫০০ কোটি টাকা লাগবে, যা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’ সে কারণেই জাপান ও কোরিয়ায় মাদারবোর্ড রপ্তানি করা হয়।

তাঁর হিসাবে, ঢাকা ও আশপাশের নিয়মমাফিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ই-বর্জ্যের মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে। বাকিটা যায় শত শত অনানুষ্ঠানিক কারখানায়, যেখানে শ্রমিকেরা যন্ত্রাংশ খুলে অ্যাসিড ব্যবহার ও তার পুড়িয়ে ধাতু বের করেন।

এদিকে ওয়ালটন গ্রুপের মোস্তাফিজুর রহমান রাজু  জানান, সারা দেশে ৭০০ প্লাজা আউটলেটে এক্সচেঞ্জ অফারের মাধ্যমে পুরোনো পণ্য সংগ্রহ করা হয়। সেগুলো কারখানায় প্লাস্টিক ও ধাতব অংশে আলাদা করে বিশেষায়িত পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কারখানায় পাঠানো হয়। ২০২৫ সালে এসি, টিভি ও ফ্রিজসহ ৬৬ হাজার ৭২২টি পণ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

নিজেদের বর্জ্যই সামলাতে হিমশিম, তার মধ্যে বিদেশ থেকে আসছে নিষিদ্ধ ই-বর্জ্য। টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে প্রায় ৭ লাখ ডলার ব্যয়ে ১৪ হাজার ৯৮৫ টন ই-বর্জ্য আমদানি হয়েছে, অথচ বিধিমালা ও আমদানি নীতিতে তা নিষিদ্ধ। এর প্রায় ২৭ শতাংশ বস্ত্র ও পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট; অনেক সময় বস্ত্রকলের যন্ত্রাংশ ঘোষণা দিয়ে আনা হয়।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ আল আমিন টিবিএসকে বলেন, এসআরওর আওতায় স্ক্র্যাপ আমদানি নিষিদ্ধ নয়, তাই স্ক্র্যাপ ঘোষণায় আসা চালানে ই-বর্জ্য শনাক্ত কঠিন। তবে ভুল বা বিভ্রান্তিকর বিবরণে আসা চালান আটকাতে কর্মকর্তারা সতর্ক আছেন। টিআইবি উন্নত স্ক্যানিং যন্ত্র ও কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে। একই সময়ে দেশ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৪০ টন পিসিবি স্ক্র্যাপ ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ রপ্তানি হয়েছে। নথিভুক্ত তথ্যে রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি।

অনানুষ্ঠানিক খাতে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে, ভাগাড়েও বর্জ্য কম জমছে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ছাড়াই বিপজ্জনক পদ্ধতিতে কাজ করছে। প্রধান কেন্দ্রগুলো ঢাকার নিমতলী, এলিফ্যান্ট রোড, মোহাম্মদপুর, টঙ্গী এবং চট্টগ্রামের আইস ফ্যাক্টরি রোড।

টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকেরা কোনো সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই কাজ করেন। এতে শ্রমিক ও আশপাশের বাসিন্দারা বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বুয়েটের মূল্যায়নে বাতাসে ক্রোমিয়াম ও সিসার কারণে শ্রমিকদের ক্যানসার ও ক্যানসারবহির্ভূত রোগের ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি। স্ক্র্যাপ কেন্দ্রের আশপাশের পানিতে সিসাদূষণ শিশুসহ বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি। খোলা জায়গায় ই-বর্জ্য পোড়ালে ডাই-অক্সিন ও ফিউরান ছড়ায়, আর সিসা, ক্রোমিয়াম, পারদ ও ক্যাডমিয়াম মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে মাছ, গবাদিপশু ও কৃষিপণ্যের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলেও ঢুকতে পারে।

২০২১ সালে ‘বিপজ্জনক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ হয়েছে। বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) নীতিতে উৎপাদক, আমদানিকারক ও পরিবেশকদের দায় রাখা হয়েছে। সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা প্রথম বছরে ১০ শতাংশ, পঞ্চম বছরে ৫০ শতাংশ। কিন্তু টিআইবি বলছে, কোনো উৎপাদক, আমদানিকারক বা পরিবেশক পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধনই করেনি। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক যান ও ব্যাটারির নতুন বর্জ্যও বিধিমালায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়। টিআইবির নাবিল হক তাই সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের অভিযোগ, সরকার এখনো ই-বর্জ্যের পরিমাণ ও ধরন নিয়ে নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়তে পারেনি এবং লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন ও নিষিদ্ধ আমদানি বন্ধেও ব্যর্থ হয়েছে।

ইউএন এসকাপ প্রস্তাব দিয়েছে, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের ব্যয় বহন করবেন উৎপাদক ও আমদানিকারকেরা, আর আনুষ্ঠানিক সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের দেওয়া হবে ভর্তুকি ও প্রণোদনা। লক্ষ্য ‘দূষণকারীই ব্যয় বহন করবে’ নীতি কার্যকর করা। টিআইবি দিয়েছে ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা: বিধিমালা সংস্কার, জাতীয় তথ্যভান্ডার, উৎপাদকের দায়বদ্ধতা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের মূলধারায় আনা, কাস্টমসের নজরদারি ও সংস্থাগুলোর সমন্বয়। অনানুষ্ঠানিক সংগ্রহব্যবস্থা ভেঙে না দিয়ে তাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার সুপারিশও আছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) মো. মাহবুব জামিল জানান, বিপজ্জনক বর্জ্য পর্যবেক্ষণে জাতীয় কমিটি গঠন হয়েছে। যৌথ তদারকি দল ঢাকা ও আশপাশে পরিদর্শন শুরু করেছে, নমুনা সংগ্রহ ও বিধিপালন যাচাই চলছে। শেষে সুপারিশসহ সমন্বিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

স্তূপের নিচে সোনা আছে, কিন্তু তা তোলার আগেই বিষ ছড়াচ্ছে বাতাসে, মাটিতে, মানুষের শরীরে। প্রশ্ন, এই গুপ্তধন কি দেশের কাজে লাগবে, নাকি বর্জ্যের পাহাড়ই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ?

সূত্রঃ টিবিএস 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

10 − seven =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য