যুব সমাজ একটি জাতির প্রাণশক্তি। আজকের যুবকরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে মাদকাসক্তি, অশ্লীলতা, বেপরোয়া চলাফেরা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার, ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপরাধ প্রবণতা ইত্যাদি সমাজকে ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় সমাজকে রক্ষা করতে যুব সমাজকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম যুবকদেরকে শুধু ইবাদতের দিকনির্দেশনাই দেয়নি; বরং চরিত্র গঠন, সমাজ সংস্কার এবং মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের শিক্ষা দিয়েছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের কারণসমূহ : সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে নানা কারণ রয়েছে। যেমন, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব। মাদক ও নেশা। অশ্লীল সংস্কৃতির বিস্তার। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার। বেকারত্ব ও হতাশা। পরিবারে ইসলামী পরিবেশের অভাব। অসৎ সঙ্গ। নৈতিক শিক্ষার সংকট। আল্লাহ তাআলা বলেন : প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতার নিকটেও যেও না। (সূরা আল-আন‘আম : ১৫১)।
সামাজিক অবক্ষয় রোধে যুব সমাজের করণীয় : ১. ঈমান ও তাকওয়া অর্জন করা। সামাজিক অবক্ষয় রোধের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহভীতি। ইসলাম আমাদেরকে আল্লাহভীতির প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নির্দেশনা দিয়েছে। এ আল্লাহভীতিই মানুষকে গুনাহ ও অপরাধ থেকে বিরত রাখার অন্যতম মাধ্যম। একজন মানুষ যখন আল্লাহকে ভয় করবে, তখন সে অন্যায় ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতে পারবে না। অনুরূপভাবে একজন যুবক যখন আল্লাহকে ভয় করবে, তখন সে অন্যায়, অশ্লীলতা ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন : নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই অধিক মর্যাদাবান, যে অধিক তাকওয়াবান। (সূরা আল-হুজুরাত : ১৩)।
হাদিসে এসেছে : সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ আরশের ছায়া দান করবেন। তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতে বেড়ে উঠেছে। (সহীহ বোখারী, হাদিস : ৬৬০; সহীহ মুসলিম, হাদিস : ১০৩১)।
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত প্রতিষ্ঠা করা : নামাজ মানুষের গুনাহ থেকে মুক্তির অন্যতম মাধ্যম এবং গুনাহ ও মানুষের মধ্যে ঢালস্বরূপ। নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। একজন মানুষ যখন নিয়মিত নামাজ আদায় করে, তখন সে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার শক্তি অর্জন করে। এটিই নামাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে, নামাজ মানুষকে পাপাচার থেকে দূরে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন : নিশ্চয় সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। (সূরা আল-আনকাবূত : ৪৫)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমআ থেকে আরেক জুমআ এবং এক রমযান থেকে আরেক রমযান মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যায়, যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৩)।
৩. কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন করা : ইসলামী জ্ঞানের অভাবে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। তাই যুবকদের উচিত ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া। নিয়মিত নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, জিকির-আজকার, দুআ-দরুদ, তসবিহ-তাহলিল পাঠ করা, হাদিস অধ্যয়ন করা এবং হক্কানী ওলামায়ে কেরামের সাহচর্য গ্রহণ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়। (সহীহ মুসলিম, হাদিস : ৫০২৭)।
৪. অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করা : ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’ কথাটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। বন্ধুত্ব মানুষকে ভালো পথ দেখায়, আবার বন্ধুত্বই মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। খারাপ বন্ধু মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, আর ভালো বন্ধু মানুষকে নেক পথে পরিচালিত করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে। সুতরাং সে যেন লক্ষ্য করে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে। (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৮)।
৫. মাদক ও নেশা থেকে দূরে থাকা : মাদক সমাজ ধ্বংসের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে যুব সমাজকে বিপথগামী করতে মাদক অত্যন্ত ভয়াবহ ভূমিকা পালন করছে। ইসলাম সব ধরনের মাদকদ্রব্য ও নেশাজাতীয় বস্তু হারাম ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তুই মদ, আর প্রত্যেক মদই হারাম। (সহীহ মুসলিম, হাদিস : ২০০৩)। যুব সমাজকে মাদকবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে হবে এবং অন্যদেরও সচেতন করতে হবে।
৬. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার : বর্তমানে অনেক যুবক ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ইত্যাদির অপব্যবহারের মাধ্যমে সময় নষ্ট করছে এবং অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে অনেকেই বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে যাচ্ছে, যা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই প্রযুক্তিকে কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন : মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য প্রহরী প্রস্তুত রয়েছে। (সূরা ক্বাফ : ১৮)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে। (সহীহ বুখারী, হাদিস : ৬০১৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস : ৪৭)।
৭. পিতা-মাতা ও শিক্ষকদের সম্মান করা : পরিবার থেকেই নৈতিকতার শিক্ষা শুরু হয়। যে পরিবার নৈতিকতার দিক থেকে উন্নত, সে পরিবারের সন্তানরাও আচার-আচরণ ও নৈতিকতায় উন্নত হয়ে থাকে। এজন্য পরিবারেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার হাতেখড়ি হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যুবকদের উচিত পিতা-মাতার আনুগত্য করা এবং শিক্ষকদের সম্মান করা। তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন : পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। (সূরা আল-বাকারা : ৮৩)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৮৯৯)।
৮. সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা : সমাজসেবামূলক কাজ মানুষকে জনকল্যাণমূলক কর্মকা-ে উৎসাহিত করে। তাই যুবকদের উচিত অসহায় মানুষের সাহায্য করা, শিক্ষা বিস্তার করা, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা, রক্তদান করা, দ্বীনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা এবং বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে এগিয়ে আসা। রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেছেন : মানুষের মধ্যে সেই উত্তম, যে মানুষের উপকার করে। (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৫৭৮৭)।
৯. চরিত্র গঠন ও লজ্জাশীলতা অর্জন করা : চরিত্র একজন মানুষকে সমাজের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। এজন্য বলা হয়— যার চরিত্র সুন্দর, তার সবকিছুই সুন্দর। চরিত্রবান মানুষকে সবাই সম্মান করে, আর চরিত্রহীনতা সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। ইসলামে উত্তম চরিত্রকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন : তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার চরিত্র উত্তম। (সহীহ বুখারী, হাদিস : ৩৫৫৯)। আরও এসেছে : লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ। (সহীহ বুখারী, হাদিস : ২৪)।
১০. সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করা : সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত। সময় চলে গেলে তা আর কখনো ফিরে আসে না। তাই সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। যারা সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে, তারাই সফল হয়েছে। যুব বয়স আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। এ সময়কে ইবাদত, জ্ঞান অর্জন ও সমাজকল্যাণে ব্যয় করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : দুইটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত— সুস্থতা ও অবসর সময়। (সহীহ বুখারী, হাদিস : ৬৪১২)। যুব সমাজের আদর্শ : সাহাবায়ে কেরাম ইসলামের ইতিহাসে যুবকদের ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে ওমাইর, ওসামা ইবনে যায়িদ প্রমুখ সাহাবীগণ যুব বয়সেই ইসলামের জন্য অসাধারণ অবদান রেখেছেন। বর্তমান যুব সমাজ তাদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করলে সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে। সমাজ বসবাসের উপযোগী ও সুন্দর হবে এবং সমাজ থেকে অন্যায়, অশ্লীলতা দূর হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
উপসংহার : সামাজিক অবক্ষয় একটি ভয়াবহ ব্যাধি। এটি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে যুব সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী ঈমান, তাকওয়া, সালাত, উত্তম চরিত্র, নৈতিকতা, সমাজসেবা এবং আদর্শ জীবনাচরণের মাধ্যমে যুবকরা একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে পারে। আজ প্রয়োজন যুব সমাজকে কুরআনমুখী, মসজিদমুখী এবং নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। কারণ আদর্শ যুবকরাই পারে একটি আদর্শ সমাজ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠন করতে। আল্লাহ তাআলা আমাদের যুব সমাজকে ইসলামের সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
