গত মাসের শেষে দুবাই বন্দরে একটি বিশাল কুয়েতি তেলবাহী জাহাজ ইরানের ড্রোন হামলায় আগুনে পুড়ে গেছে—এমন খবর বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়। যদি আল সালমি জাহাজটির দুই মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালীতে ছড়িয়ে পড়ত, তবে পরিবেশের ওপর কী ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারত এটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
শেষ পর্যন্ত, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং কোনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় তেল ছড়ায়নি। জাহাজটির ২৪ জন ক্রু সদস্যও অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন। তবুও, এটি ছিল চলমান যুদ্ধে তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হামলা। আরেকটি কারণে এটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, আর সেটি হলো এতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঘটনা ঘটলেও, জাহাজটিতে আগুন লাগার প্রায় কোনো ভিডিও ফুটেজই সামনে আসেনি।
যখন সব জায়গায় থাকা কোনো না কোনো ক্যামেরার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মিসাইল ও ড্রোন হামলার তাৎক্ষণিক ভিডিও প্রমাণ পাওয়া যায়, তখন আল সালমি সম্পর্কে প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র একটি দীর্ঘ লেন্সে তোলা সংবাদ সংস্থার ছবি, যেখানে পানির ওপর ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। পরে কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির একটি ছবি প্রকাশ করে—তাও আগুন সম্পূর্ণ নিভে যাওয়ার পর।

এটা দুবাইয়ের মতো একটি জায়গার ক্ষেত্রে বেশ বিস্ময়কর, যেটি উদারপন্থী হিসেবে উপস্থাপনকারী রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে জনবহুল শহর। মধ্যপ্রাচ্যের ভোগবিলাসের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত এই শহরে প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ বাস করে, যারা নিউ ইয়র্ক ও লাস ভেগাসের মাঝামাঝি এক রোদেলা জীবনযাপন উপভোগ করে—যা ধনী ও প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে নিয়মিত প্রচারিত হয়।
বহু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যুরো থাকা সত্ত্বেও এমন ফুটেজ স্বল্পতা আরও রহস্যজনক মনে হয়। বাস্তবতা হলো, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত তার প্রকৃত কর্তৃত্ববাদী চরিত্র প্রকাশ করছে, যেখানে সরকার সংঘাত সম্পর্কিত তথ্য নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং মিসাইল ও ড্রোন হামলা এবং তার পরিণতি সংক্রান্ত ছবি শেয়ারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বিশেষ করে দুবাইয়ের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটি আরও গভীর, যেখানে তরুণ, ধনী ও গ্ল্যামারাস ইনফ্লুয়েন্সাররা শহরটিকে “বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শহর” হিসেবে প্রচার করে আসছিল—আর সেই সময়েই হাজার হাজার বিদেশি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল।
১২ মার্চ দুবাইয়ের ক্রিক হারবারের একটি আবাসিক টাওয়ারে ইরানি ড্রোন আঘাত হানার পর, নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির ছবি আত্মীয়স্বজনকে ব্যক্তিগত বার্তায় পাঠানোর কারণে তিনজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন। এর কয়েকদিন আগেই, একটি ব্যক্তিগত গ্রুপ মেসেজে হামলার খবর শেয়ার করার জন্য ২১ জনকে আটক করা হয়। এমনকি এই কাজগুলোকেও অস্পষ্ট সাইবার অপরাধ আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই আইনের অধীনে অপরাধীদের শাস্তি হিসেবে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ দিরহাম পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে, যার মূল্য বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬,৭০,০০০ থেকে ৬৬,৯৬,০০ টাকা।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার হওয়া “শত শত” সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা কেবল কয়েকজন বলে জানান রাধা স্টার্লিং, যিনি ডিটেইন্ড ইন দুবাই সংস্থার সিইও। উল্লেখ্য, এই সংস্থাটি সংকটে পড়া বিদেশিদের আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করে।
স্টার্লিং জানান, নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রাস্তায় মানুষকে থামিয়ে তাদের স্মার্টফোন পরীক্ষা করতে জোর করেন, এমনকি কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বাড়িতে গিয়েও একই কাজ করেছে তারা। তিনি বলেন, “আইন প্রয়োগের এই পদ্ধতি অত্যন্ত বিস্তৃত এবং কঠোর।”
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল শামসি এই দমন-পীড়নকে সমর্থন করে বলেন, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করলে আতঙ্ক ছড়াতে পারে এবং দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।” তবে কেন স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরাও এর লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন, তা অস্পষ্ট। সূত্রগুলো টাইম ম্যাগাজিনকে জানিয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে শুধু নিজেদের কাজ করার কারণেই কয়েকদিন ধরে আটক রাখা হয়েছে।
কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস-এর আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, “সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত সাংবাদিকরা তাকে গোপনে জানিয়েছেন যে তাদের ওপর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে – কী ঘটছে সে বিষয়ে কিছু প্রকাশ করা বা কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা নিষিদ্ধ।”
লিজ নেওয়া ল্যাম্বরগিনি, ২৪ ঘণ্টার পুল পার্টির জৌলুস ও ইনফ্লুয়েন্সারদের চটকদার কন্টেন্টের মাধ্যমে “গ্লোবাল সাউথ”-এর রাজধানী হিসেবে দুবাইকে উপস্থাপনের এক আকর্ষণীয় মরীচিকা তৈরি করছে কর্তৃপক্ষ। তবে এতকিছুর পরেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারের স্বৈরাচারী চরিত্র কখনোই পুরোপুরি আড়ালে থাকতে পারেনি।
(প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে টাইম এ প্রকাশিত চার্লি ক্যাম্পবেলের লেখা How the Iran War Cracked Dubai’s Liberal Facade শিরোনামের আর্টিকেল থেকে। তবে চার্লি ক্যাম্পবেলের ব্যক্তিগত মতাদর্শ দ্বারা বাংলায় লেখা এই প্রবন্ধটি অথবা তার লেখক প্রভাবিত নন।)
