সবার জন্য কোডিং শিক্ষা! কিংবা ক্লাস ওয়ান থেকে প্রোগ্রামিং শিখানো!
বাংলাদেশের স্কুল লেভেলে নানা রকমের এক্সপেরিমেন্ট চলতে থাকে। আজ কারো মনে হলো যে অমুক জিনিষটা ট্রেন্ডি! ব্যস, কাল থেকে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর উপরে সেটা চাপানো হয়।
ইদানিংকালের হুজুগ — সবাইকে কম্পিউটার বিশারদ হতে হবে। তাই স্কুলের একেবারে নিচের লেভেল থেকে তাদের গিলাতে হবে প্রোগ্রামিং এবং “কম্পিউটেশনাল থিংকিং”।
যেন সবাই হবে প্রোগ্রামার, অ্যাপ ডেভেলপার, আর নানা “বিষ্ময় বালক”দের মতো তারা যেন হবে বিল গেইটস।
Stop! আসেন একবার মগজটাকে জাগিয়ে তুলে একটু ভাবি।
সবাইকে কেনো প্রোগ্রামার হতে হবে?
দুনিয়াতে চলার জন্য কম্পিউটার আর সব যন্ত্রের মতোই একটা সহায়ক যন্ত্র মাত্র। অধিকাংশ মানুষ তাদের পড়াশোনা, কাজ, বা ব্যবসার কাজে কম্পিউটার ব্যবহার করবে বটে, কিন্তু সেটা নানা অ্যাপ বা সফটওয়ারের ইউজার হিসাবে।
প্রোগ্রামিং শিখে সফটওয়ার বানানোর জ্ঞান সবার জানার দরকার হয় না। আর সফটওয়ার বানাবার জন্য কোটি কোটি প্রোগ্রামারও লাগে না।
তাহলে কীজন্য স্কুলের বাচ্চাদের মাথা খারাপ করে তাদের উপরে স্কুলের নিচের ক্লাস থেকে প্রোগ্রামিং শিখার চাপ দিতে হবে?
এতে করে কি কোটি কোটি প্রোগ্রামার তৈরী হবে?
না।
বরং এতে করে যে ছেলেটা প্রোগ্রামিং শিখতে চায়নি, যে মেয়েটা হবে না কোনোদিন পাইথন প্রোগ্রামার, তাঁকেও অযথা এই আতংকের ভিতর দিয়ে যেতে হচ্ছে।
আমি শিক্ষক হিসাবে বুঝি, প্রোগ্রামিং করা সবার কাজ না। এর জন্য যে ধরণের অ্যানালিটিকাল স্কিল লাগে তা সবার নাই এবং জীবনে চলার পথে সফল হতে হলে সেই স্কিল অপরিহার্য না।
কিন্তু ধরেন, প্রোগ্রামার তৈরী করা? সেটা হলে তো দেশ রাতারাতি সফটওয়ার বেচে বড়লোক হয়ে যাবে। কেনো “উন্নয়ন” এর বিরোধিতা করছি?
ঘটনা হলো — প্রোগ্রামিং এর জগতটা গত ১ বছরে ব্যাপক পাল্টে গেছে। ChatGPT এর মতো জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এসে মামুলি ধরনের কোডিং এর কাজকে স্বয়ংক্রিয় করে ফেলেছে।
তাই এন্ট্রি লেভেলের প্রোগ্রামারদের আসলে আর দরকারই নাই। সফটওয়ার ইন্ডাস্ট্রিতে শুরুর দিকের কোডিং এর যেসব কাজ ছিলো, তার প্রায় সবটাই এআই দিয়ে করা যাবে অচিরেই। প্রোগ্রামিং এর জন্য দরকার হবে কেবল অল্প কিছু হাই স্কিল্ড এআই ডেভেলপারের।
কিন্তু — কম্পিউটেশনাল থিংকিং? সেটা লাগবে না? টেকনলজি ব্যবহার করার, কিংবা জীবনের দৈনন্দিন কাজে অ্যানালিটিকাল স্কিল দিয়ে ফাটিয়ে ফেলা?
না। সেটার জন্যও পাইথন কোডিং বা সর্টিং অ্যালগরিদম শেখার দরকার নাই।
অধিকাংশ আমজনতার জন্য দৈনন্দিন কাজে এগুলো শেখার দরকার তো নাইই বটে।
কিন্তু নানা বিজ্ঞানী, অ্যানালিস্ট এমন লোকজন? তাদের কাজের ডেটা অ্যানালাইসিস করবে কে?
কেনো? চ্যাটজিপিটি বা গুগলের বার্ড আছে কী করতে? এসব এআই টুলের দক্ষতা এক্সপোনেনশিয়ালি বাড়ছে। সেদিন আমার এক সহকর্মীর কাছে এমন Large language model এর একটা প্রেজেন্টেশন দেখলাম। গত দেড় দুই বছরে এসব টুল বিশাল উন্নতি করেছে। সফটওয়ার ডেভেলপার বাদে বাকিরা কম্পিউটার দিয়ে যা কাজ করে তার সবই এসব এআই দিয়ে করা যায় বা অচিরেই যাবে।
তাহলে ব্যাপারটা কী হচ্ছে? উদাহরণ দেই — লগারিদম বা এমন অনেক গাণিতিক বিষয়ের জন্ম হয়েছিল বড় বড় অংক করতে সাহায্য করতে। এক সময়ে হিসাব মানেই ছিল লগ টেবিল আর স্লাইড রুল দিয়ে কাজ করা। প্রকৌশলী বা অ্যাকাউন্টান্ট সবাইকেই শিখতে হতো এদের ব্যবহার।
কিন্তু এখন? সবশেষ কবে আপনি বড় সংখ্যার হিসাব হাতে করেছেন? মনে করতে পারবেন না তাই না? কারন এখন এগুলো হাতে করা লাগে না। করার জন্য ক্যালকুলেটর আছে।
এভাবেই ট্র্যাডিশনাল প্রোগ্রামিং স্কিল আর দরকার হবে না। আম জনতার সবাইকে প্রোগ্রামার হতে হবে না। কম্পিউটার দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়ার মতো টুল ব্যবহার তরলেই চলবে। হ্যা, অল্প কিছু প্রোগ্রামার লাগবে বটে কিন্তু তারা হবে বিশেষজ্ঞ তাদের কাজে। এআই টুল ডেভেলপ করা কিংবা টিউন করবে তারা।
কিন্তু অংকে কোনোমতে পাশ করা, বিজ্ঞান মাথায় না ঢোকা সেই শিশুদের জোর করে কোডিং শিখানোর কোনো দরকার হবে না। কারণ বাংলা ব্যকরণের ণ-ত্ব বিধান বা মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাসের মতোই, এন্ট্রি লেভেলের কোডিং বিদ্যা হলো অচল, অবসোলিট, এবং শিশুদের জন্য আতংক।
তাই আশা করি, স্কুলের নিচের ক্লাস থেকে প্রোগ্রামিং শিখানোর যে জোয়ার এসেছিল, যার কারণে গ্রামের মফস্বলের বা শহরের সবাইকে প্রোগ্রামার বানানোর শিক্ষা জোর করে দেয়া হচ্ছিলো, তার অবসান হবে।
বরং তার বদলে ভাষা, বিজ্ঞান, গণিত, নৈতিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধ — এসব চিরন্তন বিষয়ের দিকে জোর দেয়া হবে আবার।
দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সেটারই দরকার বেশি এখন।
