প্রশ্ন: আমরা বিভিন্ন ইসলামি আলোচনা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়ে থাকি। পোস্টগুলো অনেক শেয়ার হয়। আমাদের মৃত্যুর পরও যদি এসব ইসলামিক পোস্ট শেয়ার হতেই থাকে তাহলে তার বিনিময়ে আল্লাহ কি আমাদেরকে সওয়াব দিবেন?
উত্তর:
নিঃসন্দেহে বর্তমান যুগে ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ, ওয়েবসাইট ইত্যাদি অনলাইন ভিত্তিক প্লাটফর্ম সামাজিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্ঞানার্জন, সচেতনতা সৃষ্টি, প্রচার-প্রসার এবং গণ মানুষের কাছে যেকোনো বার্তা খুব সহজে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে পৌঁছে দেয়ার অত্যাধুনিক শক্তিশালী মাধ্যম। এটি এতটা সহজলভ্য যে, এখানে কোন লেখা, ভিডিও ইত্যাদি প্রকাশ করা হলে পাঠক বা দর্শকরা তা খুব সহজেই কপি-পেস্ট বা শেয়ার করে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারে। সেখান থেকে আবার মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এভাবে অবিরামভাবে এই ধারাবাহিকতা চলতেই থাকে।
এমনও হয় প্রথম ইসলামি লেখা বা ইসলামি আলোচনা সম্বলিত ভিডিও প্রকাশকারী ব্যক্তি দুনিয়াতে বেঁচে নেই কিন্তু তার লেখা, ভিডিও বা ইসলামি পোস্ট লক্ষ-লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে এবং তারা নানাভাবে সেখান থেকে উপকৃত হচ্ছে।
সুতরাং এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশাল দাওয়াতি কাজ। প্রথম পোস্ট কারী ব্যক্তি যদি ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিয়তে পোস্ট করে থাকে তাহলে এর মাধ্যমে যত মানুষ উপকৃত হবে সে তাদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে এবং এই ধারাবাহিকতা যতদিন পর্যন্ত নেট জগতে চালু থাকবে ততদিন পর্যন্ত এর সওয়াব তার আমলনামায় পৌঁছতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ سَنَّ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةً حَسَنَةً فَعُمِلَ بِهَا بَعْدَهُ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِ مَنْ عَمِلَ بِهَا وَلاَ يَنْقُصُ مِنْ أُجُورِهِمْ شَىْءٌ
“যে ব্যক্তি ইসলামে কোন ভাল রীতির প্রচলন করবে এবং পরবর্তীকালে সে অনুযায়ী আমল করা হয় তাহলে আমল কারীর সাওয়াবের সমপরিমাণ সাওয়াব তার জন্য লিপিবদ্ধ করা হবে। এতে তাদের সাওয়াবের কোন রূপ ঘাটতি হবে না।” [সহিহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৯/ ইলম (كتاب العلم), যে ব্যক্তি কোন ভাল রীতি কিংবা মন্দ রীতি প্রচলন করে এবং যে ব্যক্তি সত্যপথের দিকে আহ্বান করে কিংবা ভ্রান্তির দিকে ডাকে]
❑ সোশ্যাল মিডিয়ায় দাওয়াতি কাজে নিয়তের পরিশুদ্ধতার অপরিহার্যতা:
আমরা জানলাম যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দাওয়াহ কার্যক্রম একটি সদকায়ে জারিয়া (প্রবহমান নেকির কাজ)। কিন্তু এর জন্য শর্ত রয়েছে। আর তা হল, এ কাজ করতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দীন প্রচারের স্বার্থে। কেবল লাইক-শেয়ার পাওয়া, প্রসিদ্ধ অর্জন, মানুষে প্রশংসা কুড়ানো অথবা এর মাধ্যমে কিছু অর্থকড়ি ও দুনিয়াবি স্বার্থ সিদ্ধির নিয়ত থাকলে তা নেকির পরিবর্তে গুনাহের কারণে পরিণত হবে। কারণ দীনের ক্ষেত্রে রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা ছোট শিরক হিসেবে পরিগণিত।
হাদিসে এসেছে, মাহমুদ ইবনে লাবিদ রা. বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ», قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ: «الرِّيَاءُ، يَقُولُ اللَّهُ -عَزَّ وَجَلَّ- لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ – إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ-: اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً »
“আমি তোমাদের ওপর যা ভয় করি তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে শিরকে আসগর (ছোট শিরক)। তারা বলল: হে আল্লাহর রসূল শিরকে আসগর (ছোট শিরক) কি?
তিনি বললেন: “রিয়া (লোক দেখানো আমল)। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাদেরকে (রিয়াকারীদের) বলবেন, যখন মানুষকে তাদের আমলের বিনিময় দেয়া হবে: তোমরা তাদের কাছে যাও যাদেরকে তোমরা দুনিয়াতে দেখাতে, দেখ তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কি না”। [মুসনাদে আহমদ-সহিহ]
অন্য হাদিসে এসেছে,
مَن عَمِلَ عَمَلًا أشْرَكَ فيه مَعِي غيرِي، تَرَكْتُهُ وشِرْكَهُ
“যে ব্যক্তি কোন একটি আমল করল এবং তাতে সে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করল আমি তাকে ও তার আমলকে প্রত্যাখ্যান করি।” (সহিহ মুসলিম)
❑ সোশ্যাল মিডিয়া কিভাবে ‘গুনাহে জারিয়া’য় পরিণত হয়?
কেউ যদি এসকল সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে নোংরামি, অশ্লীলতা, পাপাচার, ভ্রষ্টতা, শিরক, বিদআত, নাস্তিকতা, কুসংস্কার, মানুষকে গালাগালি, অভিসম্পাত, মিথ্যাচার, বদনাম, অপপ্রচার, গিবত-পরচর্চা, মানুষের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর কোন বিষয় প্রচার করে তাহলেও যতদিন পর্যন্ত নেট জগতে এগুলো বিদ্যমান থাকবে এবং যত মানুষ এখান থেকে প্রভাবিত হয়ে গুনাহ কামাবে সে মারা গেলেও তার আমলনামায় তা গুনাহে জারিয়া (প্রবাহমান গুনাহ) হিসেবে এই গুনাহের অংশ জমা হতেই থাকবে। আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করুন। আমিন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ سَنَّ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةً سَيِّئَةً فَعُمِلَ بِهَا بَعْدَهُ كُتِبَ عَلَيْهِ مِثْلُ وِزْرِ مَنْ عَمِلَ بِهَا وَلاَ يَنْقُصُ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَىْءٌ
“আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন কুরীতির (মন্দ কাজের) প্রচলন করবে এবং তারপরে সে অনুযায়ী আমল করা হয় তাহলে ঐ আমলকারীর মন্দ ফলের সমপরিমাণ গুনাহ তার জন্য লিপিবদ্ধ করা হবে। এতে তাদের গুনাহ কিছুমাত্র হ্রাস হবে না।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৯/ ইলম (كتاب العلم), যে ব্যক্তি কোন ভাল রীতি কিংবা মন্দ রীতি প্রচলন করে এবং যে ব্যক্তি সত্যপথের দিকে আহ্বান করে কিংবা ভ্রান্তির দিকে ডাকে]
সুতরাং এই সোশ্যাল বা অনলাইন ভিত্তিক মিডিয়া ব্যবহারে আমাদের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করে সতর্কতার সাথে দাওয়াতি কাজ করা এবং সব ধরণের ক্ষতিকর ও ইসলাম বিরোধী প্রচারণা থেকে সংযত হওয়া জরুরি। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
——————-
➧ আরও পড়ুন:
◈ মোবাইল, ফেসবুক, ইন্টারনেট ইত্যাদি ব্যবহারে ইসলামী নির্দেশনা
https://www.facebook.com/Guidance2TheRightPath/posts/738613009891580
◈ ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ ব্যবহারের ইসলামি নির্দেশনা: যা জানা জরুরি সকলের
https://www.facebook.com/Guidance2TheRightPath/posts/981428592276686
◈ টিকটক ব্যবহারের বিধান এবং তার সঠিক পদ্ধতি:
https://www.facebook.com/Guidance2TheRightPath/posts/1137634763322734
◈ ফেসবুক ও নেট দুনিয়ায় ভুল হাদিস প্রচারের ভয়াবহতা
https://www.facebook.com/Guidance2TheRightPath/posts/907809669638579
◈ ফেসবুকে ইসলামী পোস্ট দিয়ে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার পাওয়ার আশা করা কি সওয়াবকে বরবাদ করে দেয়?
https://www.facebook.com/Guidance2TheRightPath/posts/662665607486321
◈ প্রশ্ন: ইফতারী তৈরি, ইফতারের নানা আইটেম আর ইফতার পার্টির বিভিন্ন ছবি ফেসবুকে শেয়ার দেয়া কি ঠিক?
https://www.facebook.com/Guidance2TheRightPath/posts/662665607486321
◈ বিজ্ঞাপন মুক্ত ইউটিউব দেখার উপায় এবং ইউটিউব থেকে অর্থ উপার্জনের হালাল ও হারাম পদ্ধতি
https://www.facebook.com/Guidance2TheRightPath/posts/1082366455516232
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব
