Saturday, July 18, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeনিবন্ধহোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু নিহত হওয়ার পেছনে দায়ভার কাদের?

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু নিহত হওয়ার পেছনে দায়ভার কাদের?

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর হত্যার দায় কার সেটা নির্ণয় করতে হলে আমাদেরকে তার হত্যার সাথে জড়িত প্রত্যেক পক্ষের বিশ্লেষণে যেতে হবে।

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর হত্যাকাণ্ডে বেশ কয়েকটা পক্ষ জড়িত ছিল। আমরা যদি আলাদাভাবে প্রত্যেক পক্ষ নিয়ে আলাপ করি এবং তাদের দায়ভারের মাত্রা নির্ণয় করি তাহলে ইনশাআল্লাহ আমরা সত্য জানতে পারব।

মৌলিকভাবে তার হত্যাকাণ্ডে অংশীদার দু’টি পক্ষ। যথা:

প্রথম পক্ষ: কুফাবাসী (০১)

হোসাইন ইবন আলী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন মদীনায় ছিলেন তখন কুফাবাসী তাকে পত্র লিখে বের হতে উৎসাহ দেয়। অনেক সাহাবী তাকে সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি তাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে বেরিয়ে গেলেন।

ইবন যিয়াদকে যখন কুফার আমীর নিযুক্ত করা হলো, তখন কুফার মানুষজন হোসাইনকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকল। এমনকি তাকে হ*ত্যা করার জন্য প্রেরিত বাহিনীতেও তারা যোগদান করল।

হাফেয ইবন হাজার হোসাইনের প্রতি কুফাবাসীর অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ তাকে লাঞ্ছিত করে। তারা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাকে সাহায্য করা থেকে পিছপা হয়। (০২)

হোসাইন ও তার সঙ্গীরা যখন কুফার সৈনিকদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে নামল, তখন হোসাইন কুফার নেতৃবৃন্দকে ডেকে বললেন, ‘শাবাস ইবন রিবাঈ, হিজার ইবন আবজার, কাইস ইবন আশ আস, ইয়াযীদ ইবনুল হারেস! তোমরা কি আমাকে লিখে পাঠিয়েছিলে না যে, ফল পেকে গেছে, প্রকৃতি সবুজ হয়ে গেছে, বিশ্রামের সময় হয়ে গেছে, আপনি আসার পর প্রস্তুত সেনাবাহিনী পাবেন। আপনি আসুন।’

তারা বলল, ‘না, আমরা করিনি।’ তিনি বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর কসম, তোমরা করেছ।’ তারপর বললেন, ‘মানুষেরা, তোমরা যদি আমাকে অপছন্দ করে থাকো তাহলে আমাকে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে দিও ।(০৩)

হ্যাঁ, হতে পারে হোসাইনের কাছে পাঠানো নামগুলোতে অনেক মিথ্যা নাম ছিল। কিন্তু যে বিপুল পরিমাণ মানুষ মুসলিম ইবন আকীলের হাতে বাইয়াত নিয়েছিল সেটার ব্যাপারে কী বলব? এত মানুষের বাইয়াতের ভিত্তিতেই তো মুসলিম ইবন আক্বীল হোসাইনকে কুফায় আসতে বলেছিলেন।

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর সাথে তাদের এমন আচরণ কুফাবাসীর বিবরণে মুখতার ইবন আবী উবাইদ আস-সাক্বাফীর বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন। ইবনু যুবাইরের কাছে যখন মুখতার গিয়েছিল, তখন ইবনুয যুবাইর তাকে কুফাবাসীর ব্যাপারে প্রশ্ন করলে মুখতার উত্তর দেয়, ‘তারা প্রকাশ্যে শাসকের মিত্র আর গোপনে তার শত্রু।’ ইবনু যুবাইর বলেন, “এটা নিকৃষ্ট দাসদের বৈশিষ্ট্য। তারা মনিবদের সামনে পেলে আনুগত্য করে এবং খেদমতে লেগে পড়ে। আর তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের গালমন্দ করে ও অভিশাপ দেয়। (০৪)

কুফাবাসীর এমন গাদ্দারির স্বভাব বিস্ময়কর না। কারণ আমরা জানি কুফা বেদুঈন, যিন্দীক, নাসিবী ও কট্টর নানা সম্প্রদায়ের মিলনমেলা ছিল।

উম্মু সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহার কাছে কুফার প্রতিনিধি দল আসার পর তিনি তাদেরকে বললেন, ‘তোমরাই কি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালমন্দ করো না?’ তারা বলল, “আমরা এমন কাউকে চিনি না যে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালমন্দ করে। তিনি বললেন, ‘তোমরা করো। কেন? তোমরা কি আলীর গালমন্দ করো না? আলীকে যে ভালোবাসে তার গালমন্দ করো না? অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু “আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ভালোবাসতেন। (০৫) এরা ছিল নাসিবী সম্প্রদায়।

কুফার লোকজনের মাঝে একদল যিন্দীক এবং অজ্ঞ ছিল। তারা ইবন যিয়াদের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর মর্যাদা সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল না। তার প্রমাণ হলো যু*দ্ধ চলাকালীন এক লোক হোসাইনের বাহিনীকে বলল, ‘তোমাদের মাঝে হোসাইন আছে?” সবাই বলল, ‘আছে।’ সে বলল, ‘তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দাও।” হোসাইন উত্তর দিলেন, ‘বরং করুণাময় রব এবং গণ্যমান্য সুপারিশকারীর সুসংবাদ দাও।’ সবাই বলল, ‘কে তুমি?’ সে বলল, ‘আমি ইবন হুয়াইয়া। হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, ‘আল্লাহ! তাকে জাহান্নামে নিয়ে যান।’ এর পরপরই তার বাহন তাকে ফেলে দিল। পা শুধু ঝুলে রইল। অতঃপর ঘোড়া ছুটে চললে তার দেহ আলাদা হয়ে গেল, শুধু পা-টা (ঘোড়ার সাথে) রয়ে গেল । (০৬)

ইবন যিয়াদের বাহিনীর অনেকে হোসাইনকে হত্যা করতে অগ্রসর হওয়ার আগেই তাকে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। (০৭)
হোসাইন যখন অনুভব করতে পারলেন যে, তারা তাকে হত্যা করতে আগ্রহী তখন তিনি তার সাথীদের ডেকে বললেন একটা অতিরিক্ত জামা দিতে যেন সেটা তিনি জামার নিচে পরতে পারেন। কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, তারা তার জামা খুলে ফেলবে।
কাপড়টা আনার পর তিনি সেটা ছিঁড়ে ফেললেন এবং নিজের জামার নিচে পরলেন। তিনি শহীদ হওয়ার পর তারা তার ওপর আক্রমণ করে তার জামাকাপড় ছাড়িয়ে নেয়।(০৮)

ইবন যিয়াদের বাহিনীতে অজ্ঞতা এবং বিভ্রান্তি যে ছড়িয়ে পড়েছিল তার আরো প্রমাণ উল্লেখ করেন আবু রাজা আল-উত্বারেদী। তিনি বলেন, কুফার এক প্রতিবেশী এসে বলল, ‘তোমরা কি পাপীর ছেলে পাপীকে (নাউযুবিল্লাহ) দেখছ না? তাকে আল্লাহ হ*ত্যা করেছেন।’ একথা বলার পর আল্লাহ তার দুই চোখের জ্যোতি নিভিয়ে দিলেন। (০৯)

সাহাবীদের বক্তব্যের দিকে নজর দিলে আমরা দেখতে পারি, তারা হোসাইন রাখিয়াল্লাহু ‘আনহুর হ*ত্যার ব্যাপারে ইরাকবাসীকেই অভিযুক্ত করে। উন্মু সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহার কাছে যখন হোসাইন ইবন আলীর মৃত্যুর সংবাদ এলো তখন তিনি ইরাকবাসীদের অভিশাপ দিয়ে বললেন, ‘তারা তাকে হ*ত্যা করেছে। আল্লাহ তাদেরকে হ*ত্যা করুন! তারা তাকে প্রতারিত করে ডেকে লাঞ্ছিত করেছে। (১০)

ইবন উমার রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমার কাছে ইরাকের একটা প্রতিনিধি দল এসে যখন জিজ্ঞাসা করেছিল, ইহরাম অবস্থায় কেউ যদি মশা মারে তার বিধান কী? তখন তিনি বলেছিলেন, ‘অবাক করার মত বিষয়! ইরাকের লোকেরা, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাতিকে হত্যা করে এখন মশার রক্ত নিয়ে প্রশ্ন করা!(১১)

সুলাইমান ইবন সুরাদ যখন হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর মৃত্যুর প্রেক্ষিতে খুতবা দেন তখন কুফাবাসীকে তিনি দায়ী করেন। এর থেকে বুঝা যায়, হোসাইন হত্যায় কুফাবাসীর দায়ভার কত বড়(১২)

হোসাইন হত্যায় কুফাবাসীদের এমন দুর্বল এবং সুযোগসন্ধানী অবস্থানকে বৈধতা দেয়ার জন্য আব্দুল মুনইম মাজেদ চেষ্টা করেছে। সে বলেছে, ‘কুফাবাসীকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকার দায়ে আমরা তিরস্কার করব না। কারণ তারা উমাইয়াদের শক্তিশালী শাসনের বিপরীতে কিছু করতে সক্ষম ছিল না। (১৩)

এটা কী করে বাস্তব হতে পারে? অথচ কুফাবাসীরা অঙ্গীকার করেছিল যে, হোসাইনকে তারা সাহায্য করবে। কিন্তু হোসাইন আসার পর তারা তার দিকে তাকিয়ে শুধু অশ্রুপাত করে ক্ষান্ত হয়েছে। কবি ফারাযদাক্ব এর বিবরণ দিয়ে হোসাইনকে বলেন, “তাদের হৃদয়গুলো আপনার সাথে, তরবারীগুলো আপনার বিরুদ্ধে। (১৪)

ইরাকবাসী হোসাইনের বাবার হাতে বাইয়াত নিয়েও তার উপকার করেনি। তাদের ঘাড়ে আলীর বাইয়াত ছিল। হোসাইনের চেয়ে আলীর মর্যাদাও তাদের কাছে বেশি ছিল। বিপরীতে হোসাইনের বাইয়াত ছিল না। ইরাকে তার নেতৃস্থানীয় কিছু অনুসারী ছিল। ফিতনাহ সৃষ্টিকারী কিছু লোকজনের পত্রে প্রভাবিত হয়ে তিনি স্ত্রী-পরিবার নিয়ে যাত্রা করেন। তার সাথে শুধু ইরাকবাসীই যু*দ্ধ করে।(১৫)

মুহাম্মদ কুরদ আলী হোসাইন হ*ত্যার দায়ভার কুফাবাসীর উপর দিয়ে বলেন, ‘কুফাবাসী আলী এবং তার ছেলে হাসানকে লাঞ্ছিত করার পর হোসাইনকেও ইয়াযীদের ক্ষমতা থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকার জানিয়ে তাদের কাছে আসতে প্ররোচিত করতে থাকে। তিনি তাদের কথায় প্রভাবিত হন। কারবালায় আসার পর তারা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।(১৬)

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে কুফাবাসীদের আচরণের বিবরণ দিতে গিয়ে আব্দুল কাহের বাগদাদীর বক্তব্য থেকে সত্য আর কোনো বক্তব্য পাইনি। তিনি কট্টর কুফাবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তাদেরকে দৃষ্টান্ত হিসেবেও পেশ করা হয়। এমনকি বলা হয়, কুফার লোকজন থেকেও কৃপণ! অথবা কুফার লোকজন থেকেও গাদ্দার! তাদের গাদ্দারির প্রসিদ্ধ তিনটা নমুনা হলো-

১. আলী রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু নিহত হওয়ার পর তারা হাসানের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু মাদায়েনে তারা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। সিনান আল জু’ফী তাকে আঘাত করে।

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুকে পত্র লিখে ইয়াযীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কুফায় তাকে আহ্বান করে। তিনি তাদের কথায় প্ররোচিত হয়ে চলে আসেন। কারবালায় পৌঁছানোর পর তারা তার সাথে গাদ্দারি করে উবাইদুল্লাহর পক্ষ নিয়ে একজোট হয়ে আক্রমণ চালায়। অবশেষে হোসাইন ও তার অধিকাংশ আত্মীয় কারবালায় নিহত হয়।

৩. যাইদ ইবন আলী ইবনুল হোসাইনের সাথে কৃত বাইয়াত তারা ছিন্ন করে যু*দ্ধ তীব্র হওয়ার পর তারা তাকে শত্রুপক্ষের হাতে সঁপে দেয়। (১৭)

বর্তমান যুগেও সুন্নী বা শিয়া উভয় পক্ষের অনেকে স্বীকার করেছেন যে, কুফাবাসী হোসাইনকে লাঞ্ছিত করেছিল। হোসাইন হত্যার পেছনে সরাসরি দায় তাদের এমনটা তাদের বক্তব্যে পাওয়া যায়। যেমন:

ক. কাযেম আল-ইহসাই আন-নাজাফী

‘ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর সাথে যু*দ্ধ করার জন্য যে বাহিনী বেরিয়েছিল তাতে তিন লাখ মানুষ ছিল। সবাই কুফাবাসী। তাদের মাঝে শাম, হেজায, হিন্দ, পাকিস্তান, সুদান, মিশর বা আফ্রিকার কেউ ছিল না। সবাই কুফার অধিবাসী ছিল। বিভিন্ন গোত্র থেকে তারা সমবেত হয়েছিল। ‘(১৮)

খ. হুসাইন কূরানী

‘কুফাবাসী ইমাম হোসাইন থেকে আলাদা হয়ে ক্ষান্ত হয়নি। নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে তৃতীয় একটা অবস্থানে তারা চলে যায়। দ্রুত তারা কারবালায় গিয়ে ইমাম হোসাইনের বিরুদ্ধে যু*দ্ধে অংশ নেয়। কারবালায় তারা এমনসব কাজ করতে থাকে যেগুলো শয়তানকে সন্তুষ্ট করে আর রহমানকে ক্রুদ্ধ করে।’

তিনি আরো বলেন,

“কুফাবাসীদের নিফাকের আরেকটা প্রমাণ হলো, আব্দুল্লাহ ইবন হাওয়া আত-তামীমী এসে ইমাম হোসাইন ‘আলাইহিস সালামের সামনে দাঁড়ায়। সে চিৎকার করে বলে, ‘তোমাদের মাঝে কি হোসাইন আছে?’ অথচ সে কুফাবাসী। গতকালকেও আলী ‘আলাইহিস সালামের দলে ছিল। সম্ভবত তারা ইমামকে পত্র লেখা লোকদেরও অন্তর্ভুক্ত অথবা শাবাসসহ অন্যান্য পত্র লেখকদের মাঝে সে ছিল। সে চিৎকার করে বলে, ‘হোসাইন! তুমি জাহান্নামের সুসংবাদ গ্রহণ করো। (১৯)

গ. আয়াতুল্লাহ মুরতাদ্বা মুত্বাহহিরী

‘নিঃসন্দেহে কুফাবাসী আলীর দলভুক্ত ছিল। ইমাম হোসাইনকে তার দলের লোকেরাই হ*ত্যা করেছিল। (২০)

ঘ. জাওয়াদ মুহাদ্দিসী

“তাদের এত সবকিছুর ফলে ইমাম আলী দু’টি সমস্যার মুখোমুখি হয়। ইমাম হোসাইন ‘আলাইহিস সালাম তাদের গাদ্দারির সম্মুখীন হন। মুসলিম ইবন আক্কীল তাদের মাঝে মাযলুম অবস্থায় নিহত হন। হোসাইন পিপাসার্ত অবস্থায় কুফার কাছেই কারবালায় কুফার সৈনিকদের হাতে নিহত হন। (২১)

ঙ. হোসাইন ইবন আহমদ আল-বাররাক্বী আন-নাজাফী

কাযভীনী বলেন, কুফাবাসীর বিরুদ্ধে আরো যে অভিযোগ এসেছে সেটা হলো তারা হাসান ইবন আলী ‘আলাইহিমাস সালামকে আঘাত করেছিল। হোসাইন আলাইহিস সালামকে ডেকে এনে হ*ত্যা করেছে।'(২২)

চ. মুহসিন আল-আমীন

এরপর হোসাইনের হাতে বিশ হাজার মানুষ বাইয়াত নিয়ে তার সাথে গাদ্দারি করে, তাদের ঘাড়ে তার বাইয়াত থাকা সত্ত্বেও তারা তার বিরুদ্ধে বেরিয়ে তাকে হ*ত্যা করে। (২৩)

দ্বিতীয় পক্ষ নিয়ে পরবর্তি পর্বে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু নিহত হওয়ার পেছনে দায়ভার কাদের?
আমরা হ*ত্যাকাণ্ডে অংশীদার দু’টি পক্ষের মধ্যে প্রথম পক্ষের পর আজ দ্বিতীয় এবং শেষ পক্ষ নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

দ্বিতীয় পক্ষ: নেতৃস্থানীয় লোকজন

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর হত্যার পেছনে দ্বিতীয় যে দলটার দায় সেটা হলো কুফার নেতৃবৃন্দ। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য লোকজন হলো:

ক. উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ

নিঃসন্দেহে উবাইদুল্লাহ্ ইবন যিয়াদের দায়ভার সবচেয়ে বেশি। কারণ এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা সে ছিল।

ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়ার নির্দেশেই উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ কুফায় আসে। কুফায় ঢুকার সময় সে খুবই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখতে পায়। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে কুফা প্রায় বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।রাষ্ট্রের প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সে একটা পরিকল্পনা হাতে নিল। অভ্যন্তরীণ সংকট সৃষ্টিকারীদেরকে গ্রেফতার করল। কুফায় বিদ্রোহীদের দুই নেতা মুসলিম ইবন আক্বীল এবং হানে ইবন উরওয়া দু’জনকে পাকড়াও করল। প্রথমজন হোসাইনের প্রতিনিধি আর দ্বিতীয়জন মুরাদ গোত্রের নেতা ছিল।

ইবন যিয়াদ দু’জনের মৃত্যুদণ্ড দিল। বিষয়টা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখল। ইবন যিয়াদের কার্যক্রম কুফায় হোসাইনের রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু সমর্থকদের জন্য সতর্কবার্তা ছিল। সে যেন বুঝিয়ে দিল যে, নতুন কোনো পরিকল্পনা হাতে নিলে বা প্রতিরোধ গড়ে তুললে হোসাইনের সমর্থকদের পরিণতি তাদের নেতৃবৃন্দের থেকে ভয়াবহ হবে।

ইবন যিয়াদ কুফায় ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়ার কার্যক্রমকে ইতিবাচকভাবে নেয়। এমনকি তার বিচক্ষণতার প্রশংসা করে সে লিখে, ‘অতঃপর, তোমাকে আমি যেমনটা চেয়েছিলাম তুমি আর তেমনটা নেই। তুমি বিচক্ষণের মতো কাজ করেছ। সাহসী লোকের মতো তাদের ওপর আক্রমণ করেছ। তোমার কাজ যথেষ্ট হয়েছে। তোমার ব্যাপারে আমার ধারণা এবং আশা সত্য হয়েছে। (০১)

ইবন যিয়াদের অর্জিত সফলতা আংশিক। বিশেষ করে হোসাইন যেহেতু এখনও কুফার পথে।সবকিছুর ওপর আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু কুফার উদ্দেশ্যে বের হওয়ার একদিনের মাথায় ইবন যিয়াদ মুসলিম ইবন আকীলকে হ*ত্যা করে। হোসাইন যদি জানতেন মুসলিমকে ধরে হ*ত্যা করা হয়েছে, তাহলে হয়তো ভিন্ন কোনো পথ ধরতেন। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা, তিনি যা চান তাই করেন।

ইবন যিয়াদ হোসাইনকে কুফায় প্রবেশে বাধা দিতে যা যা দরকার সব করল। কারণ ইবন যিয়াদ জানত হোসাইন কুফায় ঢুকে গেলে বিষয়টা জটিল আকার ধারণ করবে।

তাই হোসাইনকে কুফায় ঢুকতে বাধা দিতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করল। হোসাইনকে কুফা থেকে দূরে এক জায়গায় থামিয়ে দিতে ইবন যিয়াদ পরিকল্পনা হাতে নিল। সে এটাকে অনেক বড় অর্জন হিসেবে নিল।

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে লাগলেন যে, তিনি মদীনায় কিংবা সীমান্তে কিংবা ইয়াযীদের কাছে যাবেন, তখন ইবন যিয়াদকে বিজয়ের নেশা পেয়ে বলল। সে প্রায় হোসাইনের কথা মেনে নিতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্তু শিমর ইবন যিল জাওশান তাকে বুঝিয়ে- শুনিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করায়। ইবন যিয়াদের আনুগত্য মানতে তাকে নির্দেশ দেয়।

ইবন যিয়াদের শাসনক্ষমতায় আরো একটা বড় অর্জন ছিল। সে তার সেনাপতি উমার ইবন সা’দকে রাজী করায় যেন সে হোসাইনকে এটা মানতে বাধ্য করে। যদি সে করতে রাজী না হয় তাহলে তাকেও হ*ত্যা করা হবে।

নিঃসন্দেহে শিমরের প্রস্তাবের সাথে ইবন যিয়াদের প্রবৃত্তিরও সায় ছিল। সে ক্ষমতা পেতে উদগ্রীব ছিল। নাহলে এত সহজে তার প্রস্তাব মেনে নিত না।

ইবন যিয়াদের করণীয় ছিল হোসাইনের প্রস্তাব মেনে নেয়া। তাকে ইয়াযীদের কাছে বা অন্য কোথাও যেতে সুযোগ করে দেয়া। বিশেষ করে যেহেতু তাকে সে কুফায় ঢুকতে দিবে না।

তাই ইবন কাসীর বলেন, “তার অন্যতম স্পর্ধা ছিল হোসাইনকে তার কাছে আসতে বাধ্য করা, যদিও সে জন্য হ*ত্যা করা লাগে। তার উচিত ছিল হোসাইন যা বলেছিল তা মেনে নেয়া…।(০২)

ইউসুফ আল-উশ বলেন, ‘আমাদেরকে বলতেই হবে, হোসাইন হ*ত্যার জন্য দায়ী প্রথম দায় শিমরের, আর দ্বিতীয়ত উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের। (০৩)

এমনকি ইবন যিয়াদের এমন নিকৃষ্ট কাজের জন্য তার সবচেয়ে কাছের মানুষ আপন ভাই উসমান ইবন যিয়াদ তাকে তিরস্কার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম যিয়াদের সন্তানদের মাঝে কারো নাকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত লাঞ্ছনার বিষয় না থাকুক। হোসাইন যদি (তাদের হাতে) না নিহত হতেন।(০৪)

হোসাইন হত্যায় তার অগ্রণী ভূমিকা মুসলিমদের মাঝে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তাকে অবশ্য এর মূল্য দিতে হয়। আল্লাহ তাকেও একইভাবে হ*ত্যা করার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেন। (০৫)

খ. ইবন সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস

ইবন যিয়াদ যেখানে কুফার আমীর এবং সর্বেসর্বা, সেখানে উমার ইবন সা’দ তার সেনাপতি এবং তার সকল নির্দেশ বাস্তবায়নকারী।
তার পিতা এত প্রসিদ্ধ যে, পরিচয় দেয়ার কিছু নেই। মর্যাদাবান সাহাবী এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের একজন। অশ্বারোহী যোদ্ধা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়জন।

উমার ইবন সা’দের জন্ম নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় হয়নি। বিদায় হজ্জের সময় সাদের কোনো সন্তান ছিল না, মাত্র একটা মেয়ে ছিল যেমনটা প্রসিদ্ধ হাদীসে প্রমাণিত (০৬)

সম্ভবত উমার ইবন সা’দ সেনাবাহিনীতে ক্রমাগদ পদোন্নতি লাভ করে উঁচু পদে আসীন হয়। সে উমাইয়া শাসকদের মিত্র ছিল। হোসাইন আসার আগে কুফা থেকে চার হাজার যো*দ্ধা নিয়ে সে দাইলামে জি*হাদের উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু ইবন যিয়াদ বাহিনীকে ঘুরিয়ে হোসাইনের সাথে যু*দ্ধ করতে পাঠিয়ে দেয়।

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তার মাঝে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রতি লোভ অনেক বেশি ছিল। তার এক কল্যাণকামী তাকে ঐ বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা থেকে বিরত হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেও ইবন যিয়াদের কাছে গিয়ে তাকে বাহিনীর নেতৃত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে কুফার নেতৃস্থানীয় কাউকে এ দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।

কিন্তু ইবন যিয়াদ এত উদাসীন না যে, উমার ইবন সা’দের এ প্রস্তাব মেনে নিবে। হোসাইন বিরোধী বাহিনীর নেতৃত্বে উমার ইবন সা’দের মত মানুষ থাকা অনেক অর্থবহ।এই বাহিনীর নেতৃত্ব থেকে বিরত থাকার চিন্তা দূর করার জন্য ইবন যিয়াদ তাকে হুমকি দেয় যে, এমন কাজ করলে তাকে চিরতরে পদ থেকে সরিয়ে নেয়া হবে। উমার ইবন সা’দ তখন ইবন যিয়াদের প্রস্তাবে রাজী হয়ে হোসাইনের বিরুদ্ধে যেতে সম্মত হয়।

উমার ইবন সা’দ যে নেতৃত্বপ্রিয় ছিল তার প্রমাণ হলো তার সাথে তার পিতার ঘটে যাওয়া কাহিনী। উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হত্যার পর মুসলিমরা যখন পরস্পর যু*দ্ধে অবতীর্ণ হলো তখন সাদ ,আলী ও মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম উভয়ের দলকে প্রত্যাখ্যান করে উট নিয়ে মদীনা থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার ছেলে উমার ইবন সা’দ সে সময় তার কাছে হাজির হলে তিনি বললেন, “আমি এই আরোহীর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।’ উমার এসে উটের পিঠ থেকে নেমে বাবাকে বলল, ‘আপনি নিজের উট আর ছাগল চরাচ্ছেন। এদিকে মানুষদের নেতৃত্ব নিয়ে যু*দ্ধ করতে ছেড়ে দিয়েছেন!’ সা’দ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু তার বুকে আঘাত করে বললেন, ‘চুপ কর। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “নিশ্চয় আল্লাহ আল্লাহভীরু, অভাবমুক্ত এবং গোপন থাকা বান্দাকে পছন্দ করেন।”(০৭)

উমার ইবন সা’দ সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো থেকে বুঝা যায় যে, সে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল যেন হোসাইন ও ইবন যিয়াদ একটা সমাধানে পৌঁছায় এবং উমার ইবন সা’দকে হোসাইনের সাথে সংঘাত এড়াতে হয়।

এমনকি উমার ইবন সা’দ হোসাইন হ*ত্যার দায়িত্ব থেকে পালানোর চেষ্টাও করেছিল। দায়িত্বটা ইবন যিয়াদের ওপর অর্পণ করতে চেষ্টা করেছিল। আওয়ানার বর্ণনায় বিষয়টা ফুটে ওঠে। হোসাইনকে হ*ত্যার পর উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ উমার ইবন সা’দকে পত্র লিখে বলে, “উমার, হোসাইনকে হত্যা করতে তোমাকে যে চিঠি লিখেছি সেটা কোথায়?’ উমার বলল, ‘আপনার আদেশ পালন করতে চলে গিয়েছি। চিঠি হারিয়ে গেছে।’ উবাইদুল্লাহ বলল, ‘অবশ্যই তুমি নিয়ে আসবে।’
উমার বলল, ‘হারিয়ে গেছে।’
 উবাইদুল্লাহ বলল, ‘আল্লাহর কসম, তুমি এটা নিয়ে আসবে।’
 উমার বলল, ‘আল্লাহর কসম, মদীনার বৃদ্ধাদের কাছে কৈফিয়ত হিসেবে চিঠিটা রাখা হয়েছে। হোসাইনের ব্যাপারে আপনাকে আমি এমন নসীহত করেছিলাম, যেটা আমি আমার বাবা সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাসকে করলে আপনি তার অধিকার বুঝতে পারতেন।(০৮)

ইবন সা’দের বর্ণনায় যদি আমরা মনোযোগ দিই, দেখতে পাব উমার ইবন সা’দকে ইবন মুর্তী’ হোসাইন হ*ত্যার জন্য তিরস্কার করছেন। তখন উমার তাকে জবাব দিচ্ছে, “বিষয়টা আসমান থেকে ফয়সালা হয়ে গিয়েছিল। ঘটনার আগে আমি চাচাতো ভাইয়ের কাছে ওজর পেশ করেছিলাম, কিন্তু তিনি মানতে নারাজ ছিলেন। (০৯)

হোসাইনের কাছে উমার ইবন সা’দের পেশ করার মত কোনো ওজর নেই। তাকে একটাই সুযোগ দিতে পারত উমার ইবন সা’দ আর সেটা হলো রাতের অন্ধকারে তাকে যেখানে ইচ্ছা যেতে সুযোগ দিবে এবং নিজে তার পশ্চাদ্ধাবন করবে না। উমার ইবন সা’দ যে  হোসাইনকে সুযোগ দিতে ইচ্ছুক ছিল সেটার প্রমাণ হলো তারা হোসাইন রাতের অন্ধকারে কয়েকবার উমার ইবন সা’দের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং অনেক লম্বা সময় আলোচনাও করেন। (১০)

উমার ইবন সা’দের এত এত আফসোস তাকে হোসাইনের হত্যাকাণ্ডের দায়ভার থেকে মুক্তি দিবে না। কারণ একজন সেনাপতি হিসেবে সে হত্যার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছিল। সে সময়টাতে হোসাইনের সবচেয়ে কাছে উমার ইবন সা’দই ছিল। কিন্তু নেতৃত্বের লোভ ইবন যিয়াদকে এমন অপরাধ করতে প্ররোচিত করে। তার ব্যাপারে ইমাম আহমদ বলেন, ‘তার থেকে কোনো হাদীস বর্ণনা করা যাবে না। কারণ সে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছে এবং রক্তপাত ঘটিয়েছে (১১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৌহিত্রকে যারা হত্যা করেছে, তাদের থেকে আল্লাহ প্রতিশোধ নিয়েছেন। মুখতার ইবন আবী উবাইদ আস সাক্বাফী নামে এক মিথ্যুককে তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। সে খুঁজে খুঁজে হোসাইনের ঘাতকদের হত্যা করেছিল। এর মাধ্যমে তাবেয়ী শা’বী রাহিমাহুল্লাহর দেখা স্বপ্ন সত্য হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম আসমান থেকে বর্ণা নিয়ে কিছু মানুষ নেমে এসে হোসাইনের ঘাতকদের হ*ত্যা করছে। এর কিছু দিনের মাথায় মুখতারের উত্থান ঘটল, সে তাদের সবাইকে হ*ত্যা করল। ‘(১২)

গ. ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়া

হোসাইন হত্যার হোতা হিসেবে ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়ার নামও উল্লেখযোগ্য। ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়া সে সময় কার্যত মুসলিমদের খলীফায় পরিণত হয়েছিল। মানুষ তার আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছিল। অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী এবং বিভিন্ন নগরীর লোকজন তার হাতে বাইয়াত নিয়েছিল। কেবল দু’জন সাহাবী ছাড়া: হোসাইন ইবন আলী ও আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম। আর কুফাবাসী, যারা হোসাইনকে তাদের কাছে আসতে আহ্বান করেছিল।

মুসলিম ইবন আক্কীল বাইয়াতকারীর আধিক্য এবং পরিস্থিতির উপযুক্ততার কথা চিঠিতে লিখে পাঠানোর পর হোসাইন ইরাকে চলে যান।

এই দীর্ঘ সময়ে (শাবান, রমাদান, শাওয়াল, যিলক্বদ) হোসাইনের প্রতি ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়ার অবস্থান যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পারব সে বিরোধী শি*বিরের দুই নেতা হোসাইন ও ইবনু যুবাইরকে গ্রেফতার করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠায়নি। বরং বিষয়টা স্বাভাবিক পর্যায়ে ছিল। তারা বাইয়াত নিক বা প্রত্যাখান করুক, তাতে ইয়াযীদের তেমন ভ্রূক্ষেপ ছিল না।

সম্ভবত ইয়াযীদ তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণের চেষ্টা করেছিল। পিতার উপদেশ বাস্তবায়ন তার লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয় হিসেবে হোসাইনের অধিকার সংরক্ষণ করা এবং তার সাথে নমনীয় হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার।

ইয়াযীদ ইরাকের দিকে মনোযোগী হলো। বিশেষ করে কুফার দিকে, যেখানে প্রতিদিন পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং রাষ্ট্রের ভেতরই নতুন একটা বিরোধী গোষ্ঠীর সূচনা হচ্ছে। (১৩)

তাই সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কুফাবাসীর আমীর নিযুক্ত করল ইবন যিয়াদকে। ইবন যিয়াদ তার ধূর্ততা দিয়ে কুফার ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলো, যা পরবর্তীতে একটা বড় অর্জন হিসেবে গণ্য করা হয়। (১৪)
ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়া হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল। তাই হোসাইন যখন কুফায় যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলো তখন ইয়াযীদ একটা চিঠি লিখল ইবন যিয়াদকে তাকে সেখানে বলল, ‘শুনতে পেলাম হোসাইন কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। অন্যান্য সময়ের বদলে তোমার সময় এবং অন্যান্য অঞ্চলের বদলে তোমার অঞ্চল পরীক্ষিত হয়েছে। তার কাছে তুমি মুক্তি পাবে নতুবা দাসেরা যেমন দাসত্বে পতিত হয় তেমন তুমি দাস হয়ে যাবে। (১৫) গোয়েন্দা এবং অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী প্রস্তুত রাখবে। সন্দেহজনক গতিবিধির দিকে নজর রাখবে। কাউকে সন্দেহ হলেই গ্রেফতার করবে। তবে শুধু তাকে হ*ত্যা করবে, যে তোমার সাথে যু*দ্ধে নামে। আর যা যা ঘটে সব আমাকে লিখে পাঠাও। ওয়াসসালামু ‘আলাইকা ওয়ারাহমাতুল্লাহ।(১৬)

ইয়াযীদ তার নিযুক্ত প্রশাসক ইবন যিয়াদকে হোসাইনের মর্যাদার ব্যাপারে যেমন বলেছে, তেমন তার থেকে সতর্কতা গ্রহণ করতেও বলেছে। কারণ শিথিলতা অবলম্বন করে যদি ধূর্ততার সাথে বিষয়টা দেখভাল না করে, আর হোসাইন কুফায় ঢুকে পড়ে তাহলে শাসনক্ষমতা তার হাতে চলে যাবে। তুমি তোমার মূলে ফিরে যাবে। মানে দাসে পরিণত হবে; কারণ তার বাবা ছিল একজন দাস। তুমি শাসনক্ষমতার মর্যাদা হারাবে।

ইয়াযীদের বক্তব্য থেকে এমন কিছু বুঝা যায় না যে, সে ইবন যিয়াদকে হোসাইন হ*ত্যার নির্দেশ দিয়েছে। বরং ইয়াযীদের ভিন্ন পত্র থেকে বুঝা যায়, যতক্ষণ কেউ আক্রমণ না করছে ততক্ষণ যেন তাকে হ*ত্যা না করা হয়। অধিকন্তু ইবন যিয়াদ যেন অবশ্যই প্রতিটি নতুন পরিস্থিতি ইয়াযীদকে জানায়। ইয়াযীদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

হোসাইন যখন কুফাভিমুখী, তখন ইবন যিয়াদের কাছে ইয়াযীদ এ চিঠি প্রেরণ করে।

হোসাইন কুফার কাছাকাছি আসার পর ইবন যিয়াদ তার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে যা আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি। সে হোসাইনের বিরুদ্ধে উমার ইবন সা’দকে চার হাজার সৈন্যসহ পাঠায়। তারা হোসাইনকে কারবালায় যেতে বাধ্য করে। হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মহররমের তিন তারিখ বৃহস্পতিবার কারবালায় পৌঁছান।(১৭)

ইবন যিয়াদের সাথে হোসাইনের কয়েক দফা পত্র আদান-প্রদান হয়। অবশেষে মহররমের দশ তারিখ তাকে হ*ত্যা করা হয়।

ইয়াযীদের পক্ষের লোকেরা বলে, এক সপ্তাহের মত সময় তারা পত্র বিনিময় করে। আর দামেস্ক থেকে কুফার দূরত্ব এত বেশি যে, সেখানে পত্র পৌঁছাতে দুই সপ্তাহ সময় লাগে। তার থেকে বুঝা যায়, ইবন যিয়াদ একক সিদ্ধান্ত নিয়ে ইয়াযীদের কোনো পরামর্শ গ্রহণ ছাড়াই হোসাইন হ*ত্যার নির্দেশ দিয়েছিল।

তারা আরো প্রমাণ দেয় যে, আলী ইবনুল হোসাইনের কাছে ইয়াযীদ ক্ষমা চেয়ে বলেছিল, হোসাইন হত্যার বিষয়ে সে কিছু জানত না এমনকি হ*ত্যার পর সে খবর পায়।

তাদের আরো একটা যুক্তি হলো সাহাবীদের বক্তব্য। কারণ সাহাবীরা এই হ*ত্যার দায়ভার ইরাকবাসীর ওপর দিয়েছিল। কোনো সাহাবী সরাসরি ইয়াযীদকে দায়ী করেননি। আর অন্তরের খবর আল্লাহ ভালো জানেন। আমরা মানুষের অন্তরে কী আছে সে হুকুম দিব না। বরং বাহ্যিক অবস্থা দেখে হুকুম দিব। আর আল্লাহ মনের অবস্থা দেখবেন।

তাই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ ইয়াযীদের ব্যাপারে বলেন, ‘সে হোসাইন হ*ত্যার নির্দেশ দেয়নি আবার তার হ*ত্যায় আনন্দ প্রকাশও করেনি। (১৮)

তিনি আরো বলেন, ‘সকল ইতিহাসবিদ একমত যে, ইয়াযীদ হোসাইন হ*ত্যার নির্দেশ দেয়নি। কিন্তু সে ইবন যিয়াদকে পত্র লিখে ইরাকের নেতৃত্ব গ্রহণে হোসাইনকে বাধা দিতে বলে। হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু মনে করতেন ইরাকবাসী তাকে সাহায্য করবে এবং চিঠিতে যেমন লিখে দিয়েছে তেমন তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। কিন্তু যালেম সম্প্রদায় যখন তাকে ধরে ফেলল, তখন তিনি ইয়াযীদের কাছে অথবা সীমান্তে অথবা নিজ এলাকায় চলে যেতে চাইলেন। তারা তাকে কোনোটা করার অনুমতি না দিয়ে তাদের নেতৃত্ব মেনে নিতে নির্দেশ দেয়। তারা তার সাথে যু*দ্ধ করে। অবশেষে তিনি মাযলুম অবস্থায় শহীদ হয়ে যান। রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু।

ইয়াযীদের কাছে এ খবর পৌঁছালে সে বাহ্যত দুঃখ প্রকাশ ও কান্নাকাটি করে। তার পরিবারের কোনো সদস্যকে ইয়াযীদ বন্দি করেনি। বরং তাদেরকে সম্মান করে উপঢৌকন দিয়ে নিজেদের এলাকায় ফিরিয়ে দেয়। (১৯)

তিনি আরো বলেন, ‘একাধিক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, ইয়াযীদ হোসাইন হ*ত্যার নির্দেশ দেয়নি। তার এমন কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। বাবা মুয়াবিয়ার নির্দেশমত সে তাকে সম্মান ও মর্যাদা দিতে চাইত। (২০)

ইয়াযীদের ব্যাপারে ইবন তুলুন বলেন, ‘সে হোসাইন হ*ত্যা করেনি, নির্দেশ দেয়নি, তাতে সন্তুষ্ট হয়নি এবং তাকে হ*ত্যা করার সময় সে উপস্থিতও ছিল না। তার ব্যাপারে এমন কিছু বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়, আর এমনটা ভাবাও বৈধ হবে না। (২১)

তবে ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়া নিন্দিত। কারণ ইবন যিয়াদসহ আরো যারা হোসাইন হ*ত্যায় ভূমিকা রেখেছিল তাদের ব্যাপারে সে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

তকীউদ্দীন ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, ‘হোসাইনের ব্যাপারে শোক প্রকাশ করলেও সে হোসাইনের পক্ষ নেয়নি, তার ঘাতকদের হ*ত্যা করেনি এবং হোসাইনের পক্ষ থেকে প্রতিশোধও নেয়নি।(২২)

হাফেয ইবন কাসীর বলেন, ‘… ইয়াযীদ হোসাইনকে পদচ্যুত করেনি, শান্তি দেয়নি এবং পরবর্তীতে তাকে দোষারোপ করে চিঠিও লিখেনি। আর আল্লাহ ভালো জানেন। (২৩)

ইবন তাইমিয়্যাসহ অন্যরা যত আপত্তি তুলেছেন সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং যৌক্তিক। কিন্তু ইয়াযীদের পক্ষাবলম্বনকারীরা বলেছে যে, ঐতিহাসিক পরিস্থিতির কারণে সে এমনটা করেছিল।

কারণ কুফা একটা বিশৃঙ্খল নগরী। বিদ্রোহ, ফিতনা ও দলাদলির জন্য কুখ্যাত। কুফার আমীর যখন ছিলেন সাহাবী নুমান ইবন বশীর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, তখন তার হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ইয়াযীদ যখন ইবন যিয়াদকে কুফায় পাঠাল, তখন ইবন যিয়াদ স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদ্রোহের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পথ বন্ধ করে দেয় এবং কুফার ওপর তার পূর্ণ দখল এসে পড়ে।

তারা বলে, হোসাইন হ*ত্যার পর কুফা অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। ইবন যিয়াদের মত দক্ষ কোনো নেতা ইয়াযীদ পায়নি। তাছাড়া ইবন যিয়াদকে পদচ্যুত করা হোক বা রাখা হোক, তাতে রাষ্ট্রের প্রতি কুফাবাসী বিরূপ মনোভাব সামান্য পরিমাণও কমবে না।

ইয়াযীদ যদি ইবন যিয়াদকে পদচ্যুত করত, তাহলে তাকে এর বড় মাশুল দিতে হত। হয়তো কুফাবাসীর মাধ্যমে বড় মাপের একটা বিদ্রোহ ঘটে  যেত, বিশেষত হোসাইনের শাহাদতে যারা ব্যথিত তাদের হাতে। কিছুদিন পরেই সেটা অবশ্য ঘটেছিল একদল লোকের দ্বারা, যারা “তাওয়াবিন’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

•••উমাইয়া রাষ্ট্র কেন হোসাইনের ঘাতকদের পশ্চাদ্ধাবন করেনি, তা এখান থেকে বোধগম্য হয়। কারণ বিষয়টা সহজ নয়। বহু গোত্র এর সাথে জড়িত, যাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আছে। তাছাড়া তারা যা করেছে তা রাষ্ট্রের উপকারেই এসেছে।

এমন পদক্ষেপ হয়তো রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে সংকটে ফেলে দিত। বিশেষ করে ইরাক অঞ্চলে। আর ইয়াযীদ তার প্রশাসকদের জবাবদিহিতা করার মত সময়ও দেয়নি। কারণ একের পর এক বিদ্রোহ চলমান ছিল। ইবনু যুবাইরের বিরোধিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হতে থাকে। হেজাযবাসী ইয়াযীদের পক্ষে ছিল না। এছাড়া রাষ্ট্র অন্যান্য অনেক সমস্যায় জর্জরিত ছিল। ফলে হোসাইনের সাথে যারা ভুল আচরণ করে তাকে হ*ত্যা করেছে, তাদের ব্যাপারে ইয়াযীদ কোনো শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত ছিল।

হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু হ*ত্যায় ইয়াযীদ কতটুকু জড়িত সেটা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতের সারকথা এতটুকু।

•••••যদিও ইয়াযীদ দায়ভার থেকে মুক্ত নয় যেটা স্পষ্ট।

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাতি, দৌহিত্র ও প্রিয়জনের মৃত্যু এমন ভয়াবহ বিষয় যেটা এত তুচ্ছভাবে নিয়ে সামান্য তিরস্কার করে ক্ষান্ত হয়ে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

যাইহোক, তার ব্যাপারে আমাদের মতটা ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ সংক্ষেপে বলেছেন, “আমরা তাকে গালমন্দ করব না, তাকে ভালোবাসবও না। সে কোনো নেককার মানুষ ছিল না যে, তাকে ভালোবাসব, আর আমরা কোনো নির্দিষ্ট মুসলিমকে গালমন্দ করি না।(২৪)

আমরা আল্লাহর কাছে কথায় ও কাজে ইনসাফ করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

10 − nine =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য