Sunday, July 26, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরভ্যাট ফাঁকি দিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আয় গোপন!

ভ্যাট ফাঁকি দিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আয় গোপন!

জয়নাল আবেদীন ও ফরিদ আহমেদ

বিশ্বজুড়ে সমাদৃত সার্চ ইঞ্জিন গুগল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন। তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে বাংলাদেশে এই অনাবাসী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। বছরে একেকটি প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক আয় বাংলাদেশের মোট বাজেটের চেয়েও বেশি, গত বছর যা ছিল ৫৫ লাখ কোটি টাকা। দীর্ঘ চেষ্টার পর বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাটের আওতায় আনা সম্ভব হলেও যে ভ্যাট তারা দিচ্ছে তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে করা ব্যবসা থেকে প্রতিষ্ঠান তিনটি গত দুই মাসে সরকারকে ভ্যাট দিয়েছে মাত্র ১০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জোর সন্দেহ, প্রতিষ্ঠানগুলো নামমাত্র আয় দেখিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তারা বাংলাদেশে যে আয়ের তথ্য দিচ্ছে তা বাস্তবসম্মত নয়। এইচটিটিপুলের মাধ্যমে দেওয়া একাংশের বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের ওপর যে ভ্যাট তারা দিত, তার সঙ্গে মেলালেও সন্দেহটি আরো গভীর হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞও একই সন্দেহ ব্যক্ত করছেন।

দীর্ঘদিন ধরে গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো অনাবাসী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা করলেও সরকারকে কোনো ভ্যাট দিচ্ছিল না। এতে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে গত ১০ জুন কালের কণ্ঠে ‘অনলাইনে প্রচারের আড়ালে হাজার কোটি টাকা পাচার’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর চাপে পড়ে গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফট বাংলাদেশ থেকে ভ্যাট নিবন্ধন নেয়।

এনবিআরের ভ্যাট নিরীক্ষা ও গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন যে প্রক্রিয়ায় গুগল, ফেসবুক ও অ্যামাজন ভ্যাট দিচ্ছে, সেটি হলো তারা নিজেরাই আয় করে অ্যাসেসমেন্ট করে নিজেরাই ভ্যাট পরিশোধ করছে। বছর শেষে আমরা এসব প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট রিটার্ন অডিট করব। তাদের বাংলাদেশ থেকে আয় ও ব্যয়ের সব তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে। তখন বলা যাবে কম্পানিগুলো সঠিক হারে ভ্যাট দিচ্ছে, নাকি ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে।’

জানা গেছে, জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশ থেকে ফেসবুক ৪১ কোটি ৩২ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছে। অনাবাসী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভ্যাটের নিয়ম হলো, প্রতি ১১৫ টাকায় ভ্যাট দিতে হয় ১৫ টাকা। দুই মাসের আয়ের ওপর ফেসবুক ভ্যাট দিয়েছে পাঁচ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে জুন মাসের আয়ের ওপর দুই কোটি ৪৪ লাখ এবং জুলাই মাসের আয়ের ওপর প্রায় দুই কোটি ৯৫ লাখ টাকা ভ্যাট দেয়। অথচ ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার আগেও বাংলাদেশ থেকে এইচটিটিপুলের মাধ্যমে পাওয়া বিজ্ঞাপনের ভ্যাট দিয়েছিল ফেসবুক। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট বিজ্ঞাপনের একাংশ অর্থাৎ এইচটিটিপুলের মাধ্যমে ১৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা ভ্যাট দেয় তারা।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, এইচটিটিপুলের মাধ্যমে দেওয়া একাংশ বিজ্ঞাপন বাবদ আয়ের ভ্যাট আর এখন দেওয়া সামগ্রিক আয়ের ভ্যাটের হিসাব মিলছে না। কারণ ভ্যাট নিবন্ধন নিয়ে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করার পর সেটাতে বাংলাদেশ থেকে আয়ের পুরো প্রতিফলন হলে মোট আয় ও ভ্যাটের পরিমাণ আরো অনেক বাড়বে। এখন যে হারে তারা আয় দেখাচ্ছে ও ভ্যাট দিচ্ছে, এইচটিটিপুলের মাধ্যমে দেওয়া অর্থের সঙ্গে এর খুব বেশি তারতম্য নেই। এ থেকে এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ফেসবুক সম্ভবত আয়ের তথ্য গোপন করছে।

২০২০ সালের ফেসবুকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফেসবুক ব্যবহার হয় এমন দেশগুলো থেকে ৮৬ বিলিয়ন ডলার বা সাত লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা আয় করেছিল, যা বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের চেয়েও অনেক বেশি। শেষ ১০ বছরে ফেসবুকের আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২২২ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বশেষ পাঁচ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৪০ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০২০ সালে ফেসবুকের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ২২ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ হার অব্যাহত থাকলে চলতি বছরে ফেসবুকের আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১০৪ বিলিয়ন ডলার বা আট লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা।

অথচ ফেসবুক ভ্যাট রিটার্নে চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসে যে হারে আয় দেখিয়েছে, তা গড়ে হিসাব করলে বছর শেষে বাংলাদেশ থেকে তাদের মোট আয় দাঁড়ায় মাত্র ২৪৭ কোটি টাকা, যা ফেসবুকের বৈশ্বিক সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। চীন বা ভারতের মতো নিজস্ব কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম না থাকায় বাংলাদেশে একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে ফেসবুক।

এদিকে মে মাসের ৯ দিন ও জুন-জুলাই মাসে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগল বাংলাদেশ থেকে আয় দেখিয়েছে ৩১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অনাবাসী প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে গুগল ভ্যাট দিয়েছে প্রায় চার কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে মে মাসের আংশিক ও জুন মাসের আয় থেকে দুই কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং জুলাইয়ের আয় থেকে এক কোটি ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।

গুগলের গত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৈশ্বিক এ প্রতিষ্ঠান সে বছর প্রায় ১৮২ বিলিয়ন ডলার বা ১৫ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। গত ১০ বছরে গুগলের আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৮ শতাংশ। সর্বশেষ পাঁচ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ হার অব্যাহত থাকলে চলতি বছরে গুগলের আয় ঠেকবে ২১৮ বিলিয়ন ডলার বা ১৮ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকায়। বিপুল অঙ্কের আয়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে জুন-জুলাইয়ে যে আয় দেখিয়েছে, সে হিসাবে বছর শেষে এ দেশ থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয় দাঁড়াবে মাত্র ১৮৮ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুগলের বৈশ্বিক আয়ের সঙ্গে বাংলাদেশে দাখিল করা ভ্যাট রিটার্নের আয়ের তথ্য খাপ খায় না। তারা সম্ভবত ভ্যাট ফাঁকি দিতেই প্রকৃত আয়ের তথ্য গোপন করে থাকতে পারে।

এদিকে অ্যামাজন জুন ও জুলাই মাসে বাংলাদেশ থেকে আয় দেখায় সাত কোটি ১৩ লাখ টাকা। এ আয়ের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট দেয় প্রায় ৯৩ লাখ টাকা। জুন ও জুলাই মাসে যথাক্রমে ৫২ লাখ ৯৭ হাজার ও ৪০ লাখ দুই হাজর টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেছে।

অথচ ২০২০ সালের অ্যামাজনের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৈশ্বিক এ প্রতিষ্ঠান বছরটিতে প্রায় ৩৮০ বিলিয়ন ডলার বা ৩২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। গত ১০ বছরে অ্যামাজনের আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ। সর্বশেষ বছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৩৫ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ হার অব্যাহত থাকলে চলতি বছর অ্যামাজনের আয় ঠেকবে প্রায় ৫১৫ বিলিয়ন ডলার বা ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায়।

অ্যামাজন বাংলাদেশ থেকে যে হারে জুন ও জুলাই মাসে আয় দেখিয়েছে, গড় হিসাবে বছর শেষে এ দেশ থেকে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় দাঁড়াবে মাত্র ৭২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যামাজনের বৈশ্বিক আয়ের সঙ্গে বাংলাদেশে দাখিল করা ভ্যাট রিটার্নের আয়ের তথ্য মেলানো খুবই কঠিন। কারণ বাংলাদেশ থেকে প্রতিষ্ঠানটি যে আয় দেখিয়েছে, তা মোট আয়ের ছিটেফোঁটার মধ্যেও পড়ে না। হতে পারে, ভ্যাট ফাঁকি দিতেই প্রকৃত আয়ের তথ্য গোপন করেছে অ্যামাজন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ যোগাযোগের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিতে গিয়ে বছরে হাজার কোটির বেশি টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এ খাত থেকে দীর্ঘদিন ধরে সরকার রাজস্ববঞ্চিত হয়ে আসছিল। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার তৎপরতা শুরু করে সরকার। গত ২৩ মে গুগলের আওতাধীন ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ২৭ মে অ্যামাজন ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেট থেকে অনাবাসী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআইএন নিয়েছে। ফেসবুক এই নিবন্ধন করে ১৩ জুন। ফেসবুকের পক্ষে নিবন্ধিত তিনটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ফেসবুক আয়ারল্যান্ড লিমিটেড, ফেসবুক পেমেন্টস ইন্টারন্যাশনাল ও ফেসবুক টেকনোলজিস আয়ারল্যান্ড লিমিটেড।

সর্বশেষ গত ১ জুলাই মাইক্রোসফট ভ্যাট নিবন্ধন নেয়। সিঙ্গাপুরের ঠিকানা ব্যবহার মাইক্রোসফট রিজিওনাল সেলস পিটিই লিমিটেড নামে নিবন্ধন নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপন প্রচার ছাড়াও সফটওয়্যার ও অ্যাপস বিক্রি করে থাকে। এ ছাড়া ইয়াহুর কার্যক্রম মাইক্রোসফটের সঙ্গে যুক্ত। সে জন্য ইয়াহু যেসব সেবা দেয়, তার বিপরীতেও ভ্যাট দিতে হবে মাইক্রোসফটকে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ভ্যাট পরিশোধ করেনি।

ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের অতিরিক্ত কমিশনার প্রমিলা সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার পর গত দুই মাসে গুগল, ফেসবুক ও অ্যামাজন ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করে ভ্যাটের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিলেও মাইক্রোসফট রিটার্ন দাখিলে এক মাস সময় চেয়েছে। এই এক মাস আগস্টে শেষ হবে। আশা করছি, এই সময়ের মধ্যে বা সময় শেষ হলেই রিটার্ন জমা দেবে মাইক্রোসফট।

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করছি। অর্থাৎ আয়ের ১১৫ টাকার মধ্যে ১৫ টাকা ভ্যাট দিতে হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানকে। এভাবে গত জুন ও জুলাই মাসে গুগল, ফেসবুক ও মাইক্রোসফট থেকে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

fifteen − seven =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য