কাব ইবনু মালিক আল-আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের পালে ছেড়ে দেয়া হলে পরে তা যতটুকু না ক্ষতিসাধন করে, কারো সম্পদ ও প্রতিপত্তির লোভ এর চেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন করে তার ধর্মের।
ব্যাখ্যাঃ
এই উপমা দ্বারা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের বুঝিয়েছেন যে, একটি ভেড়ার খোঁয়াড় রয়েছে। মালিকের অসতর্কতার সুযোগে সেখানে দুটি নেকড়ে ঢুকে পড়ল। নেকড়ে অত্যন্ত হিংস্র ও ধ্বংসাত্মক প্রাণী। একটি নেকড়েই যদি প্রবেশ করে, তবে তা ভয়াবহ ক্ষতি করে। তাহলে দুটি নেকড়ে, যারা একে অপরকে আরও উৎসাহিত করে, তারা কত ভয়ঙ্কর ধ্বংস সাধন করবে!
আর যদি খোঁয়াড়টি খোলা থাকে, মালিকও গাফিল থাকে, এবং সেই দুটি নেকড়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় সেখানে প্রবেশ করে—তবে তারা একটির পর একটি ভেড়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। একটি ভেড়া খেয়ে তৃপ্ত হবে না; বরং প্রায় প্রতিটি ভেড়াকেই ক্ষতবিক্ষত করবে। একটি নেকড়ের এই অবস্থা হলে, দুটি নেকড়ের ধ্বংসযজ্ঞ কত ভয়াবহ হবে, তা সহজেই বোঝা যায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দৃষ্টান্তে বুঝিয়েছেন—
• ভেড়ার খোঁয়াড় হলো মানুষের দীন।
• দুটি নেকড়ে হলো মানুষের সম্পদের প্রতি লোভ এবং ক্ষমতা, সম্মান-প্রতিপত্তির প্রতি লোভ।
যে ব্যক্তি সম্পদের প্রতি অত্যধিক লোভী হয়ে পড়ে, সে যেকোনো উপায়ে সম্পদ অর্জনের চেষ্টা করে। তার ভেতরে এমন এক অতৃপ্ত লালসা জন্মায়, যা নেকড়ের হিংস্র ক্ষুধার মতো। একইভাবে সে মর্যাদা, নেতৃত্ব ও উচ্চ আসনের প্রতিও লোভী হয়ে ওঠে। অনেক সময় মানুষ সম্মান ও ক্ষমতা অর্জনের জন্য নিজের সম্পদও ব্যয় করে। অথচ সম্পদ ও মর্যাদার এই লোভ মানুষের দীনকে এমনভাবে ধ্বংস করে, যা দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ের ভেড়ার পাল ধ্বংস করার চেয়েও ভয়াবহ।
তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি মানুষের লোভ তার দীনের জন্য, দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়েকে ভেড়ার পালে ছেড়ে দেওয়ার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।” আলিমগণ বলেন, সম্পদের ক্ষতিকর দিক হলো—এটি মানুষের প্রবৃত্তিকে শক্তিশালী করে এবং বৈধ ভোগ-বিলাসের প্রতি আসক্ত করে তোলে। একসময় সেই ভোগ-বিলাস অভ্যাসে পরিণত হয়। পরে যদি সেগুলো না পায়, তবে সে অস্থির ও অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে।
এরপর সম্পদের প্রতি ভালোবাসা এত প্রবল হয়ে যেতে পারে যে, হালাল উপার্জন তার কাছে যথেষ্ট মনে হয় না। তখন সে সন্দেহজনক ও হারাম উপার্জনের পথে পা বাড়ায়। আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তার দীন নষ্ট হয়ে যায়। আরও একটি বিষয় হলো—সম্পদ অনেক সময় মানুষের জন্য সামাজিক মর্যাদা এনে দেয়। কিন্তু মানুষ যদি শুধু সম্পদের জন্যই দীন বিসর্জন দিতে পারে, তবে মর্যাদা ও ক্ষমতার জন্য সে কত বড় ক্ষতি করতে পারে!
সম্মান ও নেতৃত্বের লোভে মানুষ অনেক সময় লোক দেখানো (রিয়া), মুনাফিকি, তোষামোদ এবং অন্যান্য নিকৃষ্ট চরিত্রের আশ্রয় নেয়, যেন মানুষ তাকে বড় নেতা বা সম্মানিত ব্যক্তি বলে। এগুলো সবই সম্পদ ও মর্যাদার লোভের কারণে মানুষের দীনের ক্ষতির উদাহরণ। যদি মানুষের একমাত্র চিন্তা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাত হয়, তবে আল্লাহ তার দুনিয়ার বহু দুশ্চিন্তা দূর করে দেন। কিন্তু যখন সম্পদ, মর্যাদা ও পদ-পদবীর চিন্তা একসঙ্গে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন তার দীনও নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত দুনিয়াও নষ্ট হয়ে যায়।
আজকের দুনিয়াতে যারাই এ লোভে পড়েছে, তারাই নিজেরা ধ্বংস হয়েছে, নিজের ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আর যদি ইসলামের লেবাস পরে এ কাজ দুটির পিছনে কেউ ছুটে চলে, সেটা হাসিলের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে তবে সে নিজেকে বরবাদ করেছে, ইসলামকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করেছে। আমরা আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে দীনের নিরাপত্তা, ক্ষমা ও কল্যাণ কামনা করি। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সম্পদ ও ক্ষমতা-মর্যাদার ধ্বংসাত্মক লোভ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
সহীহ, সুনান আত তিরমিজী
