চলতি বছর ১ জানুয়ারি, ভারত শাসিত কাশ্মিরের এক সাংবাদিক কুরাতুল আইন রেহবার ঘুম থেকে উঠে নিজেকে আবিষ্কার করেন এক ‘অনলাইন নিলামের’ নামের তালিকায়। অনুমতি ছাড়াই একটি অ্যাপে তার ছবি নিয়ে ‘বিক্রির’ জন্য দেয়া হয়েছে।
তিনি একাই নন।
এক শ’র বেশি মুসলিম নারীর ছবি ‘বুল্লি বাই’ নামের এই অ্যাপে নিলামের জন্য প্রদর্শন করা হয়। খ্যাতনামা অভিনেত্রী শাবানা আজমি, দিল্লি হাইকোর্টের দায়িত্বশীল এক বিচারপতির স্ত্রী, বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও রাজনীতিবিদ এই তালিকায় রয়েছেন।
এমনকি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ ছাত্র নাজিব আহমেদের মা, ৬৫ বছর বয়সী ফাতিমা নাফিস ও পাকিস্তানি নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইকে এই অ্যাপ থেকে ছাড় দেয়া হয়নি।
এর আগে গত বছর জুলাইয়ে ভারতে ‘সুল্লি ডিলস’ নামের একই ধরনের এক অ্যাপ চালু হয়েছিলো। ওই অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ৮০ মুসলিম নারীকে ‘বিক্রির জন্য’ নিলামে তোলা হয়েছিলো।
’সুল্লি ডিলসের’ এক বছরের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় এমন কোনো অ্যাপের কথা ভারতে শোনা গেলো।
ফ্যাক্ট চেকিং ওয়েবসাইট অ্যাল্টনিউজ প্রতিষ্ঠাতা ও ভারতীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ যুবায়ের সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, ‘বুল্লি ও সুল্লি স্থানীয় ভাষায় মুসলিম নারীদের বোঝাতে অবমাননাকর শব্দ। অবশ্য, বুল্লি বাইয়ে পাঞ্জাবি ভাষা ইংরেজির সাথে সাথে ব্যবহৃত হয়েছে।’
গত বছর জুলাইয়ে ‘সুল্লি ডিলস’ নামের মুসলিম নারীদের নিলামে তোলা অ্যাপ সম্পর্কে লেখালেখি করেন রেহবার। আলজাজিরাকে তিনি জানান, অ্যাপে নিজের ছবি থেকে তিনি হতভম্ব হন।
তিনি বলেন, ‘যখন আমি আমার ছবি দেখি, আমার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে। আমার হাতের লোম খাড়া হয়ে আসে এবং আমি অসাড় হয়ে পড়ি। এটি ভয়াবহ ও অবমাননাকর।’
যদিও এর সাথে প্রকৃত বিক্রির কোনো সম্পর্ক নেই। তবে রেহবারের মতে, মাইক্রোসফটের মালিকানাধীন মুক্ত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট সাইট গিটহাবে তৈরি এই অনলাইন অ্যাপলিকেশন ’জোরালো ভূমিকা রাখা মুসলিম নারীদের অসম্মান ও অবমাননা করার জন্য’ তৈরি হয়েছে।
শনিবার এই অ্যাপ অবশ্য বন্ধ করে দেয়া হয়।
কিন্তু শনিবার সন্ধ্যায় আরো কয়েক ডজন মুসলিম নারী অ্যাপটিতে তাদের ছবি ও বিবরণ দেখে নিজেদের হতভম্ব ও ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান।
তাদের মধ্যে রাজধানী নয়াদিল্লিতে বাসকারী সাংবাদিক ইসমত আরা একজন।
শনিবার দিল্লি পুলিশের কাছে ‘অজ্ঞাত ব্যক্তিদের’ বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ছবি বিকৃত করে অগ্রহণযোগ্য ও অশ্লীল বাক্য দিয়ে’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিম নারীদের হয়রানি ও অপমান করার জন্য একটি অভিযোগ দায়ের করেন ইসমত আরা।
অভিযোগের ভিত্তিতে রোববার দিল্লি পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এক প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন (এফআইআর) দাখিল করে, যাতে ভারতীয় পেনাল কোডের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে শত্রুতা, জাতীয় সংহতিকে হুমকি ও নারীর প্রতি যৌন হয়রানি সংক্রান্ত ধারা যোগ করা হয়।
তবে ইসমত আরা জানান, পুলিশের তদন্তের বিষয়ে তিনি আশাবাদী নন। এর আগের ‘সুল্লি ডিলসের’ ঘটনায় জড়িত কেউ ছয় মাসেও গ্রেফতার না হওয়ায় তিনি আশঙ্কা করেন, এই ঘটনারও একই পরিণতি হবে।
‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’ উভয় অ্যাপে নাম আসা মুম্বাইভিত্তিক আইনজীবী ফাতিমা জোহরা খান মুম্বাই পুলিশের কাছে এই বিষয়ে গত বছর এক অভিযোগ দায়ের করেন।
আলজাজিরার কাছে তিনি বলেন, ‘টুইটার, গিটহাব ও গো-ড্যাডির (মালিক কোম্পানি) কাছ থেকে আমরা কোনো সাড়া পাইনি যদিও মুম্বাই পুলিশের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। আদালতের ওয়ারেন্ট জারি ছাড়া এই ওয়েবসাইটগুলো কোনো তথ্য জানাতে অস্বীকার করেছে।’
এই বিষয়ে নয়াদিল্লি ও মুম্বাইয়ের পুলিশের বক্তব্য জানতে আলজাজিরার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ইসমত আরা বলেন, ‘এটি দুঃখজনক যে এই ঘৃণার প্রচারকারীদের কোনো ভয় ছাড়া মুসলিম নারীদের টার্গেট করার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এই ধরনের নিলামের ঘটনা এটিই প্রথম নয়।’
তিনি বলেন, ‘যে নারীদের টার্গেট করা হচ্ছে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলমানদের বিষয় নিয়ে আওয়াজ তুলে আসছে। এটি মুসলিম নারীদের মুখ বন্ধ করে দেয়ার পরিস্কার ষড়যন্ত্র কেননা আমরা হিন্দু রক্ষণশীল অনলাইনকে তাদের ঘৃণামূলক অপরাধের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছি।’
সূত্র : আলজাজিরা
