মধ্য দুপুরে মাথার ওপর সূর্যের প্রখর তাপ। তার চেয়েও বেশি তাপ আসছিল যেন পাশে থাকা আগুনের কুণ্ডলী থেকে। সেই সঙ্গে রাসায়নিক মেশানো ধোঁয়ার ঝাঁজ। সব কিছু উপেক্ষা করেই আগুন নেভানোর কাজ করে যাচ্ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী সোহেল।
এক পর্যায়ে কিছুটা বিরতি নিয়ে পাশে দাঁড়ান। তখন তাঁর চোখ ছলছল। পরক্ষণেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি।
সোহেল এরই মধ্যে জেনে গেছেন অনেক সহকর্মীকে হারিয়েছেন তিনি। আগুনের খবর পেয়ে সীতাকুণ্ডের কুমিরা ফায়ার স্টেশন থেকে তাঁরাই প্রথম যোগ দিয়েছিলেন তা নেভানোর কাজে। সেই আগুনযোদ্ধাদের অনেকে মারা গেছেন বিস্ফোরণে। শোকের জগদ্দল পাথর চেপে বসেছে যেন সোহেলের বুকে। কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। শুধু নীরবে কাঁদছিলেন।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে এই পরিস্থিতি চোখে পড়ে। সোহেলের পাশেই দাঁড়ানো ফেনী থেকে আসা আরেক আগুনযোদ্ধা জাকির হোসেন বললেন, ‘রাতে যখনই ডাক পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। সেই থেকে এখনো আছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের অনেক সহকর্মীকে হারিয়েছি। আমরা এই শোক সইতে পারছি না। ’
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, রাতে আগুনের খবর পেয়ে প্রথমেই আসেন কুমিরা ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা। তাঁরা ঝুঁকি নিয়েই আগুন নেভানোর কাজ করছিলেন। তখনই ঘটে বিস্ফোরণ। আর তাতে তাঁদের অনেকে হতাহত হয়েছেন।
পরে ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়েছে, ওই আগুনে ফায়ার সার্ভিসের ৯ জন কর্মী নিহত হয়েছেন এবং তিনজন নিখোঁজ আছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আটজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। আরেকজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী নিশ্চিত হওয়া গেলেও চেনা যাচ্ছে না।
নিহতদের মধ্যে শনাক্ত ব্যক্তিরা হলেন কুমিরা ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার রানা মিয়া, আলাউদ্দিন, শাকিল তরফদার, নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট মনিরুজ্জামান, লিডার মিঠু দেওয়ান, সীতাকুণ্ড ফায়ার স্টেশনের লিডার নিপন চাকমা, ফায়ার ফাইটার রমজানুল ইসলাম ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
নিখোঁজ আছেন কুমিরা ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার ইমরান হোসেন মজুমদার, শফিউল ইসলাম, সীতাকুণ্ড ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার রবিউল ইসলাম ও ফরিদুজ্জামান।
দুই ফায়ারকর্মী রাঙামাটির সন্তান
ফায়ার ফাইটারের উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে রাঙামাটির মিঠু দেওয়ান শনাক্ত হয়েছেন। তবে নিপন চাকমা নিখোঁজ রয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স রাঙামাটির সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আগুন নেভানোর কাজে মিঠু দেওয়ান ও নিপন চাকমা দায়িত্বরত ছিলেন। মিঠু দেওয়ান ফায়ার সার্ভিস কুমিরা শাখা আর নিপন চাকমা সীতাকুণ্ড শাখায় লিডার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মিঠু দেওয়ান রাঙামাটি জেলা শহরের পশ্চিম ট্রাইবেল এলাকার বাসিন্দা এবং নিপন চাকমা কলেজগেট এলাকার বাসিন্দা।
নোয়াখালীর আলাউদ্দিন
নিহত ফায়ার ফাইটার মো. আলাউদ্দিন (৩৬) নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আবদুর রশিদ মিয়ার ছেলে।
আবদুর রশিদ জানান, আলাউদ্দিন কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ছিলেন। তাঁর তিন বছরের একটি ছেলে আছে। তাঁকে রাতেই দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে খবর দেওয়া হয়েছে আলাউদ্দিন মারা গেছেন।
আলাউদ্দিনের মৃত্যুর খবরে পাগলপ্রায় মা মমতাজ বেগম। তিনি বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমার বাপে কই গেল। তারে আমার কাছে আইনা দেন। সে কোনো দিন কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে নাই। আমার পোলারে আইনা দেন। ’ আলাউদ্দিনের স্ত্রী শোকে বাকরুদ্ধ।
শেরপুরের রনি
নিহত রমজানুল ইসলাম রনি (২২) শেরপুর সদরের চর শেরপুর ইউনিয়নের হেরুয়া বালুরঘাট গ্রামের বাসিন্দা। তিনি গ্রামের আক্রাম হোসেন আংগুর মিয়ার ছেলে। রনির মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর থেকেই তাঁর স্ত্রী বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা লাশ আনতে চট্টগ্রামে গেছেন।
কচুয়ার ইমরান
সীতাকুণ্ডের ফায়ার স্টেশনের কর্মী ইমরান মজুমদারের (৪০) বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার উত্তর কচুয়া ইউনিয়নের সিংড্ডা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মকবুল হোসেন। ইমরানের দুই সন্তান রয়েছে। স্ত্রী আবার পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ইমরান ২০০১ সালে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
নাঙ্গলকোটের মনিরুজ্জামান
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার সাতবাড়ীয়া ইউনিয়নের নাইয়ারা গ্রামের ফায়ার সার্ভিসের কর্মী মনিরুজ্জামান। তিনি ওই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম সামছুল হকের ছোট ছেলে। মনির কুমিরা ফায়ার স্টেশনে নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
[তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সামসুল ইসলাম মীরন, নোয়াখালী, ফজলে এলাহী, রাঙামাটি, প্রিয়তুষ পোদ্দার, কচুয়া (চাঁদপুর), মাঈন উদ্দিন দুলাল, নাঙ্গলকোট]
