হেফাজতে ইসলামের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। ঢাকার পল্টন, মতিঝিল, রমনা, শাহবাগ, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও পটিয়া থানায় মোট ৩০টি মামলা রয়েছে তার নামে। দীর্ঘ ২১ মাস কারাভোগের পর গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর জামিনে মুক্ত হন তিনি। তবে অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি মিললেও তার দুর্ভোগের শেষ হয়নি। প্রায় প্রতি দিনই আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে তাকে। আজিজুল হক ইসলামাবাদী জানান, গত রোববার চারটি মামলায় চট্টগ্রামের সিএমএম আদালতে হাজিরা দেন তিনি। এর পরদিন সোমবার একটি মামলায় ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির হন। গতকাল মঙ্গলবার আবারো চট্টগ্রামের সিএমএম আদালতে অন্য চারটি মামলায় হাজিরা দিতে হয়। আজ বুধবার ঢাকায় রমনা ও পল্টন থানার দু’টি মামলায় হাজিরা রয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার আবার ঢাকার পল্টন থানার একটি মামলায় হাজিরা দিতে হবে। এভাবে প্রতিটি সপ্তাহ ঢাকা ও চট্টগ্রামের আদালতে ঘুরতে ঘুরতে দিন যাচ্ছে তার।
শুধু আজিজুল হক ইসলামাবাদীই নন, মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজীসহ অনেক হেফাজত নেতাকেই জামিনে মুক্তির পরও আদালতে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে। আর যারা এখনো জেলে রয়েছেন তাদের মধ্যে মাওলানা মামুনুল হককে ২৭টি মামলায় বিভিন্ন সময় আদালতে হাজির করা হয়। কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি জেলে রাখা হয়েছে তাকে। সেখান থেকে গতকালও তাকে নারায়ণগঞ্জের আদালতে নেয়া হয়। হেফাজত নেতাদের সূত্রে জানা যায়, জামিনে মুক্তি পাওয়া নেতাদের মধ্যে মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর নামে ৩০টি, মাওলানা জুনাইদ আল হাবিবের নামে ২০টি, মাওলানা মুফতি হারুন ইজহারের নামে ১৪টি, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজীর নামে ১৪টি, মাওলানা নাসির উদ্দিন মনিরের নামে ১৪টি, মুফতি বশির উল্লাহ মাদানীনগরের নামে ১৪টি, মাওলানা আমিনুল ইসলামের নামে ১৩টি, মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জীর নামে ১২টি, মাওলানা উবায়দুল্লাহ কাসেমী মধুপুরের নামে ১০টি, মাওলানা আতাউল্লাহ আমিনের নামে ৮টি ও মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদের নামে ৬টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া কারাগারে থাকা মাওলানা মামুনল হকের নামে ২৭টি, মুফতি নূর হোসাইন নুরানীর নামে ১০টি ও মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর নামে ৮টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া জামিনে মুক্ত থাকা ও কারাগারে অন্য অনেক নেতার নামেই মামলা রয়েছে। তাদেরও নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
আজিজুল হক ইসলামাবাদী নয়া দিগন্তকে বলেন, যারা জামিনে মুক্ত হয়েছেন তারা বাইরে যন্ত্রণায় ভুগছেন। আর যারা এখনো জেলে আছেন তারা মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারাগারে খুনি, দাগী আসামিরা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পেলেও আলেমদের জেলকোড অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। আসামিদের সকাল ও বিকেলে ভেতরে হাঁটতে দেয়া হয়। কিন্তু আলেমদের তাও দেয়া হয় না। আমি জেলে থাকা অবস্থায় আমার ছোট সন্তান এবং আমার মায়ের সাথেও সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি। তিনি জানান, গত ঈদুল আজহার পর মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী সব মামলায় জামিনে থাকায় তার মুক্তির জন্য আমরা প্রহর গুনছিলাম। কিন্তু তার নামে ঢাকার পল্টন, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে নতুন তিনটি মামলা দিয়ে তাকে আবার কারাগারে আটকে দেয়া হয়েছে। আর জামিন পাওয়া বয়োবৃদ্ধ জুনাইদ আল হাবিবকে অসুস্থ শরীর নিয়ে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
জানা যায়, কারাগারে থাকা ও জামিনে থাকা সাবেক সব নেতাদের আবারো হেফাজতের কমিটিতে বহাল করা হয়েছে। এসব নেতার মুক্তি ও হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজতের বর্তমান নেতারা। গত ২২ জুলাই রাজধানীর গুলিস্তানের কাজি বশির উদ্দিন মিলনায়তনে শায়খুল হাদিস পরিষদ আয়োজিত জাতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী নেতাদের মুক্তির আহ্বান জানিয়ে বলেন, বন্দী আলেমের মুক্তির দাবি আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। আমি সরকারকে বলব, যদি নিজেদের ভালো চান, অবিলম্বে কারাবন্দী সকল আলেমকে মুক্তি দিন। হয়রানি বন্ধ করুন।
একইভাবে গত ৫ আগস্ট হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভায় মাওলানা মামুনুল হকসহ কারাবন্দী সব ওলামায়েকেরামের দ্রুত মুক্তির দাবি জানানো হয়। আমিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত হেফাজত নেতাকর্মীদের নামে হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের বারবার আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও সবার মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অবিলম্বে সব নেতাকর্মীর মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণেরও দাবি জানান নেতারা।
এ প্রসঙ্গে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে হেফাজত নেতাদের মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছিলাম। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথেও এ ব্যাপারে আলোচনা করেছি। তিনি আইনমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেটি দেখছি না। কিছু আলেম জামিনে মুক্তি পেলেও তাদের সপ্তাহে তিন-চার দিন করে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। আজকে ঢাকায় তো কাল চট্টগ্রাম যেতে হচ্ছে। এতে তারা শারীরিক ও আর্থিক দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমরা চাই সরকার অবিলম্বে নেতাদের নামের মামলা প্রত্যাহার করবে। যত দিন প্রত্যাহার হতে দেরি হচ্ছে তত দিন যেন তাদের আদালতে হাজিরার দিন কমিয়ে দেয়া হয়।
