রাজধানী ঢাকা, দেশের সবচেয়ে বড় শহর। অথচ এটি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ধীর গতির শহর। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার তথ্য এটি। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গতির ১০০ শহরের মধ্যে ৮৬টিই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। আর সবচেয়ে দ্রুতগতির ২০টি শহরের ১৯টি যুক্তরাষ্ট্রে এবং একটি কানাডায়। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ফ্লিন্ট শহর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গতির শহর। ধীর গতির ২০ শহরের তালিকায় ঢাকা ছাড়াও বাংলাদেশের আরো দুটি শহর স্থান পেয়েছে। ময়মনসিংহ (৯ম) এবং চট্টগ্রাম (১২তম)। সবচেয়ে ধীর গতির ২০ শহরের তালিকায় ঢাকার পরে রয়েছে নাইজেরিয়ার দুই শহর লাগোস এবং ইকোরোদু। এরপর রয়েছে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা। ভারতের কলকাতা, মুম্বাইসহ আটটি শহর এই তালিকায় রয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, সড়কে যান চলাচলের গতি ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়াতে পারলে জিডিপি ১০ শতাংশ বাড়ে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট ও বিভিন্ন সূচকে ঢাকার নাজুক অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে। লন্ডনভিত্তিক সংগঠন ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২১ সালের ৯ জুন প্রকাশিত বিশ্বের সেরা ১৪০টি বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম। এ তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহর, দ্বিতীয় স্থানে জাপানের ওসাকা এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করে অস্ট্রেলিয়ার এডিলেড শহর। এই তালিকায় আমাদের ঢাকা শহরের অবস্থান ১৩৭তম এবং সর্বনি¤œ অর্থাৎ ১৪০তম স্থান অধিকার করেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক।
ঢাকা শহরে অনেক সমস্যা থাকলেও প্রধান সমস্যা যানজট এবং জলাবদ্ধতা। তাই এই দু’টি সমস্যা সমাধান করতে পারলে ঢাকা অধিকতর উন্নত ও বাসযোগ্য হতে পারে।
ঢাকার সড়কে প্রতিদিনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে। যে দিকেই যান, যানজট আছেই। যানজটে পড়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়নি, এমন রেকর্ড নেই। বিশ^ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা, যাতে বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। সংস্থাটির মতে, তীব্র যানজটের কারণে ঢাকার রাস্তায় গাড়ির গতিবেগ ঘণ্টায় গড়ে ৭ কিলোমিটার এবং ২০২৫ সাল নাগাদ ঢাকায় গাড়ির গড় গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটার। ২০১৭ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার উন্নয়ন সম্ভাবনা’ শীর্ষক বিশ^ব্যাংকের এক সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। ঢাকায় নিযুক্ত বিশ^ব্যাংকের তৎকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান বলেন, ১০ বছর আগেও ঢাকায় যানবাহনের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় গড়ে ২১ কিলোমিটার, যা এখন সাত কিলোমিটারে নেমেছে। এভাবে তো একটি শহর চলতে পারে না।
ঢাকা শহরকে উন্নত করতে হলে এই মুহূর্তেই বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার এই যানজট থেকে ঢাকাকে মুক্ত করতে অনেক ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছে। তাছাড়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেট্্েরারেল বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে যানজট অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এসব প্রকল্পের পাশাপাশি শহরের বেশ কিছু ক্রস পয়েন্টে ওভার পাস নির্মাণ করা হলে ঢাকার যানজট অনেকটাই লাঘব হতে পারে। এছাড়া ঢাকা শহরে জনসংখ্যাও কমাতে হবে।
অতিরিক্ত জনসংখ্যাই ঢাকা শহরের প্রধান সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখ। ২০৩৫ সালে সেটা বৃদ্ধি পেয়ে হবে তিন কোটি। জনসংখ্যার কারণে ঢাকা একটি ওভারলোডেড শহরে পরিণত হয়েছে। দেশের অন্যান্য শহরে নাগরিক সুবিধা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় প্রতিদিনই স্রোতের মতো মানুষ ঢাকা শহরে আসছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের ৪৫ শতাংশই ঢাকায়। স্বাভাবিকভাবেই ঢাকায় জনসংখ্যা বেশি।
তাই আবাসিক সঙ্কট, রাস্তায় মানুষের চলাচল এবং পরিবহন সঙ্কটও বেশি। তা ছাড়া সব দফতরের হেড অফিস ঢাকায় হওয়ার কারণে নানা কাজে মানুষকে বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসতে হয়। এত মানুষের চলাচলের জন্য যে পরিমাণ যানবাহনের প্রয়োজন এবং সেই যানবাহন সুষ্ঠুভাবে চলাচলের জন্য যে ধরনের রাস্তা দরকার তা ঢাকা শহরে নেই। যার ফলে নিয়মিতভাবেই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রথমেই ঢাকা শহরে মানুষের চাপ কমাতে হবে। এ জন্য ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ঢাকার মতো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। ঢাকা শহরে অবস্থিত শিল্পকারখানা বিশেষ করে গার্মেন্টস কারখানা শহরের বাইরে স্থাপন করতে হবে। ঢাকার বাইরে কতগুলো নির্দিষ্ট স্থানে বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পানির সরবরাহ নিশ্চিত করে সেখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন করতে হবে এবং সেখানেই ঢাকা শহরের শিল্পকারখানা সরিয়ে নিতে হবে এবং নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন করতে হবে। এর ফলে ঢাকা শহরে জনসংখ্যার চাপ কমবে, কারখানায় লোকজনের যাতায়াত এবং মালামাল পরিবহনের জন্য যেসব গাড়ি ঢাকা শহরের ওপর দিয়ে চলাচল করে তাও বন্ধ হবে। ফলে ঢাকা শহরে জনসংখ্যা এবং যানবাহন কমে আসবে। এতে গ্রাম উন্নত হবে এবং গ্রামে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। ফলে বেকার মানুষেরা কাজের সন্ধানে আর ঢাকায় আসবে না। একই সাথে ঢাকার বাইরে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নাগরিক সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। মোট কথা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সরকার সারা দেশে অনেকগুলো ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা করছে এবং সেখানেই শুধু শিল্প কারখানা স্থাপন করতে হবে। গ্রামকে শহরে পরিণত করতে হবে। ঢাকার পাশের পূর্বাচল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থাটির রিপোর্ট থেকে একটি কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত- সেটি হলো, অধিক জনসংখ্যার শহরগুলোতেই যানবাহনের গতি কম এবং কম জনসংখ্যার শহরগুলোতেই যানবাহনের গতি বেশি। এ অবস্থায় ঢাকায় যানবাহনের গতি বাড়াতে হলে বিকেন্দ্র্রীকরণের কোনোই বিকল্প নেই।
যানজটের নগরী ঢাকার আরেক সমস্যার নাম জলাবদ্ধতা। একটুখানি বৃষ্টি হলেই ঢাকা শহর জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন যানজট আরো বেড়ে যায় এবং নাগরিক জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
ঢাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে হলে শহরে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং নিয়মিত ড্রেনগুলো পরিষ্কার করতে হবে। পলিথিন, বোতল, ছেঁড়া কাপড় এবং আরো বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনায় ড্রেনগুলো ভরে থাকে। ফলে বৃষ্টি হলে বৃষ্টির পানি আর ঢাকার বাইরে নামতে পারে না। এ কারণে পানি জমে যায়। নগরীর খালগুলো চিহ্নিত করে পুনঃখনন করতে হবে। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো অভিজাত এলাকাসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুকুর, লেক এবং জলাশয় ভরাট করার যে প্রতিযোগিতা চলছে তা এখনই বন্ধ করতে হবে। পরিকল্পিত ড্রেনেজ এবং পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করেই ঘরবাড়ি এবং হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে। হাউজিং কোম্পানিগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়ন করতে হবে এবং তার যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বুড়িগঙ্গা দখল বন্ধ করতে হবে এবং শীতলক্ষ্যা খনন করতে হবে। কারণ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে শীতলক্ষ্যা আর আগের মতো পানি বহন করতে পারছে না।
সরকারি হিসাব মতে, ঢাকা শহরের ২৩টি খালের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। কাগজে-কলমে এগুলোর অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে এগুলো ভরাট হয়ে গেছে বহু আগেই। সুতরাং এসব খাল খনন করতে হবে এবং নগরীর ড্রেনগুলোর সাথে এসব খালের সংযোগ ঘটাতে হবে, যাতে করে অতি সহজেই ড্রেনের পানি খালে আসতে পারে। আর এসব খালের সাথে নদীর সংযোগ ঘটাতে হবে। এভাবেই পরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য রাজউককে বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে।
ঢাকা শহরের আশপাশের নিম্নাঞ্চল ভরাট করে হাউজিং কোম্পানির আবাসন তৈরির কারণে ঢাকা শহরের পানি আর আগের মতো নামতে পারছে না। পাশাপাশি নাগরিকদের যেখানে সেখানে ময়লা-আর্বজনা ফেলার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। কারণ সব কাজ সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়।
আমাদের নিজেদের স্বার্থেই নিজের শহরকে বসবাসের উপযোগী রাখতে হবে। তার জন্য পরিকল্পিত শহর গড়তে হবে। তার জন্য সুন্দর এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। ঢাকা শহর আমরাই তৈরি করেছি এবং একে বিপর্যয়ের হাত থেকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। তার জন্য দেশপ্রেমিক এবং নগর বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সুচিন্তিত সুনির্দিষ্ট পরামর্শ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
