৯ জুলাই ২০২৩ এ প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম, ‘পাখিদের মধ্যে বাড়ছে বিচ্ছেদ, কেউ জড়াচ্ছে পরকীয়ায়।’ জানা গেছে, পাখিদের প্রেম-বিয়েও নাকি এখন আর টিকছে না। ফটাফট প্রেম হচ্ছে আবার ঝটপট বিচ্ছেদও হয়ে যাচ্ছে। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। রয়্যাল সোসাইটির জার্নাল ‘দ্য প্রসিডিংস’ দাবি করেছে, চিন, অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পাখিদের মধ্যে বিড়ম্বনা দেখা দিয়েছে, তাদেরও সংসার টিকছে না।
সাধারণত পুরুষ ও স্ত্রী পাখি গাটছড়া বাঁধার পরে প্রথম সন্তান আসা ও তাদের দায়িত্ব পালনকাল পর্যন্ত এক সাথেই থাকে। এটিই পাখিদের নিয়ম। কিন্তু বিজ্ঞানীদের দাবি, ইদানীং প্রথম ব্রিড হওয়ার আগেই পুরুষ পাখি বা স্ত্রী পাখি অন্য সঙ্গী খুঁজে নিচ্ছে, অর্থাৎ ঘটছে বিচ্ছেদ। অন্যদিকে, লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ যেসব পাখির মধ্যে রয়েছে তারা সেটিও পছন্দ করছে না, অর্থাৎ পরিযায়ী পাখিরা আর বিশেষ নির্দিষ্ট এক সময়ের জন্য গাটছড়ায় আকৃষ্ট থাকছে না।
অন্যদিকে, ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পক্ষীবিদ ড. রস ক্রেটার বলেন, তিনি দেখেছেন, নিজের প্রজাতির মধ্যে ভাব বিনিময়ের যে মাধ্যম তাই ভুলে গেছে পাখিরা। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে এখন তারা অন্য প্রজাতির গান কিংবা ডাক নকল করছে। শুধু তাই নয়, ড. রস বলেছেন, মনুষ্যসৃষ্ট দূষণ আর পরিবেশ বদলের যে ভয়ঙ্কর প্রভাব আসতে চলেছে বিশ^জুড়ে তার সূচনা হয়ে গেছে।
বিজ্ঞানীরা আতঙ্কিত এটি দেখে যে, পাখিদের সমাজ-গোষ্ঠী আর টিকে থাকতে পারছে না। কেননা, পাখিরা বাসস্থান হারাচ্ছে মনুষ্যসৃষ্ট পরিবেশ ধ্বংসের কারণে। শুধু তাই নয়, পাখিরা যে গান শুনে, বুলি কিংবা ডাক শুনে সঙ্গীর কাছে ছুটে আসত সে প্রক্রিয়াই এখন বাধা পাচ্ছে মোবাইল নেটওয়ার্কের যুগে। পাখিদের বিচ্ছেদ বিড়ম্বনার জন্য বন-জঙ্গলের গাছ কেটে পাখির আবাস ধ্বংস করা, কংক্রিটের দালান প্রভৃতি তৈরি পাখিদের বাস্তুহারাই করেনি বরং মোবাইলের মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ ও নানা প্রকার গাড়ির আওয়াজে দিশেহারা পাখিরা। ভাব বিনিময়ের পদ্ধতি ভুলে গেছে, ভুলে যাচ্ছে। এ গবেষণার ফল অত্যন্ত মূল্যবান, পৃথিবীর জন্য এক অশনি সঙ্কেত।
এ বিষয়ে আমাদেরও কিছু অবজারভেশন রয়েছে। আমরা দেখতে পাই, মোবাইল টাওয়ারের কাছাকাছি গাছগুলো নিস্তেজ হতে হতে মরে যাচ্ছে, পাখির আনাগোনা উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। কোনো কোনো এলাকায় তো এমনও দেখেছি যে, পাখিরা বাসা বাঁধে কিন্তু ডিম পাড়ে না। কোথায় যেন চলে যায়, আবার ডিম পাড়লেও তাতে তা দেয় না, আশেপাশে কোথাও বসে সময় কাটায়। ক’দিন পরে আর তাদের দেখা যায় না। এসব নিয়ে আমরা কথা বলেছি। যত্রতত্র মোবাইল টাওয়ারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করেছি। আমাদের বিভাগ প্রাণিবিদ্যা, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিল্ডিংয়ের উপরে মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করতে দিইনি, যদিও কোনো কোনো বিভাগ তা সাগ্রহে গ্রহণ করেছে। সেমিনার করেছি, বিজ্ঞানীদের নিয়ে সমাবেশ করেছি, খুঁজেছি সুরাহা। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও করেছি। তবে একসময় নীরব হয়ে গিয়েছি। তার কারণ, মোবাইল ফোন ছাড়া চলবে না। দেশের সব নাগরিকের হাতে এই ফোন পৌঁছানোর অঙ্গীকার অস্বীকারের উপায় কী?
আমরা উন্নত বিশে^র দেশগুলোতে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তাদের মোবাইল টাওয়ারগুলো জনবসতি থেকে বহু দূরে জনহীন এলাকায় স্থাপিত। তাদের এ বিষয়ে চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু এখন কী দেখা গেল! যাই হোক, আমার আশঙ্কা যে, পাখিরা একসময় হারিয়ে যাবে। তবে গানের পাখিদের ব্যাপারে এটি দ্রুত ঘটবে, এদের যেহেতু Syrix ev voice box বেশি developed এ জন্য এরা সহজেই অন্যের গান ডাক বা বুলি, এমন কি যানবাহন বা যন্ত্রপাতির আওয়াজ কপি করতে পারে এবং এসব রপ্ত করে ফেলে, তখন আর নিজের গান কিংবা বুলি মনে রাখতে পারে না। একে বলে Imprinting. যেমন পোষা পাখি পাহাড়ি ময়নাটি একটি বাক্য ‘ভাইয়া আসছে’ ‘ভাইয়া আসছে’ রপ্ত করে ফেলে প্রতিদিন শুনে শুনে। বাড়ির ছেলেটি যখন ঘরে ফেরে তখন ছোট বোনটি বলে থাকে, ‘ভাইয়া আসছে’ ‘ভাইয়া আসছে’। পাখিটির মস্তিষ্কে printed হয়ে গেল প্রতিদিন শুনে শুনে; যা আর কখনো মুছে যাবে না। এমনকি পাখিটিকে প্রকৃতিতে নিজের আবাসে ছেড়ে দিলেও নয়। অন্যের বুলি দিয়ে কিংবা যন্ত্রপাতি বা গাড়ির আওয়াজ দিয়ে সাথীকে ডাকলে সাথী কি বুঝবে? আবেগতাড়িত হবে? জোড়া বাধবে? তাই তো বলা হয়, বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ।
সাধারণত বলা হয়ে থাকে, মোবাইল টাওয়ারের চেয়ে মোবাইল সেট কম ক্ষতির কারণ। আসলে এটি প্রমাণিত যে, বিকিরণের প্রভাব দুটোরই সমান। লোকচক্ষুর অন্তরালে কত কি-ই না ঘটে, মানুষের ক্ষেত্রেও বটে। যেমন Brain tumor, Irritable আচরণ, নিদ্রাহীনতা, হতাশা প্রভৃতি।
বিশে^র সবাই চিরসত্য কথাটি জানে যে, পরিবেশের কোনো বাউন্ডারি নেই, সে পলিটিক্যাল বাউন্ডারি মানে না। পরিবেশ ধ্বংসের কারণ যারা তাদের সাথে সমঝোতার প্রয়োজনে বিশ^ পরিবেশ নিয়ে কতই না কনফারেন্স, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন হচ্ছে। এ সবের ফলাফল কিছু সিদ্ধান্ত মাত্র। এর বেশি কিছু নয়। সামনে CoP-28। পরিবেশ রক্ষায় সিদ্ধান্তগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হবে তো? সবশেষে মোবাইল ফোনের উদ্ভাবক মার্টিন কুপারের ইদানীংকার বক্তব্যের শিরোনাম, ‘সবাই মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে’। তিনি বলেছেন, ‘আমি নিজে মোবাইল ফোনের নানা প্রকার ব্যবহার জানিও না, আগ্রহও নেই। শুধু প্রয়োজনে ফোন করি ও ফোন ধরি। শুধু ইমারজেন্সি প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়।’ হ্যাঁ, মোবাইল ফোনে আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় কাটানো ঠিক নয়। তাহলে হয়তো আমরা বিকিরণের প্রভাব থেকে খানিকটা হলেও রক্ষা পেতে পারি।
