বিয়ে যে ইলম সাধনা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, সে ব্যাপারে সাবধান করে উমার (রা.) বলেছিলেন, “বিয়ে আর নেতৃত্ব গ্রহণের পূর্বে তোমরা জ্ঞানার্জন করো।” ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ তার ছাত্রের জন্য রচিত ওসীয়তনামায় লিখেন,“ইলম অর্জনের আগে নারীর থেকে দূরে থাকো। এতে তোমার সময় নষ্ট হবে। পুত্র-কন্যা হবে। তুমি তাদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টায় লিপ্ত হবে। আর এভাবে ইলম থেকে দূরে থেকে যাবে।”
ইমাম সুফিয়ান আস সাওরী রহিমাহুল্লাহ উপমা দিয়ে সুন্দর করে বুঝিয়েছেন, “বিয়ে করা মানে নৌকায় চড়া। আর সন্তান হওয়া অর্থ নৌকার তলা ফেটে যাওয়া। যা পানিতে তলিয়ে যাবে যে কোন মূহুর্তে।” এ জন্য সালাফরা ছাত্রদের বিয়ে করতে নিষেধ করেন।
ইমাম খতিব বাগদাদি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “ছাত্রদের জন্য যথাসম্ভব বিয়ে না করা মুস্তাহাব।”
ইমাম ইবনুল জাওযী রহিমাহুল্লাহ এর কারণ ব্যাখ্যা করে লিখেন,“প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য আমি যথাসম্ভব বিয়ে না করাকে প্রাধান্য দেই। কেননা, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ চল্লিশ বছর বয়সে এসে বিয়ে করেন। আর এটা তিনি করেন, ইলম অর্জনের জন্য।”
অনেক সালাফদের কাছে বিবাহিত জীবন মানেই ছিল বন্দী জীবন। শায়খ মা’মর ইবনে রাশেদ রহিমাহুল্লাহ ছিলেন শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম। একবার ইয়ামানে তিনি হাদীস শিক্ষা দিতে গিয়েছিলেন। শায়খের জ্ঞান দেখে ইয়ামেনের মানুষ তাকে পছন্দ করে ফেললো। তারা তাকে আটকে ফেলার ব্যবস্থা করে ফেললো। কীভাবে? সেখানকার লোকেরা তাকে ইয়ামানের সম্ভ্রান্ত এক মেয়ের সাথে বিয়ে করিয়ে দিলো। বেচারা শায়খ আজীবনের জন্য ইয়ামানে আটকে গেলেন। বন্দী হলেন স্ত্রীর মায়াবী বন্ধনে। ‘বিয়ে মানেই বন্দীত্ব’ এ অবস্থার কথা ইঙ্গিত করে এক কবি মজা করে বলেন,“তারা বন্দী করলো এক নেকড়েকে,কী শাস্তি দেয়া যেতে পারে এটাকে? বুড়ো এক ব্যক্তি বলল, তাকে বিয়ে করিয়ে দাও,আর তার শাস্তিতে তাকে ছেড়ে দাও।”
ঈসা (আ.) সম্পর্কে একটি ঘটনা আহমেদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ তার ‘কিতাবুয যুহদ’- এ এনেছেন। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনি বিয়ে করেননি কেন?”ঈসা (আ.) জবাব দিলেন, “মরণশীল স্ত্রী দিয়ে আমি কী করবো?”
সালাফরা শুধু বড়ো বড়ো কথার মাঝেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাস্তব জীবনেও অবিবাহিত থেকে ইলমের প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রমাণ দেখিয়েছেন। জারির আত তাবারী রহিমাহুল্লাহ হচ্ছেন সবচেয়ে সেরা কুরআনের তাফসীরের রচয়িতা। সে তাফসীরের সমতুল্য তাফসীর আজো লেখা সম্ভব হয়নি। তিনি ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠার একটি তাফসীর লেখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। ছাত্ররা ভয় পেয়ে যাওয়াতে তিন হাজার পৃষ্ঠার তাফসীর লিখেন। ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ সে তাফসীর থেকে দূর্বল দলীল বাদ দিয়ে আরো ছোট করে একটি তাফসীর লিখেন। যা এখন ‘তাফসীর ইবনে কাসির’ নামে পরিচিত। আমরা তো ‘তাফসীর ইবনে কাসির’ পড়েই শেষ করতে পারি না। জারির আত তাবারী (রহ) চিরকুমার ছিলেন। তিনি গর্ব করে বলতেন, “জীবনে কোন নারীর জন্য আমি আমার সেলোয়ার খুলিনি। না হালাল, না হারাম।”
ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ হচ্ছেন রিয়াদুস স্বলেহীন, আল আরবাঈন, শরহু সহীহ মুসলিম সহ আরো অসংখ্য অসাধারণ গ্রন্থের লেখক। ইলম অর্জনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি জীবনের এক মুহুর্ত সময়ও নষ্ট করেননি। একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “বিয়ে করেননি কেন?” উনি জবাব দিলেন, “ভুলে গিয়েছি।”
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ প্রায় ৩৫০ গ্রন্থের রচয়িতা। তাকে ছাড়া যথাযথ ইলম অর্জন অসম্ভব। শুধু ইলম অর্জন না জিহাদের ময়দানেও ছিলেন একইভাবে পারদর্শী। কলম আর তরবারী দুইটিই তার সমান তালে চলেছে। তাতারীদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের একত্রিত করেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে মাথা পেতে নিয়েছেন কারাগারকে। শায়খ অবিবাহিত ছিলেন।
আরো অনেক সালাফদের কথা আনা যায়। আবু বকর আল আম্বারী রহিমাহুল্লাহ সনদসহ ১২০টি তাফসীর মুখস্থ বলতে পারতেন। কুরআন কারীমের অর্থ ও মর্ম জানার জন্য তিন লক্ষ কবিতার পঙক্তি মুখস্থ করেছিলেন। তিনিও অবিবাহিত ছিলেন। একবার এক দাসীকে ঘরে এনেছিলেন। কিন্তু দেখলেন দাসীর কারণে অন্তর ইলম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সাথে সাথে সে দাসীকে বিদায় করে দেন।
আরো বলা যায়, আবু নাসর আস সিজঝির রহিমাহুল্লাহর কথা। তার লেখা “আল ইবানাতুল কুবরা” একটি বিশাল বই। এ বইয়ে তিনি কুরআনের অর্থ ও মহিমার কথা এনেছেন। জ্ঞানীদের কাছে এই বই অতি আশ্চর্যের এক নাম। এক মহিলা একবার তার কাছে একশো দিনার নিয়ে এসে বিয়ের প্রস্তাব দিলো। বলল, “যদিও আমার বিয়ের তেমন প্রয়োজন নেই, তবুও আপনাকে সেবা করার জন্য বিয়ে করতে চাই।” শায়খ তাকে দীনারসহ ফিরিয়ে দিলেন।মহিলাটি চলে যাবার পর শায়খ বললেন, “আমি সিজিস্তান থেকে ইলম অর্জনের জন্য বের হয়েছি। কিন্তু বিয়ে করলে তালিবুল ইলমের খাতা থেকে আমার নাম বাদ পড়ে যাবে।”
