Thursday, April 23, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরজাতীয়আইএমএফের পরামর্শে সরকারি সিদ্ধান্ত!

আইএমএফের পরামর্শে সরকারি সিদ্ধান্ত!

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ৫ মাসের মাথায় হঠাৎ করে শতাধিক পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এতে অনেক পণ্য বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে। অসৎ ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম সরকারের বাড়ানোর চেয়ে তিনগুণ চারগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। নতুন প্রজ্ঞাপনে মোবাইল ফোনে কথা বলা, রেস্তোরাঁর খাবার, সিগারেট, পোশাক, এলপি গ্যাস, কোমল পানীয়সহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে মোবাইল ইন্টারনেটসহ দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টানেটের খরচও। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং দ্য এক্সাইজ অ্যান্ড সল্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করেছে সরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপর জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তুলতে হাসিনার অলিগার্ক আমলারা বছরের শুরুতে শতাধিক পণ্যে ভ্যাট বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। আসছে অর্থ বছরে বাজেটের সময় সরকার এই ভ্যাট বাড়াতে পারতো। কিন্তু আইএমএফের পরামর্শে আমলাদের চক্রান্তে এখনই পণ্যের উপর ভ্যাট বসানো হলো।

গতকাল রাজধানীর কয়েকটি স্পটে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বছরের শুরুতে হঠাৎ করে শতাধিক পণ্যের উপর ভ্যাট বৃদ্ধি করায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপর চরম অসন্তুষ্ট। তারা বলছেন, সরকারকে বিতর্কিত করতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত হাসিনার অলিগার্ক আমলাদের ফাঁদে পা দিয়ে মানুষকে শাস্তি দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। মানুষ যাতে বলতে পারে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে আগের হাসিনার সরকার ভাল ছিল’ এমন ক্ষেত্র সৃষ্টির চেষ্টায় এটা করা হয়েছে।

হঠাৎ করে শতাধিক পণ্যে ভ্যাট বৃদ্ধি করায় ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। সীমিত আয়ের মানুষ বলছেন, গত এক বছর মানুষ প্রচ- চাপের মধ্য দিয়ে পাড় করছে। মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যস্ফীতির গ্যাঁড়াকলে মানুষ এমনিতেই নাজেহাল। নতুন করে পণ্যে ভ্যাট বসালে অসৎ ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়িয়ে দেবে। এতে করে মানুষের বেঁচে থাকাই আরো কঠিন হবে। কেউ কেউ বলছেন, আগামী অর্থ বছরের বাজেটে পণ্যের দাম বাড়ানো যেত। কিন্তু সেটা না করে বছরের শুরুতে হঠাৎ করে ভ্যাট বাড়িয়ে সরকারকে জনগণের কাছে বিতর্কিত করে তোলা হচ্ছে। এটা পর্দার আড়ালে থেকে হাসিনার অলিগার্ক আমলারা অন্তর্বর্তী সরকারকে অজনপ্রিয় করে তুলতে এমন সিদ্ধান্ত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন কেউ কেউ।

শরিফুর ইসলাম পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায়। শুল্ক বাড়ার খবর শুনে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে তার কপালে। টানাপোড়েনের সংসার আয় কম বলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভাল স্কুলে দিতে পারেননি সন্তানদের। সেখানে যদি আরও খরচ বাড়ে, তা বাড়তি চাপ হবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। বললেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্তর্বর্তী সরকার এনেছি এই ভ্যাট বৃদ্ধির জন্য নয়। সরকার আগামী অর্থ বছরে ভ্যাট বাড়াতে পারতো। তা না হলে এমন সিদ্ধান্ত আমাদের টিকে থাকাই কঠিন করে তুললো।

বছরের শুরুতে শুল্ক বাড়ার ফলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা সবচেয়ে বিপদে পড়বেন, এমন আশঙ্কা অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রকাশ করেছেন। নেটিজেনদের কেউ কেউ সংবাদপত্রে প্রকাশিত শুল্ক বৃদ্ধির সংবাদও শেয়ার করে দিচ্ছেন এ সংক্রান্ত পোস্ট। শুল্ক বৃদ্ধিতে সব মানুষের জীবন যাপনে প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে পোস্ট দিচ্ছেন তারা। কেউ কেউ লিখেছেন, হাসিনার অনুগত আমলারা জনগণের কাছে অন্তর্র্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করে তুলতেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। উপদেষ্টাদের মধ্যে দায়িত্বশীল এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি থাকলে এমন কা- ঘটাতেন না।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেলেই ভ্যাট গুণতে হচ্ছে বিষয়টা এখন আর সেখানে থাকছে না। এবার ঘরে রেঁধে খেলেও দিতে হবে অতিরিক্ত ভ্যাট। শুধু তাই নয় ফলমূল, খাদ্যসামগ্রীর সঙ্গে সরকার ভ্যাট বাড়িয়ে দিয়েছে মোবাইলে কথা বলার ক্ষেত্রেও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ করে ব্র্যান্ডের পোশাক কিনতে গেলে দিতে হবে আগের চেয়ে দিগুণ ভ্যাট। বাড়তি এ করের চাপ এমন সময়ে এলো যখন মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভোক্তারা বলছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত মানুষের জীবন মানের ওপরে যেন মড়ার ওপরে, খাঁড়ার ঘা।

মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের সামনে ফুটপাথে ব্যবসা করেন নাসির হোসেন। ১৯ বছরের ব্যবসা তার। তিনি বলেন, মানুষ মনে করে ফুটপাথের ব্যবসায় অনেক বেশি লাভ। বিষয়টা হলো যখন সিজন পরিবর্তন বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়, তখন সবচেয়ে বিপদে পরে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়েছে। তারপর পরিস্থিতি ঠিক হলেও আগের মতো ক্রেতা নেই। তাছাড়া ফুটপাথ থেকে বেশি টাকা খরচ করে পণ্য কিনতে চান না ক্রেতারা। এখন ভ্যাট বাড়লে আমাদেরও পণ্যের দাম বাড়াতে হবে। সেখানে প্রতিযোগিতার বাজারে কতটা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারব সেটা ভাবছি।
রাজধানীর দেশীয় ব্রান্ড কে-ক্রাফটের কর্মী সুমন হোসেন বলেন, আগে বছরে বড় একটা ডিসকাউন্ট দেওয়া হতো। সেখানে গেল বছর চারটা বিগ ডিসকাউন্ট দিয়েও আশানুরূপ বিক্রি করা যায়নি। ভ্যাট বাড়লে সাধারণভাবে পোশাকের দামও বাড়বে। সেখানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা আরও চ্যালেঞ্জের হয়ে যাবে।

ঢাকা বার কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার চালাতে গেলে কর বাড়াতে হবে এটা ঠিক। সেটা বছরের শুরুতে কেন? অন্তর্বর্তী সরকারের উপর জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলতে কি হাসিনার অনুগত আমলারা এই সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে বাধ্য করলো?

ইমরান হোসেন ব্যবসায়ী বলেন, এখন সবাই মোবাইল ব্যবহার করেন। আমরা যারা ব্যবসায়ী তাদের মোবাইলে প্রতিদিন অন্তত ১০০টা কল করতে হয়। মানুষকে অফার জানাতে হয়, নিজেদের কার্যক্রম তুলে ধরতে হয়। কেউ যখন কথায় ইমপ্রেস হয়ে বুক করে তখন সেখান থেকে কমিশন পাই। এছাড়া কখনো কখনো বিভিন্ন অফিসে গিয়েও টুরিস্ট ধরতে হয়। যে মাসে বেশি টুরিস্ট বুকড হয়, সে মাসে কমিশন বেশি। এখন জিনিষপত্রের দাম যদি আরও বাড়ে এই স্বল্প আয় দিয়ে মানুষের জীবন যাপনই মুশকিল হয়ে যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবচেয়ে দুশ্চিন্তা দেখা গেছে একদল প্রান্তিক পর্যায়ের খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে। গুলিস্তানে কথা হয় ফুচকা বিক্রেতা মো. আরিফের সঙ্গে। তিনি এখনো জানেন না সরকার খাদ্যপণ্যের ওপরে ভ্যাট বাড়িয়েছে। তিনি শুনে অস্থিরতা প্রকাশ করে বলেন, এমনিতেই মানুষ এখন অনেক স্বাস্থ্য সচেতন। রাস্তাঘাটে ভাল খাবার নিয়ে এলেও অনেকেই খেতে অনীহা প্রকাশ করেন। তাছাড়া সাজানো দোকানগুলোতে এসিতে বসে গল্প করে খাবার খেতেই যেন এ প্রজন্ম পছন্দ করে। এই পরিস্থিতিতে যদি খাবারের দাম বাড়িয়ে দিই তাহলে তো একেবারেই ক্রেতাশূন্য হবো আমরা। এই যে সকাল থেকে দুপুর গড়াচ্ছে মাত্র ১৫০ টাকা আয় হয়েছে। ফুটপাথের জুতা দোকানদার সেলিম মিয়া বলেন, সকালে ফেসবুকে দেখেছি কিন্তু বিষয়টা কি সেটা বুঝতে পারিনি। আমরা তো কারখানায় গেলে টের পাই কোনটার দাম কত বাড়ল। এর আগে জানতে পারি না।
এদিকে ভ্যাট বৃদ্ধি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে নানা লেখালেখি। এনজিও কর্মকর্তা শরিফুল হাসান লিখেছেন ‘মানুষকে কষ্ট দেওয়ার এইসব কর কমান।’ আফরি আয়শা নামের একজন লিখেছেন ‘শুল্ক ও কর বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির এসব হিসাব বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ বোঝে না। সাধারণ মানুষ বোঝে তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারা। পারবে খেতে? আপনি হয়তো পারবেন, গরিবরা যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে, খেটে খাওয়া মানুষ, তারা পারবে?’ আরাফাত সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘দাম কমানোর মুরোদ নেই, শুল্ক বাড়ানোর গোসাই।’

আল আমীন মাহমুদ লিখেছেন ‘কর বা শুল্ক কতটুকু সঠিক আদায় হয় তা নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাদ দেওয়া এগুলো বেশি দরকার ছিল। অতিরিক্ত ভ্যাট এ সাধারণ জনগণ অসাধারণ হয়ে উঠবে না। অতীতে যা ছিল তার থেকে একটু ভালো থাকাই তো প্রত্যাশা।’

অর্থ বছরের মাঝে হঠাৎ শতাধিক পণ্য ও সেবার ওপরে ভ্যাট ও সম্পূর্ণ শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে ভোক্তা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সংগঠন এমনকি অর্থনীতিবিদরাও এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করছেন। যদিও এনবিআর বলছে, এই শুল্কের আওতায় নিত্যপ্রয়োজনী পণ্য পড়বে না। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যপণ্য, মেডিসিন, রেস্তোরাঁর খাবার, মোবাইলে কথা বলা, বিদেশি জুস বা ফল এসবে বাড়তি করারোপ করা হয়েছে, সেসবই নিত্যপণ্য। ফলে এতে নিঃসন্দেহে মানুষের ব্যয় বাড়বে। তবে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন ভ্যাট বাড়লেও পণ্যের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না। তার দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় টোল হচ্ছে।

জানা গেছে, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফ থেকে বিভিন্ন শর্তে ৪৭০ কোটি ঋণ নিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। সেই শর্তে ছিল রাজস্ব আহরণ বাড়ানো। মূলত আইএমএফ’র শর্ত পূরণেই অন্তর্বর্তী সরকার বছরের শুরুতে শুল্ক ও কর বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

fourteen + six =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য