ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও থামেনি ইসরায়েলের হামলা ও সহিংসতা। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে প্রতিনিয়ত নতুন লাশ উদ্ধার হচ্ছে, আর সেইসঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে নিহতদের তালিকা। মানবিক বিপর্যয়ের এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আবারও উদ্বেগ জানিয়ে বলছে— গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংসের পথে, আর পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল গত মাসে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সাময়িক শান্তি চুক্তির পর। উদ্দেশ্য ছিল গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, আহতদের সরিয়ে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে কিছুটা নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি তার উল্টো চিত্রই দেখাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও গাজায় ইসরায়েলি সেনা ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার (৮ নভেম্বর) আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুনভাবে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলোর কারণে গাজার মোট নিহতের সংখ্যা এখন ৬৯ হাজার ১৬৯ জনে পৌঁছেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৯ হাজার ছাড়িয়েছে। এই সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, কারণ ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনও মৃতদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অন্তত ২৪০ ফিলিস্তিনি নতুন করে নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে যুদ্ধবিরতি কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
শনিবারও নতুন হত্যার খবর আসে গাজা থেকে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, উত্তর গাজায় তাদের অবস্থানরত সেনাদের দিকে অগ্রসর হওয়া এক ফিলিস্তিনিকে তারা গুলি করে হত্যা করেছে। ওই ব্যক্তি ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত সীমারেখা অতিক্রম করেছিলেন। দক্ষিণ গাজাতেও একই অভিযোগে আরও একজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। সেনারা দাবি করেছে, তিনি নাকি তাদের জন্য “তাৎক্ষণিক হুমকি” তৈরি করেছিলেন।
‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ সীমারেখাটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত পিছু হটবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলি সেনারা এই সীমারেখার কাছাকাছি পৌঁছানো ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর দিকেও গুলি চালাচ্ছে। ফলে সাধারণ নাগরিকরা নিজেরাই আবারও প্রাণের ঝুঁকিতে পড়ছেন। খান ইউনিসে ইসরায়েলি বাহিনীর ফেলে যাওয়া বিস্ফোরকের কারণে এক ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানিয়েছে নাসের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জরুরি ভিত্তিতে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে গুরুতর আহত ও অসুস্থদের চিকিৎসার জন্য মিসরসহ অন্যান্য দেশে নেওয়া যায়। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ফিলিস্তিনি রোগী বিদেশে চিকিৎসার জন্য রাফাহ সীমান্ত পাড়ি দিয়েছেন। তবে আরও ১৬ হাজার ৫০০ জন চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন, যাদের জীবন প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
গাজা যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, তখন পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি সেনা অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব হামলা মূলত ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমি থেকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনার অংশ। শনিবার দক্ষিণ নাবলুসের বেইতা শহরে জলপাই সংগ্রহে ব্যস্ত ফিলিস্তিনি গ্রামবাসী, কর্মী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায় একদল মুখোশধারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী।
ইসরায়েলি মানবাধিকারকর্মী জোনাথন পোলাক আল জাজিরাকে বলেন, “মুখোশ পরা ডজনখানেক বসতি স্থাপনকারী লাঠি ও বড় পাথর নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা পাহাড় থেকে নেমে বিশাল পাথর ছুড়তে থাকে, আমাদের পালাতে হয়।” এই হামলায় অন্তত ডজনখানেক মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক ও এক ৭০ বছর বয়সী কর্মী। প্যালেস্টাইন জার্নালিস্টস সিন্ডিকেট জানিয়েছে, পাঁচ সাংবাদিক — রানিন সাওয়াফতে, মোহাম্মদ আল-আত্রাশ, লুয়াই সাঈদ, নাসের ইশতাইয়েহ ও নাঈল বুয়াইতেল — আহত হয়েছেন। সংগঠনটি এই ঘটনাকে “সাংবাদিক হত্যার উদ্দেশ্যে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। রয়টার্সও নিশ্চিত করেছে, তাদের দুই কর্মী—এক সাংবাদিক ও তার নিরাপত্তা পরামর্শক আহত হয়েছেন।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিম তীরের অন্তত ৭০টি শহর ও গ্রামে ১২৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় প্রায় ৪ হাজার জলপাই গাছ ধ্বংস বা উপড়ে ফেলা হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও বড় আঘাত। আন্তর্জাতিক মহল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছে, এই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ইসরায়েল শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ জীবিকা ও পরিবেশকেও ধ্বংস করছে। তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা
