সালটা ২০২৫। ১০ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়। কিন্তু এরপর থেকে, ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ঐ দিন থেকে ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারী পর্যন্ত বিমান, কামান এবং সরাসরি গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ইসরায়েল কমপক্ষে ১,১৯৩ বার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
সেখান থেকে আর জানানো হয়েছে যে ইসরায়েল বেসামরিক নাগরিকদের উপর ৩৮৪ বার গুলি চালিয়েছে, গাজায় ৫৫১ বার বোমাবর্ষণ ও গোলাবর্ষণ করেছে এবং ১৯২ বার জনগণের সম্পত্তি ধ্বংস করেছে। এতে আরও বলা হয়েছে যে দখলদার ইসরায়েল গত মাসে গাজা থেকে ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে অন্যায়ভাবে আটক করেছে।
তাছাড়াও দখলদার ইসরায়েল হলুদ রেখার বাইরে আবাসিক এলাকায় ৬৬ বার অভিযান চালিয়েছে। হলুদ রেখা হলো একটা নির্দিষ্ট সীমানা, যার মধ্যেই আইডিএফ বাহিনী আক্রমণ চালাতো। কিন্তু গত অল্প কয়েক দিনেই দখলদার বাহিনী এই সীমা অতিক্রম করেও অভিযান চালিয়েছে। ইসরায়েল পুরো উপত্যকা জুড়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সাহায্যগুলো আটকে রেখেছে। একইসাথে তারা ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করাও অব্যাহত রেখেছে।

যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী কী কী?
গত বছর ২৯শে সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের অবসান, ছিটমহলে আটক অবশিষ্ট বন্দীদের মুক্তি, অবরুদ্ধ অঞ্চলে মানবিক সহায়তার পূর্ণ প্রবেশের অনুমতি এবং ইসরায়েলি বাহিনীর য় প্রত্যাহারের রূপরেখা তৈরির জন্য ২০ দফা প্রস্তাব উন্মোচন করে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল-
১. গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির অবসান।
২. ইসরায়েল কর্তৃক বিভিন্ন মানবিক সাহায্যের উপর যে অবরোধ দেওয়া হয়েছিল তা তুলে নেওয়া এবং সাহায্য বিতরণে হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
৩. গাজায় হামাস কর্তৃক জীবিত বা মৃত সকল বন্দীর মুক্তি
৪. ইসরায়েলি কারাগার থেকে প্রায় ২,০০০ ফিলিস্তিনি বন্দী এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের মুক্তি
৫. হলুদ রেখায় ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার
মিশর, কাতার এবং তুরস্কসহ অন্যান্যদের মধ্যস্থতার পর প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধিরা ১৩ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে একত্রিত হন। তবে এখানে ইসরায়েল এবং হামাসের প্রতিনিধিরা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ অনুপস্থিত ছিল। ফলে ১৮ বছর যাবৎ চলা অবরোধ, সহিংসতা ও গণহত্যার সমাধান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
প্রশ্ন ওঠার আরও একটি কারণ হলো ইসরায়েল স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে না দেওয়ার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ। আবার গাজায় গণহত্যা চলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং কূটনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। আর বিপরীতে গাজার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কেবল অস্পষ্ট বিবৃতিই দিয়েছে।
ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালায়

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণ অনুসারে, যুদ্ধবিরতির গত ৯৪ দিনের মধ্যে ৭৯ দিনেই ইসরায়েল গাজায় আক্রমণ করেছে। অর্থাৎ মাত্র ১৫ দিন ছিল যে সময়ে কোনও সহিংস হামলা, মৃত্যু বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। অব্যাহত আক্রমণ চলা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলছে যে ‘যুদ্ধবিরতি’ এখনও বহাল রয়েছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, ১০ অক্টোবর দুপুরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে, ইসরায়েল কমপক্ষে ৪৪২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ১,২৪০ জনকে আহত করেছে। ১৯ এবং ২৯ অক্টোবর ছিল সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে ভয়াবহ দুটি দিন। এই দুই দিনেই ইসরায়েল মোট ১৫৪ জনকে হত্যা করেছিল।
১৯ অক্টোবরে রাফায় দুই ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হয়। এরপর হামাসের দিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঠুনকো অভিযোগ ছুঁড়ে দেয় ইসরায়েল। হামাসের সশস্ত্র শাখা ‘কাসেম ব্রিগেড’ থেকে জানানো হয়েছে যে রাফাহ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এবং সেখানকার কোনো ফিলিস্তিনি যোদ্ধার সাথে তাদের কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু এরপর গাজা উপত্যকা জুড়ে এক বিশাল বিমান হামলায় আইডিএফ বাহিনী ৪৫ জনকে হত্যা করে।

২৯ অক্টোবর রাফায় ইসরায়েল ৫২ জন শিশুসহ ১০৯ জনকে হত্যা করে। ট্রাম্প সাংবাদিকদেরকে বলেন যে এটা ইসরায়েলি সৈন্য মৃত্যুর ‘প্রতিশোধ’। তিনি বিশ্ব বিবেকের দিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলেন, “ইসরায়েলিরা পাল্টা আক্রমণ করেছে এবং তাদের পাল্টা আক্রমণ করাই উচিত।” ২২ নভেম্বর উত্তর ও মধ্য গাজা জুড়ে ইসরায়েলি ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কমপক্ষে ২১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং অনেকেই আহত হন।
তো এভাবেই চলছে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রতিষ্ঠা। গাজায় ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১২ই জানুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ৭১,৪১৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২০,১৭৯ জনই শিশু। আর এই ইসরায়েলি সন্ত্রাসে আহত হয়েছেন ১,৭১,৩১৮ জন।

ইসরায়েল আটকে দিচ্ছে ত্রাণ
যুদ্ধবিরতিতে বলা হয়েছিল যে গাজা উপত্যকায় অবিলম্বে পূর্ণ সাহায্য বা ত্রাণ পাঠানো হবে। তবে বাস্তবতা এখনও সম্পূর্ণ ভিন্ন। গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর, ২০২৫ থেকে ৯ জানুয়ারী, ২০২৬ পর্যন্ত ৫৪,০০০ ট্রাকের মধ্যে মাত্র ২৩,০১৯টি ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে, মানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫৫টি ট্রাক যেতে পেরেছে। এটি বরাদ্দকৃত ট্রাকের মাত্র ৪৩ শতাংশ।
ঐসকল ট্রাকের চালকদের মতে, ত্রাণ সরবরাহে যথেষ্ট দেরি হচ্ছে। কারণ ইসরায়েলি বাহিনীর তল্লাশিতে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। এছাড়াও ইসরায়েল সুষম খাদ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং শাকসবজিসহ প্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্য নিষিদ্ধ করেছে। এর পরিবর্তে পুষ্টিহীন খাবার যেমন স্ন্যাকস, চকোলেট, ক্রিসপ এবং কোমল পানীয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বন্দি মুক্তিঃ হামাস বনাম ইসরায়েল
যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুসারে, দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকা ২৫০ জন ফিলিস্তিনি এবং ৭ অক্টোবর, ২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েল কর্তৃক নিখোঁজ ১,৭০০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে হামাস ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি বন্দীকে মুক্তি দেয়। চুক্তির অংশ হিসেবে, ইসরায়েলের হাতে থাকা ৩৬০ জন ফিলিস্তিনি মৃতদেহের বিনিময়ে হামাস ২৮ জন ইসরায়েলি বন্দীর মৃতদেহ ফেরত দেবে বলেও জানা যায়।
আর ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত হামাস ২৭ জন ইসরায়েলি বন্দীর মৃতদেহ ফিরিয়ে দিয়েছে, যার মধ্যে গাজায় মাত্র একজন অবশিষ্ট রয়েছে। তবে তারা জানিয়েছে যে ইসরায়েলিদের বোমাবর্ষণের ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া অবশিষ্ট বন্দীর মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য ভারী খনন সরঞ্জামের প্রয়োজন।
কিন্তু ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ৩০০ টিরও বেশি ফিলিস্তিনি মৃতদেহ ফিরিয়ে দিয়েছে, যার মধ্যে অনেকের দেহ বিকৃত এবং নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। আবার অনেকেরই এখনও পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

গাজা আজ ভালো নেই। গাজার আকাশে অন্ধকার ধোঁয়া, মাটিতে চিৎকার আর হৃদয়ে আর্তনাদ। পরিসংখ্যান অন্তত সেটাই বলছে।
সূত্রঃ আল-জাজিরা
