Thursday, July 30, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরআন্তর্জাতিকএবার ত্রিমুখী হামলার শিকার সৌদি আরব

এবার ত্রিমুখী হামলার শিকার সৌদি আরব

গত পাঁচ মাস ধরে যেকোনো মূল্যে আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। ইরানি ড্রোন তাদের তেল শিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করার পরও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল দেশটি। তবে এখন আর শান্ত থাকার সুযোগ নেই।

ইরান, তাদের সমর্থিত ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী—তিন দিক থেকে শত্রুপক্ষ এখন সৌদি আরবকে কোণঠাসা করে ফেলছে।

গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকের মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলা এবং তেহরানের নতুন হুমকির মুখে পড়েছে রিয়াদ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৌশল বদলে গত মঙ্গলবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে পূর্ব ইরাকে বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি যুদ্ধবিমান।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি বৃহত্তর সংঘাত বা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া রিয়াদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং চরম ব্যয়বহুল হতে পারে। কারণ, গত এক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নিজেকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার দিকেই মনোনিবেশ করেছিল। এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যই তারা ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।

তবে সেই কূটনৈতিক কৌশল এখন ব্যর্থ হতে বসেছে। সৌদি আরব বর্তমানে এক বিশাল ঝড়ের মুখে। তিন দিক থেকে একের পর এক অপ্রত্যাশিত আক্রমণের মুখোমুখি হওয়াটা দেশটির প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৌদি আরব বিগত বছরগুলোতে সেনাবাহিনী আধুনিকায়ন এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনতে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে। তবে বিশাল ভূখণ্ড, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তায় তাদের এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

হুতিদের কড়া বার্তা ও নতুন হুমকি

সম্প্রতি লোহিত সাগর উপকূলে সৌদির দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এতে দেশটির জাজানের কাছে একটি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর আগে বাব আল-মানদে প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজের যাতায়াত রুখে দিতে দুটি ট্যাংকারেও হামলা চালায় হুতিরা।

ইরান সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালি স্থবির হয়ে পড়ায় ইয়াানবুর মতো লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে সৌদি। তবে এশীয় বাজারে পাঠানোর জন্য ট্যাংকারগুলোকে অবশ্যই বাব আল-মানদে অতিক্রম করতে হবে, যার ফলে তাদের ৭৫ শতাংশ রপ্তানিই হুতিদের আক্রমণের মুখে পড়ছে।

সৌদি সরকার ২০১৫ সাল থেকে সাত বছর ধরে হুতিদের দমনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল, যা ইয়েমেনে চরম মানবিক সংকট তৈরি করে। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা শান্তি আনেনি।

চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা অভিযোগ করে, রিয়াদের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে তেহরান থেকে আসা একটি ফ্লাইট অবতরণ রুখতে তারা সানার বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ করেছে। মূলত এরপরই হুতি-সৌদি উত্তেজনা আবার চরম রূপ নেয়।

বর্তমানে সৌদি সমর্থিত একটি সশস্ত্র দল হুতিদের ওপর পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তাদের সহায়তা দিতে পারে সৌদি বিমান বাহিনী। তবে এই মুহূর্তে বিমান হামলার বাইরে অন্য কোনো বড় অভিযানের কথা ভাবছে না রিয়াদ। গত শুক্রবার হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন সর্ববৃহৎ হুদাইদাহ বন্দরে জোরালো বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বাহিনী।

সৌদির সাবেক কর্মকর্তা নওয়াফ ওবাইদ বলেন, ‘১০ বছর আগের তুলনায় সৌদি বিমান বাহিনীর ড্রোন বা ক্ষিপ্র হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করার সক্ষমতা বহুলাংশে বেড়েছে।’

ইরাক থেকে ধেয়ে আসা ড্রোন

সোমবার ও মঙ্গলবার দক্ষিণ ইরাকের পাম বাগান এলাকা থেকে রিয়াদসহ সৌদির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে একঝাঁক ড্রোন ছুড়েছে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, হুতিরাও হয়তো তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

এই হামলাই সৌদির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। মঙ্গলবার ভোরে তেল স্থাপনায় হামলার জবাবে পূর্ব ইরাকে শিয়া মিলিশিয়াদের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে ‘সুনির্দিষ্ট ও সুপরিকল্পিত’ বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি জটিল বা সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে দ্বিধা করবে না।

এই যৌথ হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত ও বহু আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে শিয়া মিলিশিয়াদের জোট পিএমএফ।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আইআরজিসি-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা থেকে সৌদিতে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে চালানো ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার জবাবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক শোধনাগারে বড় ধরণের ড্রোন হামলা হয়েছিল, যার ফলে সৌদির অর্ধেকের বেশি তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় সৌদি কোনো সামরিক জবাব দেয়নি, তবে সেবারের হামলাটি ইরাক থেকেই চালিত হয়েছিল বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। রিয়াদ সেই স্মৃতি ভোলেনি।

ইরানি হুমকি ও ভূরাজনৈতিক জটিলতা

মার্চ ও এপ্রিলের দিকে ইরানি শাদ ড্রোন ঠেকাতে সৌদিকে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোড়াতালি দিতে হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এ সময় ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে একটি ইন্টিগ্রেটেড ডিফেন্স সিস্টেম দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে রিয়াদ সফর করেন। কিন্তু রাতারাতি তা চালু করা সম্ভব নয়। ফলে পারস্য উপসাগরের ওপার থেকে ধেয়ে আসা শাদ ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েই গেছে।

মে মাসের পর থেকে ইরান সরাসরি সৌদিতে হামলা না চালালেও তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে, ‘উপসাগরীয় কিছু দেশ ইরানের ওপর সামরিক হামলায় অংশ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মূল অপরাধী হলেও এসব আঞ্চলিক দেশের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

ইরান যদি পুনরায় সৌদিতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে রিয়াদকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে—হয় পুরোপুরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া, নয়তো অপমান সহ্য করা।

এমনিতেই চলতি বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ২০১৮ সালের পর সবচেয়ে বড় বাজেট ঘাটতিতে পড়েছে দেশটি। সংঘাত আরো বিস্তৃত হলে দেশটির ঘোষিত বিশাল অর্থনৈতিক মেগা-প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অসংলগ্ন মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়েও সৌদি কর্মকর্তারা চিন্তিত। মার্কিন সেনার উপস্থিতি কমে গেলে ইরান একা পেয়ে তাদের আক্রমণ করতে পারে—এমন ভয় তাড়া করছে রিয়াদকে।

সৌদি আরব এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলো এখন এক চরম মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত রিয়াদ এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছে যে, মার খাওয়ারও একটি সীমা থাকে; আঘাতের জবাবে এবার পাল্ট আঘাতই একমাত্র পথ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

ten + sixteen =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য