ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাবলির নিষ্ক্রিয় সমাহার নয়; ইতিহাস হলো ক্ষমতার রাজনীতি ও পরিচয়ের লড়াই ক্ষেত্র। সামপ্রদায়িক রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বয়ান তৈরি করা হয়েছে, সেখানে মুসলিমদের একদিকে ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তাদেরকে রাষ্ট্রের চোখে ‘বহিরাগত’ বা ‘অজাতশত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসের দলিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে স্বাধীনতার সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, তাতে মুসলিম সমাজ শুধু অংশগ্রহণকারীই ছিল না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তারাই ছিল সশস্ত্র ও আদর্শিক লড়াইয়ের পথিকৃৎ।
দেওবন্দ আন্দোলনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় ‘রেশমি রুমাল আন্দোলন’ এর স্পষ্ট প্রমাণ। আধুনিক ভারতের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ও স্টেট স্পন্সর্ড উগ্র ধর্মীয় আদর্শ ভিত্তিক রাজনীতি কীভাবে এই গৌরবময় ইতিহাসকে আড়াল করেছে, তা জানা আমাদের জন্য জরুরী।
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রথম অধ্যায়: আলেম সমাজ ও ফতোয়া-ই-জিহাদ
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে পুরো ভারতবর্ষ দখল করতে শুরু করে, তখন সর্বপ্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন মুসলিম শাসক ও আলেম সমাজ। ১৭৯৯ সালে মহীশূরের টিপু সুলতানের প্রতিরোধ এবং ১৮০৩ সালে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর (র.) সুযোগ্য পুত্র শাহ আবদুল আজীজের ঐতিহাসিক ফতোয়া, যেখানে তিনি ভারতকে ‘দারুল হরব’ ঘোষণা দিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইকে বাধ্যতামূলক করেছিলেন – তা ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর।[১]
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে সাধারণ সিপাহীদের পাশাপাশি উত্তর ভারতের হাজার হাজার আলেম শহীদ হয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পল তার ‘দ্য লাস্ট মুঘল’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কীভাবে ব্রিটিশরা দিল্লি পুনর্দখলের পর হাজার হাজার আলেমকে ফাঁসি দিয়েছিল এবং চাঁদনি চকের গাছগুলোতে লাশ ঝুলিয়ে রেখেছিল।[২] এই ইতিহাস কেবল কলম এবং কালির আলোচনা নয় বরং এগুলো আজকে রাষ্ট্র হিসেবে ইন্ডিয়ার বুনিয়াদি ইতিহাস। এই প্রতিরোধের ধারা পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ভারতের চেতনা বাঁচিয়ে রাখা।
রেশমি রুমাল আন্দোলন: আন্তর্জাতিক সশস্ত্র বিদ্রোহের রূপরেখা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেওবন্দের শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান এবং তাঁর প্রখ্যাত শিষ্য মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধির নেতৃত্বে যে গোপন বিপ্লব পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা ইতিহাসে ‘রেশমি রুমাল আন্দোলন’ বা ‘সিল্ক লেটার মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত।[৩]
এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষজুড়ে এক যোগে সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠিত করা। এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কর্ম কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল –
১. আন্তর্জাতিক অক্ষ তৈরি: আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের পতন ঘটাতে আফগানিস্তান, তুরস্ক (উসমানীয় সাম্রাজ্য) থেকে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা লাভ করা। জার্মানির সাথেও যোগাযগ স্থাপন করা হয়েছিল।
২. প্রবাসী ভারত সরকার ও আফগান আমিরের সহায়তা: মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধি কৌশলগতভাবে আফগানিস্তানে গমন করেন। সেখানে তিনি রাজা মহেন্দ্র প্রতাপের সঙ্গে যৌথভাবে ভারতের প্রথম ‘প্রবাসী ভারত সরকার’ (Provisional Government of India) গঠন করেন। তাঁরা আফগানিস্তানের আমির হাবিবুল্লাহ খানের সাথে দেখা করে সশস্ত্র বিপ্লবে আফগান সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তার আবেদন জানান।[৪]
৩. হেজাজে কূটনীতি ও ওসমানীয় সংযোগ: অন্যদিকে মাওলানা মাহমুদুল হাসান স্বয়ং হেজাজে (মক্কায়) যান এবং সেখানে অবস্থানরত উসমানীয় খলিফার প্রতিনিধি ও গভর্নর গালিব পাশা এবং অ্যানোভার পাশা সহ জার্মান কর্তৃপক্ষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সামরিক সাহায্যের আবেদন জানান।
গোপনীয়তা রক্ষার জন্য বিপ্লবের নির্দেশাবলী, সেনাদলের কাঠামো ও কৌশল রেশমি কাপড়ে সাংকেতিক ভাষায় লিখে বার্তাবাহকের মাধ্যমে পাঠানো হতো। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯১৬ সালে পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডিতে একটি রুমাল চিঠি ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে যাওয়ায় পুরো পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। মাহমুদুল হাসানকে গ্রেপ্তার করে মাল্টায় বন্দি করা হয় এবং আন্দোলনটি সাময়িকভাবে ভেঙে পড়ে। তবে ইতিহাসবিদ পিটার হার্ডির মতে, রেশমি রুমাল আন্দোলন ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক মিত্র সন্ধানের প্রথম ও অন্যতম সুসংগঠিত সশস্ত্র প্রয়াস।[৫]
ইনকিলাব জিন্দাবাদ থেকে ভারত ছাড়ো: ধারণাগত ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব
কেবল সশস্ত্র প্রতিরোধই নয়, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলধারা এবং রাজনৈতিক স্লোগান তৈরিতেও মুসলিমদের ভূমিকা ছিল অগ্রগামী।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ: স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগান ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন প্রখ্যাত কবি ও স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা হাসরাত মোহানী (১৯২১ সালে)।[৬]
একশতভাগ স্বাধীনতার দাবি: ১৯২১ সালের আহমেদাবাদ কংগ্রেসে পূর্ণ স্বায়ত্ব শাসন বা Complete Independence প্রস্তাব প্রথম পেশ করেছিলেন এই হাসরাত মোহানীই, যা তখন গান্ধীও গ্রহণ করতে দ্বিধা করেছিল।
স্মৃতিলোপের রাজনীতি এবং আধুনিক ভারতের সংকট
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, যে মুসলিম সমাজ স্বাধীনতার লড়াইয়ে রক্তের অক্ষরে ইতিহাস লিখল, তারা আজকের ভারতে ‘বহিরাগত’ বা ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে কেন?
ইতিহাসবিদ জ্ঞানেণ্দ্র পাণ্ডে তার ‘রুটলেসনেস অ্যান্ড বিলংগিং’ বিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এক ধরণের ‘সিলেক্টিভ মেমোরি’র আশ্রয় নেওয়া হয়।[৭] হিন্দুত্ববাদী আদর্শিক ধারার উত্থানের সাথে সাথে ভারতের ইতিহাসকে ‘হিন্দু বনাম মুসলিম’ দ্বিধাবিভক্ত কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের বীরত্বগাথাকে পাঠ্যপুস্তক, রাষ্ট্রীয় স্মৃতিসৌধ এবং গণমাধ্যম থেকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলা হয়েছে অথবা সেগুলোকে কেবল সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বর্তমান ভারতে এনআরসি (NRC), সিএএ (CAA) এবং বুলেডোজার রাজনীতির মাধ্যমে মুসলিমদের যে নাগরিকত্বহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে, তা এই ইতিহাস মুছে ফেলারই সরাসরি পরিণতি। যখন একটি জাতির অতীত অবদানকে অস্বীকার করা হয়, তখন তার নাগরিক অধিকার হরণ করা সহজ হয়ে যায়।
রেশমি রুমাল আন্দোলন কিংবা আলেমদের আত্মত্যাগ কেবল মুসলিমদের নিজস্ব ইতিহাস নয়; এটি অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাসকে বিকৃত করে বা একপেশে বয়ান তৈরি করে সাময়িক রাজনৈতিক ফায়দা তোলা সম্ভব হলেও সত্যকে চিরতরে চেপে রাখা যায় না। রেশমি রুমালের সুতোয় যে স্বাধীনতার স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, তা ভুলে যাওয়া মানে ভারতের নিজের ভিত্তিকেই অস্বীকার করা।
