Sunday, August 16, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeনিবন্ধরংধনু ফ্যাসিজম: উদারতার নামে আধিপত্যের বিস্তার

রংধনু ফ্যাসিজম: উদারতার নামে আধিপত্যের বিস্তার

১/ ইসরায়েল :

ইসরায়েলকে নিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের রাজনীতি নতুন নয়। কিন্তু ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বদলাতে যে পরিকল্পিত “Brand Israel” প্রচারণা শুরু করে, সেটি এই রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দেয়। তিন বছর ধরে মার্কিন মার্কেটিং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শের পর ২০০৫ সালে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এই প্রচারণা সামনে আসে। লক্ষ্য ছিল—ইসরায়েলকে শুধু দখলদার, যুদ্ধ, সামরিক সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত একটি দেশ হিসেবে না দেখিয়ে “relevant and modern” একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা।

অর্থাৎ সমস্যা হিসেবে তারা বুঝতে পেরেছিল যে বিশ্বের চোখে ইসরায়েলের পরিচয় দখলদার হয়ে গেছে। তাই প্রয়োজন ছিল একটি নতুন পরিচয় তৈরি করা—প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, পর্যটন, আধুনিক জীবনযাপন, গণতন্ত্র এবং উদারতার ইমেজ।

প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, পর্যটন কৃত্রিম ভাবে বানাতে পারলেও গণতন্ত্র এবং উদারনীতিবাদের ইমেজ বানাতে ইসরায়েল সামনে নিয়ে আনে সমকামীদের আর এতেই পশ্চিমা দেশ গুলায় ইসরায়েলকে “আধুনিক” দেখানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদানগুলোর একটি হয়ে ওঠে Tel Aviv-এর উদার ও LGBTQ+-বান্ধব পরিচয়।

আর তার বিপরীতে ফিলিস্তিনি ও আরব সমাজকে ক্রমশ এমন একটি সমাজ হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হলো—রক্ষণশীল, ধর্মীয়, অসহিষ্ণু এবং LGBTQ+-বিরোধী।

অর্থাৎ, ফিলিস্তিন–ইসরায়েল সংঘাত দখলদার বনাম দখলকৃত হিসেবে না দেখে একটি সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব হিসেবেও উপস্থাপন করা হলো।

প্রচার শুরু হলো “আমরা আধুনিক ও উদার; তারা পশ্চাৎপদ ও অসহিষ্ণু।”

কারণ পশ্চিমা দর্শকের কাছে LGBTQ+ অধিকার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী নৈতিক মূল্যবোধ। ফলে ইসরায়েলের Pride parade, Tel Aviv-এর nightlife, LGBTQ+ পর্যটন এবং সমকামী মানুষের অধিকার সামনে এনে যখন বলা হয়—“দেখুন, মধ্যপ্রাচ্যে আমরা এই উদারতার জায়গাটি তৈরি করেছি,” তখন দর্শকের সামনে ইসরায়েলের একটি নির্দিষ্ট চিত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

আর সেই ছবির পেছনে থাকা রাজনৈতিক বাস্তবতা—ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার, ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ঘর, জমি দখল, সামরিক নিয়ন্ত্রণ, নিপিড়ন—আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়।

২০০৭ সালে Brand Israel-এর আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়; ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা নেতৃত্ব ও বাজেট দেওয়া হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে Tel Aviv-কে LGBTQ+ পর্যটনের গন্তব্য হিসেবে প্রচারও এই বৃহত্তর rebranding-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

যার ফলে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ছবি তৈরি হয়, আর এই ছবি এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যে পশ্চিমা দর্শক ইসরায়েলের LGBTQ+ অধিকারের কারণে তার দখলদার নীতিকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করে।

২০১১ সালের নভেম্বরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের Israel and ‘Pinkwashing’ শিরোনামো একটি মতামত নিবন্ধে দেখানো হয়, “ইসরায়েল কিভাবে তার সমকামী-অধিকার অগ্রগতিকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করে।

২/ বাংলাদেশ :

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অবশ্য ভিন্ন। এখানে ইসরায়েলের মতো কোনো রাষ্ট্রীয় Brand Israel প্রকল্প আছে—এমন দাবি করার ভিত্তি নেই। কিন্তু সাংস্কৃতিক পরিসরে একই ধরনের একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়: আন্তর্জাতিক উদারনৈতিক ভাষা, বিশেষ করে LGBTQ+ অধিকার ও পরিচয়ের ভাষা, যখন বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে প্রবেশ করে, তখন সেটি কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থ কী?

সম্প্রতি বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদমাধ্যম bdnews24.com-এ প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধ এই বিতর্কের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। লেখাটি লিখেছেন পতিত স্বৈরাচারের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর অর্থায়নে পরিচালিত অনলাইন পোর্টাল ঢাকা পেপার্সের এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার শাকিলা জেরিন। শাকিলা সেখানে সমকামিতাকে “সম্পূর্ণ স্বাভাবিক” হিসেবে ব্যাখ্যা করে এবং রক্ষণশীল সমাজের আপত্তিকে মোরাল পুলিশিং ও বর্বরতা হিসেবে দেখায়।

এখানে বিতর্কটি শুধু সমকামিতা নিয়ে নয়; বরং আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আসে—কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডাকে “আধুনিক”, “স্বাভাবিক” ও “অধিকারভিত্তিক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সময় ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?

পশ্চিমা উদারনৈতিক সমাজে LGBTQ+ অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ হিসেবে ব্যবহার হয় । ফলে সেখানে “LGBTQ+-বান্ধব” পরিচয় আধুনিকতা, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে পরিবার, ধর্মীয় বিশ্বাস, বিবাহ, সামাজিক রীতি ও নৈতিকতার ধারণা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একই বিষয়কে পশ্চিমা সমাজে যে ভাষায় “ব্যক্তিগত অধিকার” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে সেটি ভিন্ন নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্ন তৈরি করে।

এই বিতর্কে আরেকটি দুর্বল যুক্তি সামনে আনে শাকিলা: প্রাণিজগতে নাকি সমলিঙ্গ আচরণ আছে, অতএব মানুষকেও তা “প্রকৃতিসিদ্ধ” ধরে নিতে হবে। এই যুক্তির সমস্যা হলো, এটি “প্রকৃতিতে আছে” আর “মানুষের জন্য নৈতিক”—এই দুই জিনিসকে এক করে ফেলে। প্রকৃতিতে সহিংসতা আছে, সন্তানহত্যা আছে, শক্তিশালীর আধিপত্য আছে, জবরদস্তি আছে—মানুষ কি সেগুলোও নৈতিক বিধান হিসেবে গ্রহণ করবে? নিশ্চয়ই না। কারণ মানুষকে মানুষ বানায় তার প্রবৃত্তি নয়, তার বিবেক। সভ্যতার কাজই হলো অন্ধ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা, অনুকরণ করা নয়। কাজেই প্রাণীর আচরণকে মানবসমাজের নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা যুক্তিগতভাবে দুর্বল এবং নৈতিকভাবে অপরিণত।

রক্ষণশীল সমাজের আপত্তিকে অনেকেই কেবল ধর্মীয় আবেগ বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু বিষয়টি শুধু ধর্মের নয়; এটি সামাজিক ধারাবাহিকতার প্রশ্নও। পরিবার আমাদের সমাজে কেবল দুজন মানুষের সহবাসের কাঠামো নয়; এটি বংশধারা, সন্তানলালন, আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক, পারস্পরিক দায়িত্ব, সামাজিক মর্যাদা এবং নৈতিক শিক্ষার মূল ক্ষেত্র। ফলে যৌনতার যে ধারণা পরিবার, বিবাহ এবং নারী-পুরুষভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, সেটি বদলানোর যে কোনো প্রচেষ্টা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করবে—এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। যারা এই প্রতিরোধকে শুধুই “বিদ্বেষ” বর্বরতা বলেন তারা তারা আসলে রক্ষণশীল সমাজকে দখলদার ইসরায়েলের চোখে দেখেন ৷

এখানে আরেকটি কৌশলও লক্ষণীয়। প্রথমে বলা হয়, “এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যাপার।” তারপর বলা হয়, “এটি স্বাভাবিক, তাই আপত্তি অযৌক্তিক।” পরে সেই “স্বাভাবিকতা”কে সংস্কৃতি, শিক্ষা, মিডিয়া, ভাষা, অধিকার-আন্দোলন এবং সামাজিক শোভনতার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা শুরু হয়। অর্থাৎ সহনশীলতার দাবির মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে আসে স্বীকৃতির দাবি; স্বীকৃতির পর আসে সামাজিক সম্মতির দাবি; আর শেষে আসে ভিন্নমতকে নৈতিক অপরাধে রূপান্তরের প্রবণতা। রক্ষণশীল সমাজ মূলত এই ধাপগুলোই দেখে আতঙ্কিত হয়। কারণ তার কাছে বিষয়টি কোনো একক ব্যক্তির আকর্ষণ নয়; বরং একটি বৃহত্তর মূল্যবোধ-পরিবর্তনের প্রকল্প।

সমস্যাটা এখানেই। যখন কোনো নির্দিষ্ট যৌনতাকে “স্বাভাবিক”, “আধুনিক” এবং “উদার” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন তার বিপরীতে থাকা ধর্মীয়, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে স্বাভাবিকভাবেই “রক্ষণশীল”, “পশ্চাৎপদ” কিংবা “মোরাল পুলিশিং” হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা তৈরি হয়। অর্থাৎ বিতর্কটি আর শুধু একটি নির্দিষ্ট যৌন আচরণ নিয়ে থাকে না; এটি ধীরে ধীরে সমাজ কোন মূল্যবোধকে গ্রহণ করবে এবং কোন মূল্যবোধকে পরিত্যাগ করবে—সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়।

Brand Israel-এর ক্ষেত্রেও কৌশলটি ছিল অনেকটা এমন—ইসরায়েলের একটি নির্দিষ্ট পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসা এবং সেই পরিচয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে ইসরায়েলকে নতুনভাবে দেখানো। Tel Aviv-এর LGBTQ+-বান্ধব পরিচয় সেখানে শুধু একটি সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি; সেটি হয়ে উঠেছে আধুনিকতা, স্বাধীনতা ও উদারতার প্রতীক। আর সেই প্রতীকের বিপরীতে ফিলিস্তিনি ও আরব সমাজকে রক্ষণশীল, ধর্মীয় ও অসহিষ্ণু হিসেবে দেখানোর একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশেও যখন একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে বলা হয়—“এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক”, “আপত্তি মানেই মোরাল পুলিশিং”, “বিরোধিতা মানেই অসহিষ্ণুতা”—তখন প্রশ্ন ওঠে, এটি কি কেবল একটি মতামত, নাকি এর মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত নৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা চলছে?

কারণ কোনো সমাজের মূল্যবোধ একদিনে তৈরি হয় না। পরিবার, ধর্ম, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের নৈতিক বোধের মধ্য দিয়ে একটি সমাজ তার নিজস্ব সীমারেখা তৈরি করে। সেই সীমারেখার সঙ্গে সংঘাত তৈরি হলে সেটিকে শুধু “অজ্ঞতা” বা “ঘৃণা” বলে বাতিল করে দেওয়া আসলে সেই সমাজের নিজস্ব মূল্যবোধের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা।

আর এখানেই এই বিতর্ককে শুধু সমকামিতার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়, নৈতিক কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কোন মূল্যবোধ স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা হবে—সেই প্রশ্ন।

ইসরায়েল যেখানে LGBTQ+ পরিচয়কে ব্যবহার করেছে নিজের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের একটি হাতিয়ার হিসেবে, সেখানে বাংলাদেশের মতো সমাজে একই ধরনের উদারনৈতিক ভাষা কীভাবে প্রবেশ করছে, কারা সেটিকে প্রচার করছে এবং এর মাধ্যমে প্রচলিত সামাজিক ও নৈতিক ধারণাগুলোকে কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে—সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

20 − 5 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য