গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত মুসলিম জাহানের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ মোড় সূচিত হয়েছে। সূচিত হয়েছে এক নতুন সমীকরণ। এই সমীকরণের বিস্তৃতি সুদূর সউদী আরব থেকে শুরু করে ইউরেশীয় দেশ বলে পরিচিত তুরস্ক এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। এই নতুন সমীকরণের সূচনা হলো গত বছরের সেপ্টেম্বরে সউদী-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে। দি¦তীয় ঘটনা হলো ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সম্পাদিত মক্কা চুক্তি। এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সউদী আরব। সবশেষে এই অক্টোবরে ঘটেছে বদর সমঝোতা। এই সমঝোতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার এবং ইন্দোনেশিয়া। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, তিনটি চুক্তির মাধ্যমে পাঁচটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ আম্ব্রেলার নিচে দাঁড়িয়েছে। এই পাঁচটি রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে তেল সম্পদে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিকভাবে বিপুলভাবে ধনাঢ্য সউদী আরব ও কাতার। সামরিক শক্তির দিক দিয়ে বিপুলভাবে শক্তিশালী এবং আধুনিক প্রযুক্তির অধিকারী তুরস্ক। রয়েছে সামরিকভাবে শক্তিশালী এবং পারমাণবিকভাবে শক্তিধর পাকিস্তান। রয়েছে জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার আয়তন ১৯ লাখ ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার বা ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৫৩০ বর্গমাইল। ইন্দোনেশিয়া একটি দ্বীপ দেশ। বলা হয়, দ্বীপ মালার দেশ ইন্দোনেশিয়া। জনসংখ্যা ২৮ কোটি ৭০ লক্ষ।
এই তিনটি চুক্তি ও সমঝোতা কোনো আক্রমণাত্মক জোট নয়। বরং এগুলোকে বলা যায় যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যেমন পাকিস্তান ও সউদী আরবের মধ্যে সম্পাদিত প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, এক দেশ আক্রান্ত হলে অপর দেশও আক্রান্ত হয়েছে বলে বিবেচনা করা হবে। অন্য কথায় সউদী আরব আক্রান্ত হলে পাকিস্তানও নিজেকে আক্রান্ত বলে বিবেচনা করবে এবং সউদীর সাহায্যে এগিয়ে যাবে। বিপরীতে পাকিস্তান আক্রান্ত হলেও সউদী আরব একইভাবে পাকিস্তানের সাহায্যে এগিয়ে আসবে।
দ্বিতীয় যে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে সেটি হলো, পাকিস্তান সউদী আরব ও তুরস্কের ডিফেন্স প্যাক্ট। সউদী আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে বলে এই চুক্তির নাম হয়েছে মক্কা চুক্তি। এটিও সউদী-পাকিস্তান ডিফেন্স প্যাক্টের মতো ত্রিপক্ষীয় ডিফেন্স প্যাক্ট। সোজা কথায়, তিন দেশের যে কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অপর দুটি দেশও নিজেদেরকে আক্রান্ত বলে বিবেচনা করবে এবং মূল আক্রান্ত দেশের সহায়তায় এগিয়ে যাবে।
এই চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, চুক্তিতে তুরস্কের যোগদান। আমি আগেই তুরস্ককে একটি ইউরেশীয় দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছি। এর কারণ রয়েছে। তুরস্কের একটি অংশ এশিয়াতে। আর একটি অংশ ইউরোপে। এজন্যই তুরস্ককে বলা হয় ইউরেশীয়া। মুসলিম দেশগুলির মধ্যে তুরস্কই একমাত্র দেশ যেটি পশ্চিমা ন্যাটোর সদস্য। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ক্ষমতার পূর্ব পর্যন্ত তুরস্ক ছিলো প্রধানত পশ্চিমা ধাঁচে গড়া একটি দেশ।
তুরস্কের আয়তন ৩ লক্ষ ২ হাজার ৫৩৫ বর্গমাইল। জনসংখ্যা ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর অনুযায়ী ৮ কোটি ৬০ লাখ ৯২ হাজার ১৬৮ জন। তুরস্কের সামরিক বাহিনীর সংখ্যা ৪ লক্ষ ৮০ হাজার। রিজার্ভ ৩ লক্ষ ৮০ হাজার। ট্যাংক ২ হাজার ৩০০। তুরস্ক নিজেই ট্যাংক ও কামান বানায়। তুরস্কের বিমান বাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন। তুরস্কের ড্রোন পৃথিবী বিখ্যাত। তারা নিজেরাই ড্রোন তৈরি করে এবং অনেক দেশে তাদের ড্রোন বিক্রি হয়। অ্যাটাক হেলিকপ্টারও তুরস্ক নিজেই তৈরি করে। তুরস্কের বিমান প্রতিরক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের কারণেই ভারতের সাথে আমেরিকার সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।
পাঁচটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী হলো তুরস্কের। তাদের রয়েছে ১৪টি সাবমেরিন। তুরস্কের সামরিক শক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, আগে যেসব অস্ত্রের জন্য বিদেশের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতো, এখন তার কিছু অংশ নিজেই তৈরি করতে পারছে। বিমান ও ড্রোন, রাডার ও ইলেকট্রনিক, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র, কামান ও গোলাবারুদ, ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং যুদ্ধজাহাজ।
॥দুই॥
জনসংখ্যা এবং আয়তনের দিক দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক শক্তি যতখানি হওয়ার কথা ছিলো ততখানি হয়নি। তবুও যেটুকু সামরিক শক্তি রয়েছে সেটুকুও ফেলনা নয়। যেমন, তার সামরিক বাহিনীর সদস্যের সংখ্যা মোট ৪ লাখ। তার ট্যাংকের মধ্যে রয়েছে লিওপার্ডের মতো সেকেলে ট্যাংক। তবে সে নিজেই সাঁজোয়া যান তৈরি করে। স্থল বাহিনীর তুলনায় তার বিমানবাহিনী বেশি আধুনিক। রয়েছে মার্কিন এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন। সংখ্যা ৩৩টি। রয়েছে রাশিয়ায় নির্মিত এসইউ-৩০ এবং এসইউ-২৭। রয়েছে ফ্রান্স নির্মিত রাফাল সংখ্যা ১৩।
যেহেতু ইন্দোনেশিয়া দ্বীপ মালার দেশ তাই তাদের নৌ বাহিনীও কিছুটা শক্তিশালী। রয়েছে একটি বিমানবাহী জাহাজ, যা অন্য কোনো মুসলিম দেশে আছে বলে জানা নাই। তার রয়েছে ৪টি সাবমেরিন।
পাকিস্তানের সামরিক শক্তি এখানে উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম। কারণ দৈনিক ইনকিলাবের এই কলামে আমি পাকিস্তান সম্পর্কে এবং তার সামরিক শক্তি সম্পর্কে বেশ কয়েকবার লিখেছি। তাদের অ্যাটম বোমার কথাও লিখেছি। আজ আর তার পুনরাবৃত্তি করলাম না।
তবে দুঃখজনক হলো, সউদী আরবের সামরিক শক্তি। দেশটি বিগত ১০ বছর ধরে প্রতি বছর ৭০ থেকে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সামরিক বাহিনীর পেছনে ব্যয় করে। অথচ, এই কলাম লেখার সময় পর্যন্ত তার কোনো এফ-১৬ মার্কিন ফাইটিং ফ্যালকন নাই। তার বিমান বহরে রয়েছে এফ-১৫ ও এফ-১৪। আমেরিকা দেশটিকে ক্রমাগত শোষণ করে যাচ্ছে। বিনিময়ে তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। আজ হুতিরাও তার বিমানবন্দর আক্রমণ করে। অথচ, হুতিরা কিন্তু কোনো রাষ্ট্রশক্তি নয়। পাকিস্তানের মতো দেশকে তাদের প্রতিরক্ষার জন্য এগিয়ে যেতে হয়।
আমার মনে হয়, এতদিন পর সউদী আরবের হুঁশ হয়েছে। তাই কয়েক দিন আগে দেখলাম, সে আমেরিকার নিকট থেকে পঞ্চম প্রজন্মের জঙ্গি বিমান এফ-৩৫ ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করেছে। এ ব্যাপারে বাগড়া দিয়েছে ইসরাইল। মার্কিন সিনেট এবং কংগ্রেসও (প্রতিনিধি পরিষদ) সউদী প্রস্তাবে ক্লিয়ারেন্স দেবে কিনা সন্দেহ।
কাতার একটি ছোট্ট দেশ। ৪ হাজার ৪৯৩ বর্গমাইল। জনসংখ্যা ৩৩ লক্ষ ৭০ হাজার ৬১১ জন। জনসংখ্যা এবং আয়তন অতীব ক্ষুদ্র। সুতরাং, এত ছোট দেশের বড় মিলিটারি থাকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নাই। কিন্তু দেশটি বিপুল তেল সম্পদে সমৃদ্ধ। তাই একটি ধনাঢ্য দেশ। এদেশের ওপর পশ্চিমাদের লোলুপ দৃষ্টি সব সময় রয়েছে। এজন্য কাতার একটি মুসলিম দেশ হিসাবে মুসলমানদের সাথে জোট বেঁধেছে।
॥তিন॥
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বদর সমঝোতার উদ্দেশ্য হচ্ছে সামরিক উৎপাদন, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও শুধু প্রস্তুত অস্ত্র কেনার পরিবর্তে প্রযুক্তি বিনিময় ও যৌথ উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বদর সমঝোতা কেন দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে? একটি দেশ বিদেশ থেকে ১০০টি যুদ্ধযান কিনতে পারে। কিন্তু যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ, গোলাবারুদ, সেন্সর বা আধুনিকায়নের জন্য যদি তাকে সব সময় সরবরাহকারী দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে তার সামরিক স্বাধীনতা সীমিত থাকে না।
অন্যদিকে, কয়েকটি দেশ যৌথভাবে প্রযুক্তি তৈরি, উৎপাদন, পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমতে পারে, স্থানীয় শিল্প ও দক্ষ জনশক্তির বিকাশ হতে পারে, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদের সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য হতে পারে, বিদেশি নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক চাপের প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে, তৃতীয় দেশের কাছে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই তিনটি চুক্তির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি দিক থেকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো, নিরাপত্তার জন্য বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করা থেকে নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হওয়া।
দেশগুলো নিয়মিত যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রতিরোধ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং যৌথ অস্ত্র উৎপাদনে অগ্রসর হতে পারে। এতে প্রতিটি দেশের এককভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বহনের চাপ কমতে পারে।
দেশগুলো যৌথ কারখানা, গবেষণা ও অস্ত্র রপ্তানিতে সহযোগিতা করবে; কিন্তু প্রত্যেকটি দেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্ত স্বাধীন থাকবে। বদর সমঝোতার ঘোষিত শিল্পভিত্তিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে এই চিত্রটি সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বহুমুখী অংশীদারত্ব, কিন্তু সীমিত বাস্তবায়নচুক্তিগুলো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু সদস্যদের স্বার্থের পার্থক্য, অর্থায়নের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক বিরোধের কারণে বাস্তব সামরিক একীকরণ সীমিত হতে পারে।
শেষ কথা, মুসলিম দেশসমূহ গত ৮০ বছর ধরে হয় পশ্চিম বিশ^ না হয় কমিউনিস্ট বিশ্বের ওপর প্রতিরক্ষার জন্য নির্ভরশীল। এই তিনটি চুক্তি এই মুুহূর্তেই হয়তো তাদেরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবে না। কিন্তু এটুকু বলা যায় যে, তারা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে মুসলিম জোট হিসেবে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে পা বাড়ালো।
