গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের একাধিক অভিযোগ মূলধারার গণমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। ৮ থেকে ২৩ অক্টোবরের মধ্যে গাজীপুর, সাভার, কুষ্টিয়া ও পাবনার ছয়টি মাদ্রাসায় ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। এসব খবর জাতীয় দৈনিক থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে, প্রচারিত হয়েছে টানা কয়েক দিন ধরে।
অভিযোগগুলো গুরুতর, প্রতিটিরই সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রাপ্য। কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি গঠন, অভিযোগ জানানোর হটলাইন চালু এবং সাত দিনের মধ্যে তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছে। ব্যর্থ হলে মাদ্রাসার অধিভুক্তি বাতিলের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে গণমাধ্যমের মানদণ্ড নিয়ে। গত ৮ সেপ্টেম্বর অনলাইন পোর্টাল আজাদির ডাকের এক প্রতিবেদনে রাজধানীর হলিক্রস কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অনিমেষ সাহার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলে তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়, আর ছাত্রী বিয়ের কথা বললে তিনি অস্বীকার করেন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, ঘটনার পর কলেজের একাধিক সাবেক শিক্ষার্থী মুখ খুলেছেন।
তাঁদের অভিযোগ, ওই শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে ক্লাসে ও প্রাইভেট টিউশনে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক করতেন। এক সাবেক শিক্ষার্থীর দাবি, ২০ বছর আগেও তিনি এই শিক্ষকের অসদাচরণের শিকার হয়েছিলেন।
এত গুরুতর অভিযোগের পরও কলেজ কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত শিক্ষককে মাত্র এক মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। অথচ একই কলেজ সম্প্রতি নিয়ম করেছে, পড়াশোনার সময় কোনো ছাত্রী বিয়ে করলে তাকে বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র (টিসি) দেওয়া হবে, বিবাহিত ছাত্রীদের ভর্তিও নেওয়া হবে না। অর্থাৎ বৈধ বিয়ের “শাস্তি” প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার, আর ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগের “শাস্তি” এক মাসের ছুটি।
অভিযোগটি প্রকাশের পর প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মূলধারার কোনো জাতীয় দৈনিকে এ নিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদন চোখে পড়েনি, অভিযোগ যাচাইয়ের কোনো অনুসন্ধানও না।
সমালোচকদের প্রশ্ন, মাদ্রাসায় কোনো অভিযোগ উঠলে যে গণমাধ্যম তাৎক্ষণিক সংবাদ, বিশ্লেষণ আর সম্পাদকীয়তে সরব হয়, অভিজাত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেলায় তারা কেন নীরব? শিশু নিপীড়ন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সব পরিসরেই এ সমস্যা আছে। কিন্তু খবর বাছাইয়ে একটি পরিসরকে বারবার আলোয় আনা আর অন্যটিকে আড়ালে রাখা সমাজে ভুল বার্তা দেয়: যেন নিপীড়ন কেবল মাদ্রাসারই সমস্যা।
ভুক্তভোগী মাদ্রাসার হোক বা নামী কলেজের, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সবার সমান। গণমাধ্যমের মানদণ্ডও তাই সবার জন্য এক হওয়া উচিত।
