আলহামদুলিল্লাহ [সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার]।
কোন মানুষ দুনিয়ায় জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, যখন তার শত্রুতা মানবজাতি এবং জীনদের সাথে হয়ে থাকে। এমনকি আল্লাহর নাবীগণও এ থেকে মুক্ত ছিলেন না। ‘আলিমদের সাথে সরাসরি শত্রুতা পূর্বেও ছিল, বিশেষত (ইসলামের) সত্যের ডাক কে কেন্দ্র করে। তাঁরা মানুষের থেকে তীব্র বৈরিতার শিকার হয়েছিলেন। তার একটি উদাহরণ হলেন, ‘শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ’ (রহিমাহুল্লাহ); কিছু মানুষ যারা তাঁর ব্যাপারে বিদ্বেষ পোষণ করতেন, তারা তাঁর রক্ত হালাল মনে করতেন; অন্যান্যরা তাকে বিভ্রান্ত হবার অপবাদ দিয়েছিলেন এবং ইসলামের সীমানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (অপবাদ দিয়েছিলেন) এবং দ্বীন ত্যাগেরও (অপবাদ দিয়েছিলেন)।
শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব ছিলেন এমনই আরেকজন ‘আলিম যিনি মানুষের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, (আর তা হল) ফিতনাহ সৃষ্টি করার অভিযোগ।
মানুষের এমনটি করার একমাত্র কারণ হল ‘ঈর্ষা’ এবং ‘ঘৃণা’, সাথে সাথে এটিও যে, তাদের অন্তরে বিদ‘আত খুবই শক্তভাবে গেথে গিয়েছিল, অথবা তারা অজ্ঞ ছিল এবং অন্ধভাবে খেয়ালখুশি ও নফসের অনুসারীদের অনুসরণ করছিলো।
এই মিথ্যা অপবাদ যে, শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব খিলাফাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন —এর জবাব দেওয়ার পূর্বে আমরা এ বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই যে, আশ-শাইখ আল-ইমাম (মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব) বিশ্বাস করতেন যে, ‘মুসলিম ইমাম [নেতা]-এর কথা শোনা এবং (তার) আনুগত্য করা আবশ্যক, যদিও সে দ্বীনদার অথবা অনৈতিক হয়, ততোক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁরা আল্লাহর অবাধ্য হয়, কারণ (আল্লাহর) ‘বাধ্যতা/আনুগত্য’ হল সঠিকতা বিচারের একমাত্র মাপকাঠি’।
শাইখ আহলুল ক্বাসীম [ক্বাসীমবাসী]-এর নিকট তাঁর প্রেরিত একটি চিঠিতে বলেনঃ “মুসলিম ইমাম [নেতা]-এর কথা শোনা এবং (তার) আনুগত্য করা আবশ্যক, যদিও সে দ্বীনদার অথবা অনৈতিক হয়, ততোক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁরা আল্লাহর অবাধ্য হয়, কারণ (আল্লাহর) ‘বাধ্যতা/আনুগত্য’ হল সঠিকতা বিচারের একমাত্র মাপকাঠি। যে-ই খালিফাহ হয়েছে এবং লোকেরা তাকে তাঁদের সমর্থন দিয়েছে এবং গ্রহণ করেছে, যদিওবা সে খালিফাহ’র স্থান জোর করে দখল করেছে; তাঁর আনুগত্য করা হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম।” [মাজমূ‘আত মু’আল্লাফাতুশ শাইখ, ৫/১১]
এবং তিনি আরও বলেছিলেনঃ “আল-উসূলুস সালাসা [তিনটি মূলনীতি]: ঐক্যের অন্যতম মূলনীতি হল, তাঁদের কথা শোনা এবং পালন করা, যাদের আমাদের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়েছে, যদিও সে একজন হাবশী দাস হয়।” [মাজমূ‘আত মু’আল্লাফাতুশ শাইখ, ১/৩৯৪। দা‘ওয়াইউল মুনা’ওয়ীন]
.
এবং শাইখ ‘আব্দুল আযীয ‘আব্দুল লাতীফ বলেছেনঃ
“এসব বলার পর যা ব্যাখ্যা করে যে, শাইখ বিশ্বাস করতেন শাসকের কথা কথা শোনা এবং মান্য করা বাধ্যতামূলক যদিও সে দ্বীনদার অথবা অনৈতিক হয়, ততোক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁরা আল্লাহর অবাধ্য হয়।”
আমরা এই মিথ্যা অপবাদের জবাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে যাব।
একটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে, তা হলঃ “নজদ”, যেখান থেকে এই ডাক [দা‘ওয়াত] এসেছিল এবং প্রথম সমৃদ্ধি লাভ করেছিল, তা কি ‘উসমানী সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল?
.
ড. সালিহ আল-‘আবূদ এর জবাবে বলেনঃ
““নজদ” কখনোই দাওলাতুল ‘উসমানীয়্যাহ্ [‘উসমানী সাম্রাজ্য]-এর অধীনে আসেনি, কারণ ‘উসমানী সাম্রাজ্য কখনোই এতদূর পর্যন্ত পৌছায়নি। কোন ‘উসমানীয় শাসক উক্ত রাজ্য [নজদ]-এর উপর কর্তৃত্ব লাভ করতে পারেনি এবং সে সময়কালে তুর্কী সৈন্য এর ভূমির উপর দখল চালাতে পারেনি যখন শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব রহিমাহুল্লাহ-এর দা‘ওয়াহ চলছিল। এই ব্যাপারটি নির্দেশ করে যে, ‘উসমানী সাম্রাজ্য বিভিন্ন প্রশসনিক রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এটি জানা যায় একটি তুর্কী নথি থেকে যার নাম “ক্বাওয়ানীন আল-‘উসমান মুদ্বাম্মীন দাফতার আদ-দীওয়ান”, যেটি লিখেছেন ‘ইয়ামীন ‘আলী এফফেন্দী’ যিনি ছিলেন ১০১৪ হিজরি মোতাবেক ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে শাসনকার্যের দায়ীত্বে নিয়োজিত। এই নথি প্রমাণ করে যে হিজরি একদশ শতাব্দির শুরুতে ‘উসমানী সাম্রাজ্য ছিল ২৩টি রাজ্যে বিভক্ত যার ১৪টি ছিল ‘আরব্য রাজ্য। এবং নজদ এর কোনোটিই নয় আল-ইহশা’ ব্যতীত, যদি আমরা আল-ইহশা’কে নজদের অংশ হিসেবে বিবেচনা করি।” [‘আক্বীদাতুশ শাইখ মুহাম্মদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব ওয়া আছারুহা ফীল ‘আলামুল ইসলামী (অপ্রকাশিত) ১/২৭]
.
এবং ডক্টর ‘আব্দুল্লাহ আল-‘উসাইমীন বলেছেনঃ
“বিষয়টা যাই হোক না কেন, শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাবের দা‘ওয়াতের পূর্বে “নজদ” কখনোই সরাসরি ‘উসমানী শাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করেনি, শুধুমাত্র এজন্য যে এটি কখনোই এমন কোন শক্ত প্রভাবের সম্মুখীন হয়নি যা নজদের অভ্যন্তরীণ কর্মে প্রভাব ফেলে। কারোই এমন কোন প্রভাব ছিল না এবং বনী জাবর অথবা বনী খালিদ অথবা আশরাফদের খিছু অংশে, সেগুলো সীমিত ছিল। তাদের কেউই রাজনৈতিক ভারসাম্য আনতে পারেনি। তাই, নজদের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যুদ্ধ বজায় থাকে এবং সেখানকার বিভিন্ন জাতির মধ্যে চলমান দ্বন্দ চলতে থাকে।”
[মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব হায়াতুহু ওয়া ফিকরুহু, পৃঃ ১১। এসেছে দা‘ওয়াইউল মুনাও’য়ীন, ২৩৪-২৩৫]
.
শাইখ ‘আব্দুল ‘আযীয ইবন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায এই মিথ্যা আপবাদের জবাবে বলেন, “শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব ‘উসমানী খিলাফাহ-র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি যতদূর আমি জানি। কারণ, নজদের কোন এলাকাই তুর্কী শাসনের অধীনে ছিল না। বরঞ্চ, নজদ বিভক্ত ছিল ছোটখাট রাজ্যে এবং বিস্তীর্ণ গ্রামে। তা যতটুকুই ছোট হোক না কেন, পরিচালিত হত একজন স্বাধীন আমীর দ্বারা। এগুলো ছিল লড়াই, যুদ্ধ এবং বিগ্রহের মধ্যে পতিত সাম্রাজ্য। তাই, শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব ‘উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি, বরং তিনি নিজ ভূমির বিকৃত অবস্থার বিরুদ্ধ্ব বিদ্রোহ করেছেন এবং তিনি আল্লাহ ﷻ-এর জন্য জিহাদ করেছেন এবং তা আঁকড়ে ধরে ছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত এই দা‘ওয়াহ অন্যান্য ভূমিতে না পৌছে……”
[টেপে রেকর্ডকৃত কথোপকথন; বর্ণনা করা হয়েছে দা‘ওয়াইউল মুনাও’য়ীন, পৃঃ ২৩৭]
.
শাইখ ‘সালেহ বিন ফাউযান আল ফাউযান হাফিযাহুল্লাহ বলেন, “শাইখ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রহিমাহুল্লাহ এবং ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ উসমানী খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি, কেননা নজদের কোন এলাকা উসমানীদের শাসনের অধীনে ছিলো না, সেই সময়ে নজদের প্রত্যেকটা এলাকায় তাদের নিজেদের একজন আমীর নিযুক্ত ছিলো।যদি তার মৃত্যু হতো তাহলে তার ছেলে কিংবা বংশের কেউ শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতো।এজন্য উসমানীরা নিজেদের উপর কোন সমস্যা কাধে নিতেন না।এছাড়া তার দিকে কোন উৎসাহ দেখাতেন না কারণ নজদে কোন উৎপাদন ছিলো না।” শাইখুল ইসলাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রহিমাহুল্লাহ দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন মুহাম্মদ বিন সাউদ রহিমাহুল্লাহ এর সাহায্যে, তখন ধীরে ধীরে লোকজন দাওয়াত গ্রহণ থাকেন, এবং এনাদের গ্রহণীয়তা বাড়তে থাকে।এসব দেখে ভয়ে তারা নিজেরাই সর্বপ্রথম হামলা করেন এবং যুদ্ধ শুরু করেন।এরপর মুহাম্মদ বিন সাউদ রহিমাহুল্লাহ বিজয় লাভ করেন এবং মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রহিমাহুল্লাহ নজদ এবং অন্যান্য এলাকায় কুরআন সুন্নাহর দাওতের প্রচার প্রসার করেন।(সংক্ষেপিত)
[ টেপে রেকর্ডকৃত কথোপকথন ]
.
শাইখ সালেহ বিন আব্দুল আজিজ আলুশ শাইখ হাফিযাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলে,উত্তরে তিনি বলেন, এর জবাব দুইভাবে দেওয়া যায়।
একঃ- “শাইখ রহিমাহুল্লাহর সময়ে নজদের এলাকা উসমানীদের অধীনস্থ ছিলো না।বরং নজদ ২৬০ হিজরি থেকে কোন শাসকের সামনে ঝুঁকেনি।না আব্বাসীদের না অন্যান্য কোন শাসনের।তারা সর্বদা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে দিনাতিপাত করতো।ওই সময় অনেক খারেজিদের হাতে শাসন ক্ষমতা ছিলো।আর অনেক ইয়েমেনের বাসিন্দা ছিলো এছাড়া অন্যান্যরা।অর্থাৎ সেই সময়ে সবাই আলাদা আলাদা ছিলো।বিশেষ কোন একজনের অনুসরণ করতেন না, কোন একজনের হাতে বাই’আত গ্রহণ করতেন না।সবাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতেন।যখন উসমানী খেলাফত কায়েম হয় তখন নজদের প্রত্যেক এলাকায় নিজেদের আমীর থাকতো।তারা উসমানী খেলাফতের সামনে কখনো ঝুঁকেনি, তাদের সাথে একতাবদ্ধ হয়নি।যদিওবা উসমানী খেলাফতের সময় শুরুর দিকে সহীহ দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো।এর পরে তারা ধীরে ধীরে পথভ্রষ্টতার দিকে পা দিয়েছিলো।এটা ছিলো শাইখ রহিমাহুল্লাহর যুগের অবস্থা।তার সময়ে প্রত্যেক এলাকায় নিজেদের একজন আমির ছিলেন।এরা সবাই আলাদা বিভক্ত ছিলো।”
দুইঃ- “শাইখ রহিমাহুল্লাহর যুগে উসমানীরা শির্কে আকবরের দিকে দাওয়াত দিতেন, আর সুফিবাদের দিকে দাওয়াত দিতেন।কবরে, মাজারে আর তাদের ইবাদাতে মাল খরচ করতেন।এই বিষয়টাও যদি মেনে নেওয়া হয় যে নজদ তাদের অধীনে ছিলো তবুও তাদের অনুসরণ আর বাকি থাকে না কেননা শেষের দিকে তারা প্রকাশ্যে শির্কের দাওয়াত দিতেন এবং এর অনুসরণ করতেন।খেলাফত প্রতিষ্টার পর থেকে ১১০০ হিজরি পর্যন্ত মোটামুটি অবস্থা ভালো ছিলো কিন্তু এরপর থেকে মুসলমানদের মধ্যে গোমরাহি, পথভ্রষ্টতা বেড়ে যায়।তাদের বংশের এমন কিছু লোক পাওয়া গিয়েছিল, যারা দোয়া লিখতেন আর রাসুল এবং অলীদের নিকট প্রার্থনা করতেন।”
“এইখানে প্রথমে আমি যা বলেছি সেটা জরুরি বিষয় যার দ্বারা বুঝা যায় তিনি উসমানী খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি।আর দ্বিতীয় বিষয়টা এর পাশাপাশি উল্লেখ করতে হবে।” [শরহু কিতাব ছুলাছাতুল উসুল, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭] “সেই সময়ে তারা আহলে তাওহীদের আলেমকে হত্যা করেছিলো।”
ইবনে বশীর রহিমাহুল্লাহ বলেন, “বরং ১২৩৩ হিজরিতে উসমানী খেলাফতের সময় আহলে তাওহীদের ইমাম শাইখ সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রহিমাহুল্লাহকে এরা কতল করেছিলেন।” [তাইসীর আযিয আল হামিদ ফী শরহু কিতাবুত তাওহীদ, পৃষ্ঠা ৩৮ ]
পরিশেষে, আমরা তাদের উপদেশ দিব যারা শাইখের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের জিহ্বা সংযত করুন এবং আল্লাহকে ভয় করুন। হতে পারে আল্লাহ তাদের তাওবাহ কবুল করবেন এবং তাদের সৎপথে পরিচালিত করবেন।
