Tuesday, September 8, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeনিবন্ধরোগের কোনো সংক্রমণ নেই!

রোগের কোনো সংক্রমণ নেই!

রোগের কোনো সংক্রমণ নেই!


শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী


সহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়া বিজয়ের জন্য প্রেরিত সেনাপতিদের সাথে সাক্ষাত করার জন্য সেখানকার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সিরিয়ার নিকটবর্তী তাবুক উপত্যকার “সারগা” নামক গ্রামে পৌঁছা মাত্রই সেনাপতি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, খালেদ বিন ওয়ালিদ, সুরাহবিল ইবনু হাসানা এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুম তাঁর সাথে সাক্ষাত করলেন। এসব সেনাপতি উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জানালেন যে, সিরিয়াতে মহামারি রোগ প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন ইবনে আব্বাসকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে প্রথম স্তরের মুহাজিরদেরকে ডেকে আনেন। তারা হলেন ঐসব মুহাজির, যারা সর্বপ্রথম হিজরত করেছেন এবং দুই কিবলার দিকেই সালাত আদায় করেছেন। ইবনে আব্বাস তাদেরকে ডাকলেন। তারা আসলে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের কাছে সিরিয়াতে প্রবেশ করা কিংবা মদীনায় ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ চাইলেন। তারা এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কেউ কেউ বললেন, আপনি একটি বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কাজে বের হয়েছেন। তা সম্পন্ন না করে আপনার ফিরে যাওয়াটা আমরা সমর্থন করি না। অন্যরা বললেন, আপনার সাথে রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিজ্ঞ ও মর্যাদাবান সাহাবীগণ। এই মাহামারির দিকে তাদের ঠেলে দেয়াটা আমরা সমর্থন করতে পারি না। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু উভয় দলের কথা শুনলেন এবং তাদেরকে সেখান থেকে চলে যেতে বললেন। অতঃপর ইবনে আব্বাসকে বললেন, তিনি যেন উপস্থিত আনসারদেরকে ডেকে আনেন। তাদেরকে ডাকা হলে তারা উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে জমায়েত হলেন। তিনি তাদের কাছে সিরিয়াতে প্রবেশ করা বা না করার ব্যাপারে পরমার্শ চাইলেন। তারা মুহাজির মতোই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলেন। কতক আনসার বললেন, সিরিয়াতে প্রবেশ করা উচিত। অন্যরা বললেন, মদীসায় ফিরে যাওয়া উচিত। তিনি উভয় দলের কথা শুনার পর সেখান থেকে সড়ে যেতে বললেন। অতঃপর তিনি ইবনে আব্বাসকে ঐসব বয়স্ক কুরাইশী মুহাজির সাহাবীদেরকে ডেকে আনতে বললেন, যারা মক্কা বিজয়ের বছর ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরত করেছেন। তারা যখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুনর নিকট উপস্থিত হলেন, তখন তিনি সিরিয়াতে যাওয়া কিংবা না যাওয়ার ব্যাপারে তাদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। তারা সকলেই একবাক্যে বললেন, সিরিয়াতে না গিয়ে মদীনায় ফিরে যাওয়া উচিত। উমার রাযিয়াল্লাহু তাদের মত গ্রহণ করলেন এবং মানুষের মাঝে মদীনায় ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন। লোকেরা যখন বাহনে আরোহন করে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত হলো, তখন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ ফিরে যাওয়ার প্রতিবাদ করে বসলেন। তিনি উমারকে বললেন, আপনি কি তাকদীর (আল্লাহর নির্ধারণ) থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন? উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, তুমি ছাড়া অন্য কেউ যদি এই কথা বলতো, তাহলে আমি তাকে শাস্তি দিতাম এবং তার কথায় মোটেই অবাক হতাম না। কিন্তু তুমি আল্লাহর রাসূলের একজন বিজ্ঞ ও মর্যাদাবান সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও তোমার এই কথায় আমি অবাক হচ্ছি।
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবাক হওয়ার কারণ হলো, আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন একটি ইজতিহাদী মাসআলায় বিরোধিতা করেছিলেন, যাতে অধিকাংশ বিজ্ঞ সাহাবী ও নের্তৃস্থানীয় লোক একমত হয়েছিলেন। তাই উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু ইবাইদার বিরোধিতা করাটা পছন্দ করেননি।
অতঃপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ্রنَعمْ، نَفِرُّ من قَدَرِ اللهِ إلى قَدَرِ اللهِ! হ্যাঁ, আমরা এক তাকদীর থেকে পালিয়ে অন্য তাকদীরের দিকে যাচ্ছি। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিরে যাওয়াকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে পালানোর সাথে তুলনা করেছেন। অথচ এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে পলায়ন নয়। মূলত জেনে-বুঝে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়া ইসলামী শরীতে নিষিদ্ধ। তবে কেউ যদি তা করে, তাহলে সেটা তাকদীর (আল্লাহর নির্ধারণ) অনুযায়ীই করে থাকে। আল্লাহই সেটা নির্ধারণ করেন। আর যদি ধ্বংসের দিকে না গিয়ে সতর্কতা ও সাবধনাতা অবলম্বন করে এবং ধ্বংস থেকে বাঁচার চেষ্টা করে, সেটাও তাকদীর অনুযায়ী হয়ে থাকে। আল্লাহ সেটাও নির্ধারণ করেন। মোট কথা দুটোর কোনোটাই তাকদীরের বাইরে ও বিপরীত নয়।
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করার আদেশ দিয়েছেন এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে নিষেধ করেছেন। এই মর্মে দলীলগুলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
অতঃপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবাইদার ইজতেহাদকে ভুল প্রমাণিত করতে এবং স্বীয় মতের দিকে তাকে টেনে আনতে একটি সুন্দর উদাহরণ পেশ করেছেন। তিনি তাকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করেছেন যে, আমাকে বলো, তোমার যদি এক পাল উট থাকে আর সেগুলো যদি এমন উপত্যকায় চরে বেড়ায়, যার রয়েছে দু’টি কিনারা। একটি কিনারা খুব উর্বর এবং তাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ঘাস এবং অন্যটি অনুর্বর ও তাতে কোনো ঘাস নেই। এখন আমাকে বলো, তুমি যদি উর্বর ও ঘাসপূর্ণ কিনারায় উট চরাও, তাহলে কি আল্লাহর নির্ধারণ অনুযায়ী চরাবে না? আর তুমি যদি অনুর্বর ও ঘাসহীন কিনারায় চরাও, তাহলে কি আল্লাহর নির্ধারণের বাইরে হবে? হে আবু উবাইদা! আমি জানি, তুমি অবশ্যই ঘাসহীন উপত্যকার উপর ঘাসপূর্ণ উপত্যকাকেই তোমার উটের জন্য প্রাধান্য দিবে। আর আমি তো এমনটাই করেছি। তাকদীরের বিপরীত কিছু করিনি।
ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এরই মধ্যে আব্দুর রাহমান বিন আওফ রাযিয়াল্লাহু চলে আসলেন। তিনি উপরোক্ত পরামর্শ সভার কোনোটাতেই উপস্থিত ছিলেন না। তিনি এসে বললেন, যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করেছো, সে বিষয়ে আমার নিকট ইলম রয়েছে। অতঃপর তিনি উল্লেখ করলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ দিয়েছেন, তোমরা যখন কোনো জনপদে মহামারি লাগার খবর শুনবে, তখন তোমরা সেখানে যেয়ো না। আর তোমরা কোনো জনপদে থাকা অবস্থায় মহামারি লেগে গেলে তা থেকে পালিয়ে বের হয়ো না। কারণ যেখানে মহামারি লেগেছে সেখানে না যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে তোমাদের নফসের শস্তি এবং শয়তানী ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়। সেখানে গিয়ে মহামারিতে আক্রান্ত হলে শয়তান দুর্বল ঈমানদার লোকদেরকে এই ওয়াসওয়াসা সহজেই দিতে পারবে যে, এখানে আসার কারণেই তোমরা আক্রান্ত হয়েছো। এখানে না আসলে তোমরা আক্রান্ত হতে না।
আর মহামারি লাগার পর মহামারির স্থান থেকে না পালানোর মধ্যে তাকদীরের প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস বাস্তবায়ন হয় এবং অন্যান্য স্থানে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পথ বন্ধ হয়।
অতএব ইমানের হেফাযত করা, শয়তানী ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচা এবং মহামারি থেকে জান রক্ষা করার জন্যই আক্রান্ত স্থানে না যাওয়া কিংবা সেখান থেকে না পালানোর আদেশ দিয়েছেন।
অতঃপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ও অধিকাংশ সাহাবীর ইজতিহাদ রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মারফু হাদীছের মোতাবেক হওয়ার কারণে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং খুশী হলেন।
এই ঘটনা থেকে আমরা যা শিখলাম তা হচ্ছে:
১) শাসকের উপর আবশ্যক হচ্ছে জিহাদের উদ্দেশ্যে প্রেরিত সেনাবাহিনী ও সেনাপতিদের খুঁজ-খবর নেয়া।
২) সাহাবীদের নীতি ছিল পরামর্শ করা এবং আলেমদের সাথে বৈঠক করা। এটা ইসলামের অন্যতম মূলতীতি।
৩) প্রত্যেক মানুষকে তার নিজ মর্যাদা প্রদান করা এবং মর্যাদাবান ব্যক্তিদেরকে অন্যদের উপর প্রাধান্য দেয়া।
৪) যুদ্ধ ও জিহাদের বিষয়ে ইজতিহাদ করা বৈধ।
৫) একক ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণ করা জায়েয। কেননা উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুর রাহমান বিন আওফের সংবাদ গ্রহণ করেছেন। তার সাথে আর কোনো লোক ছিল না।
৬) ইসলামী শরীয়তে কিয়াস করা জায়েয আছে। কেননা উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবীদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেয়াকে অনুর্বর যমীন বাদ দিয়ে উর্বর ভূমিতে উট চরানোর উপর কিয়াস করেছেন।
৭) ধ্বংস ও ক্ষতির স্থান ও ব্যক্তি থেকে দূরে থাকা ইসলামী শরীতের অন্যতম নির্দেশ।
৮) মহামারির স্থানে না যাওয়া ও মহামারির স্থান ত্যাগ না করা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র হিদায়াতেরই অন্তর্ভুক্ত।
৯) একজন বড় আলেম কখনো তার চেয়ে ছোট আলেমের কাছে এমন জ্ঞান পেতে পারে, যা তার কাছে নেই।
১০) ইলমের প্রতি সাহাবীদের বিরাট মর্যাদা প্রদর্শন ও ইলমের প্রতি তাদের নিত স্বীকারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
১১) সত্যের সন্ধানে পরস্পর আলোচনা করা শরীয়ত সম্মত।
১২) মতভেদের সময় দলীল পাওয়া গেলে দলীলের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক।
১৩) সব কিছুই আল্লাহর ইলম ও তাকদীর অনুপাতে চলে।
১৪) অধিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অধিকাংশের মতকে প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে।
১৫) কিয়াস করা ও কিয়াস অনুযায়ী আমল করা, -উভয়টাই শরীয়ত সম্মত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

14 + 16 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য