বদরের যুদ্ধে আল্লাহ্ তা‘আলা যখন আবু জাহেলসহ কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে হত্যা করলেন তখন আবু সুফিয়ান বিন হারব তাদের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করল। দায়িত্ব পেয়ে রসূল (ﷺ) ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরব গোত্রসমূহকে একত্রিত করতে লাগল। প্রচুর অস্ত্র ও জনবলসহ সে মদ্বীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে বের হয়ে উহুদ পাহাড়ের নিকট তাবু স্থাপন করল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে হিজরী তৃতীয় সালের শাওয়াল মাসে মদ্বীনার মুসলমান ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানদের যুবকরাও এবার নিজেদেরকে যুদ্ধের জন্য পেশ করে। যারা বয়সে ছোট ছিল তাদেরকে জিহাদে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। তাদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার, উসামা বিন যায়েদ, যায়েদ বিন ছাবেত এবং আরাবা বিন আওয়াস। আর যাদেরকে জিহাদ করতে সক্ষম মনে করেছেন, তাদেরকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সামুরা বিন জুন্দুব এবং রাফে বিন খাদীজ। এদের বয়স ছিল তখন ১৫ বছর। কেউ কেউ বলেছেন- যাদেরকে অনুমতি দিয়েছিলেন ১৫ বছর বয়স হওয়ার কারণে তাদেরকে বালেগ হিসাবে গণ্য করেছিলেন। আর যাদের বয়স এর কম ছিল নাবালেগ হওয়ার কারণে তাদেরকে ফেরত দিয়েছিলেন।
অন্য একদল আলেম বলেন- ১৫ বছর বয়স বা বালেগ হওয়ার কারণে নয়; বরং যাদের মধ্যে যুদ্ধ করার মত শক্তি দেখেছেন তাদেরকে অনুমতি দিয়েছেন। আর যাদেরকে ফেরত দিয়েছিলেন শক্তি না থাকার কারণেই তাদেরকে ফেরত দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) এর হাদীছের কতক শব্দে এসেছে যে, রসূল (ﷺ) যখন আমাকে শক্তিশালী দেখলেন তখন জিহাদের অনুমতি দিলেন।
যাই হোক নাবী (ﷺ) সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। তিনি জানতে চাইলেন, তিনি মদ্বীনা থেকে বের হয়ে উহুদ প্রান্তরে গিয়ে শত্রুদের মুকাবেলা করবেন? না মদ্বীনায় থেকেই যুদ্ধ করবেন? রসূল (ﷺ)-এর রায় ছিল যে, মুসলমানেরা মদ্বীনা থেকে বের হবেনা; বরং মদ্বীনার ভিতরেই থাকবে। কাফেররা যদি মদ্বীনায় প্রবেশের সাহসিকতা প্রদর্শন করে তাহলে মুসলমানেরা মদ্বীনার প্রবেশ পথে যুদ্ধ করবে এবং মহিলারাও ঘরের ছাদ থেকে কাফেরদের উপর পাথর নিক্ষেপ করবে। মুনাফেক সরদার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এই মতকেই সমর্থন করল। আর এটিই ছিল সঠিক রায়। কিন্তু যে সমস্ত সাহাবী বদরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারেনি, তারা মদ্বীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার পরামর্শ দিলেন। তারা এ ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করতে থাকলে তিনি স্বীয় গৃহে প্রবেশ করলেন এবং যুদ্ধের পোশাক পরিধান করলেন। অতঃপর তিনি বের হয়ে পড়লেন। যারা বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল এবার তাদের দৃঢ়তায় ভাটা পড়ল। তখন তারা বলল- আমরা আল্লাহর রসূলকে বের হতে বাধ্য করলাম! তারা আরও বলল- হে আল্লাহর রসূল! আপনি যদি মদ্বীনায় অবস্থান করতে চান তাহলে তাই করুন। রসূল (ﷺ) তখন বললেন- যুদ্ধের পোশাক পরিধান করার পর কোন নাবীর জন্য এটা জায়েয নয় যে, তাঁর মাঝে এবং শত্রুর মাঝে আল্লাহর ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধের পোশাক খুলে ফেলবে।
তাই নাবী (ﷺ) এক হাজার সাহাবী নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। বের হওয়ার সময় আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদ্বীনায় অবশিষ্ট মুসলমানদের ইমাম নিযুক্ত করলেন। এর আগে মদ্বীনায় থাকার সময় রসূল (ﷺ) একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর তলোয়ারটি সামান্য ভেঙ্গে গেছে, একটি গাভী যবেহ করা হচ্ছে এবং তিনি একটি সুরক্ষিত দূর্গে স্বীয় হাত ঢুকাচ্ছেন। তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বললেন- তলোয়ার ভেঙ্গে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে তার পরিবারের একজন লোক আক্রান্ত হবেন, গাভী যবেহ করার ব্যাখ্যা করলেন যে, তাঁর সাহাবীদের একটি দল নিহত হবেন আর সুরক্ষিত দূর্গ হচ্ছে মদ্বীনা।
তিনি পবিত্র জুআর দিন উহুদের উদ্দেশ্যে বের হলেন। কিন্তু মদ্বীনা ও উহুদের মধ্যবর্তী স্থানে এসে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই এক তৃতীয়াংশ লোকসহ ফিরে গেল।
অবশিষ্ট সাতশ সাহাবীকে সাথে নিয়ে তিনি উহুদ প্রান্তরে গিয়ে পাহাড়কে পিছনে রেখে অবস্থান করলেন। মুসলমানদেরকে আদেশ করলেন যে, তাঁর আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত যেন যুদ্ধ শুরু না করেন। শনিবারের দিন তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণ করলেন। এ সময় তিনি ৫০ জন তীরন্দাজ বাহীনির উপর আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরকে আমীর নিযুক্ত করে তাদেরকে আমীরের আনুগত্য করার আদেশ দিলেন। এমন কি তারা যদি দেখে পাখীরা অন্যান্য সৈনিকদেরকে ছিড়ে খাচ্ছে তাতেও যেন তারা স্থান ত্যাগ না করেন। এই বাহিনীকে পিছনে নিযুক্ত করেছিলেন। যাতে মুশরিকরা পিছন দিক থেকে আক্রমণ করলে তীর নিক্ষেপ করে তাদেরকে প্রতিহত করা যায়।
ঐ দিকে কুরাইশরাও যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নিল। তারা সংখ্যায় ছিল তিন হাজার। তাদের মধ্যে ছিল দুইশত অশ্বারোহী যোদ্ধা।
দিবসের প্রথম ভাগে যখন যুদ্ধ শুরু হল তখন মুসলিমদের বিজয়ের লক্ষণ পরিলক্ষিত হল। আল্লাহর দুশমনেরা পরাজিত হল। তারা পরাজিত হয়ে তাদের মহিলাদের নিকট আশ্রয় নিতে লাগল।
ঐ দিকে রসূল (ﷺ) কর্তৃক নিয়োজিত ৫০ জনের তীরন্দাজ বাহিনী যখন কাফেরদের পরাজয় দেখল তখন তারা রসূল (ﷺ) এর আদেশ অমান্য করে স্থান ত্যাগ করতে লাগল এবং গণীমতের মাল সংগ্রহ করতে লাগল।
তাদের আমীর আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইর রসূল (ﷺ) এর আদেশের কথা শুনিয়ে দিলেন। কিন্তু তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত করলনা। তাদের ধারণা ছিল মুশরিকরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছে। সুতরাং রসূল (ﷺ) এর আদেশের কার্যকরিতা শেষ হয়ে গেছে। তাই তারা স্থান ত্যাগ করে গণীমত সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে উঠল।
ঐ দিকে মুশরিকদের অশ্বারোহীরা পিছন দিক খালি পেয়ে পুনরায় মুসলমানদের উপর আক্রমণ করল। এক পর্যায়ে তারা মুসলমানদেরকে ঘিরে ফেলল। এখানে ৭০জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করলেন। বাকীরা পলায়ন করলে মুশরিকরা রসূল (ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছে গেল। মুশরিকরা তাঁর চেহারা মোবারকে আঘাত করল, সামনের দাঁতগুলো ভেঙ্গে ফেলল। পরিশেষে কুরাইশদের আঘাতে তিনি একটি গর্তের মধ্যে পড়ে গেলেন।
এ সময় শয়তান উচ্চস্বরে চিৎকার করল যে, মুহাম্মাদ নিহত হয়েছে। এই কথা শুনে মুসলিমগণ নিরুৎসাহী হয়ে পড়ল এবং তাদের অধিকাংশই পলায়ন করল। আনাস বিন নযর তখন মুসলিমদের একটি দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি দেখলেন তারা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- তোমরা কিসের অপেক্ষা করছ? তারা জবাব দিল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) নিহত হয়েছেন। তিনি বললেন- তিনি নিহত হয়ে থাকলে তোমাদের বেঁচে থেকে লাভ কি?। তোমরা উঠ এবং তিনি যেই জন্য শহীদ হয়েছেন তোমরাও সে পথে মৃত্যু বরণ কর। অতঃপর তিনি লোকদের দিকে অগ্রসর হয়ে সা’দ বিন মুআয (রাঃ) এর দেখা পেলেন। সা’দকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন- হে সা’দ! আমি উহুদ পাহাড়ের পিছন দিক থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাচ্ছি। অতঃপর তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করলেন।
কিছুক্ষণ পর রসূল (ﷺ) মুসলমানদের সামনে আগমণ করলেন। কাব বিন মালেকই সর্বপ্রথম তাঁকে হিলমেটের নীচ থেকে চিনে ফেললেন। তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন যে, হে মুসলিমগণ! এই তো আল্লাহর রসূল এসে গেছেন। তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। রসূল (ﷺ) ইংগিতের মাধ্যমে তাঁকে চুপ থাকতে বললেন। মুসলমানেরা তাঁর চতুর্পাশে এসে একত্রিত হল। সেখানে আবু বকর, উমার এবং আলী (রাঃ) ও ছিলেন।
উহুদ যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন:
উহুদ যুদ্ধের দিন যারা শহীদ হন তাদের মধ্যে হামজাহ, মুসআব বিন উমাইর এবং হানযালা (রাঃ) অন্যতম। রসূল (ﷺ) দেখলেন যে, ফিরিস্তাগণ হানযালাকে গোসল দিচ্ছে। তাই তিনি সাহাবীদেরকে বললেন- তোমরা তার স্ত্রীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস কর। সাহাবীগণ হানযালার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদেরকে জানালেন যে, যখন যুদ্ধের ডাক আসল তখন তিনি তাঁর স্ত্রীর বুকের উপর ছিলেন। ডাক শুনে তিনি দ্রুত জিহাদের ময়দানে বের হয়ে পড়েন। হানযালার ঘটনা থেকে আলেমগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, অপবিত্র অবস্থায় যদি কেউ শহীদ হয়, তবে তাকে গোসল দিতে হবে।
এই যুদ্ধে আরও যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের মধ্যে আমর বিন ছাবেতও অন্যতম। তিনি উসাইরাম নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি প্রথমতঃ ইসলাম কবুল করতে অস্বীকার করতেন। যখন উহুদ যুদ্ধের দিন আসল তখন আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর অন্তরে ইসলামের প্রতি ভালবাসা ঢুকিয়ে দিলেন। তিনি ইসলামে প্রবেশ করলেন। তলোয়ার হাতে নিয়ে উহুদ প্রান্তরে রসূল (ﷺ) এর নিকট চলে গেলেন। এ সময় তাঁর হাতে কয়েকটি খেজুর ছিল। তিনি সেখান থেকে খাচ্ছিলেন। খেজুরগুলো তিনি এই বলে ফেলে দিলেন যে, আমি যদি এগুলো শেষ করা পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তাহলে তা হবে এক দীর্ঘ জীবন। অতঃপর তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পড়ে গেলেন।
তার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে কেউ অবগত ছিলনা। যুদ্ধ শেষে তার গোত্রীয় লোকেরা শহীদদের মধ্যে স্বজনদের খোঁজ করতে গিয়ে উসাইরামকে পেয়ে গেলেন। তখনও তাঁর রূহ বের হয়ে যায়নি। তারা বলে উঠলঃ আল্লাহর শপথ! এ দেখছি উসাইরাম। সে এখানে কি জন্যে আসল? ইতিপূর্বে তাকে তো আমরা ইসলামের প্রতি নাখোশ অবস্থায় দেখেছি। অতঃপর তারা তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল। হে উসাইরাম! তুমি কি কারণে উহুদ প্রান্তরে এসেছিলে? স্বীয় গোত্রের লোকদেরকে রক্ষা করতে? না ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়ে? সে উত্তর দিল, বরং ইসলামকে ভালবেসে এবং এতে অনুরাগী হয়ে। আমি আল্লাহর প্রতি এবং আল্লাহর রসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। এরপর আমি আল্লাহর রসূলের পক্ষে যুদ্ধ করে এই অবস্থায় পৌঁছেছি। এই বলে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। সাহাবীগণ রসূল (ﷺ) এর নিকট উসাইরামের ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন তিনি বললেন- উসাইরাম জান্নাতী হয়ে গেছে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন- তিনি আল্লাহর জন্য একটি সিজদাও করেন নি। তার সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে যে, তিনি সামান্য কাজ করে বিরাট বিনিময় পেয়ে গেলেন।
উহুদ যুদ্ধে আরও যারা শহীদ হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন জাবের (রাঃ) এর পিতা আব্দুল্লাহ্ বিন আমর বিন হারাম। তিনি বলেন- উহুদ যুদ্ধের পূর্বে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, মুবাশশির বিন মুনযির আমাকে বলছেনঃ অচিরেই তুমি আমাদের সাথে মিলিত হবে। আমি বললামঃ কোথায়? তিনি বললেন- জান্নাতে। আমরা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াব। আমি মুবাশশিরকে বললামঃ তুমি কি বদরের যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাওনি? তিনি বললেন- হ্যাঁ। তবে আমি পুনরায় জীবিত হয়েছি। স্বপ্নের বিষয়টি রসূল (ﷺ) কে বলা হলে তিনি বললেন- হে জাবেরের পিতা! তুমি অচিরেই আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হবে। তিনি উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।
আমর ইবনুল জামুহ ছিলেন একজন লেংড়া সাহাবী। তাঁর ছিল চারজন যুবক পুত্র সন্তান। পুত্রদের সকলেই রসূল (ﷺ) এর সকল যুদ্ধেই অংশ নিতেন। রসূল (ﷺ) যখন উহুদের উদ্দেশ্যে বের হলেন তখন তিনিও তাঁর সাথে বের হতে চাইলেন।
সন্তানেরা তাঁকে বলল- আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাকে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। আপনি বাড়িতেই থাকুন। আমরাই আপনার পক্ষ হতে যথেষ্ট। আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাকে জিহাদ থেকে রেহাই দিয়েছেন। আমর বিন জামুহ এ কথা শুনে রসূল (ﷺ) এর নিকট এসে বললেন- হে আল্লাহর রসূল! আমার এই ছেলেরা আমাকে আপনার সাথে জিহাদে বের হতে বারণ করছে। আল্লাহর শপথ আমি আমার এই লেংড়া পা নিয়ে জান্নাতে বিচরণ করতে চাই। রসূল (ﷺ) তাঁকে বললেন- আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাকে জিহাদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। আর তাঁর ছেলেদেরকে বললেন- তোমরা যদি তাকে জিহাদে যেতে দাও, তাহলেও তোমাদের কোন ক্ষতি হবেনা। সম্ভবতঃ আল্লাহ্ তাকে শাহাদাতের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন। অতঃপর তিনি রসূল (ﷺ) এর সাথে উহুদের দিন জিহাদে বের হয়ে শহীদ হলেন।
উহুদ যুদ্ধ শেষে আবু সুফিয়ান তিনবার বলল- মুহাম্মাদ কি লোকদের মধ্যে জীবিত আছে? নাবী (ﷺ) লোকদেরকে জবাব দিতে নিষেধ করলেন। অতঃপর আবু সুফিয়ান তিনবার বলল- লোকদের মধ্যে আবু কুহাফার পুত্র আছে কি? পুনরায় তিনবার বলল- লোকদের মধ্যে খাত্তাবের পুত্র কি আছে? অতঃপর আবু সুফিয়ান তার সাথীদের কাছে গিয়ে বলল- এরা তিন জনই নিহত হয়েছে। এ কথা শুনে উমার (রাঃ) আত্মসংবরণ করতে না পেরে বলে উঠলেনঃ আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর দুশমন! তোমার ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তুমি যাদের নাম ধরে ডাকলে তাদের সবাই জীবিত আছেন। তোমার কষ্টের দিনগুলো বাকী রয়েছে। আবু সুফিয়ান বলল- আজকের দিন বদরের যুদ্ধের দিনের প্রতিশোধ হয়ে গেল। আর যুদ্ধ তো পানির পাত্রের মত। অর্থাৎ পানির পাত্র যেমন একজনের হাতে স্থির থাকে না, তেমনি যুদ্ধে একবার একজন, আরেকবার অন্য জন জয়লাভ করে থাকে। তোমরা তোমাদের কিছু লোককে মুছলা অবস্থায় তথা নাক কান কাটা পাবে। অবশ্য এরূপ করার জন্য আমি নির্দেশ করিনি। এতে আমার কোন দুঃখও নেই। এরপর আবু সুফিয়ান উচ্চস্বরে কবিতার ছন্দ উচ্চারণ করতে লাগল- হোবলের জয়! হোবলের জয়! নাবী (ﷺ) তখন বললেন- তোমরা কি তার কথার জবাব দেবে না? তাঁরা বললেন- হে আল্লাহর রসূল! বলুনঃ আমরা কি বলে তার জবাব দেব? তিনি বললেন- তোমরা বলঃ আল্লাহ মহান! তিনি সবচেয়ে বড়। আবু সুফীয়ান বলল- আমাদের আছে উয্যা। তোমাদের কোন উয্যা নেই। নাবী (ﷺ) বললেন- তোমরা কি তার কথার জবাব দেবে না? তারা বললেন- হে আল্লাহর রসূল! বলুনঃ আমরা কি জবাব দেব? নাবী (ﷺ) বললেন- তোমরা বলঃ আমাদের মাওলা হলেন আল্লাহ। তোমাদের কোন মাওলা নেই।
অতঃপর আবু সুফিয়ান বলতে লাগল- আজ আমরা বদরের যুদ্ধের বদলা নিতে সক্ষম হয়েছি। যুদ্ধের ক্ষেত্রে এ রকম সমান সমান হয়েই থাকে। উমার (রাঃ) তখন বললেন- সমান সমান হয় কিভাবে? আমাদের শহীদগণ জান্নাতী। আর তোমাদের নিহতরা জাহান্নামী।
আবু সুফিয়ান যখন শিরক, কুফর ও দেব-দেবী নিয়ে বাহাদুরী করল নাবী (ﷺ) তখন তাওহীদের বড়ত্ব প্রকাশ ও মুসলমানদের একমাত্র মাবুদ আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করার জন্য জবাব দিতে বললেন। এর আগে যখন সে বলেছিল- তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ বেঁচে আছে কি? আবু বকর বেঁচে আছে কি? উমার বেঁচে আছে কি? তখন তিনি জবাব দিতে নিষেধ করেছেন। কেননা তখনও তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা শেষ হয়নি। অতঃপর আবু সুফিয়ান যখন বলল- এদের তিনজনই নিহত হয়েছেন। তখন উমার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। তিনি বললেন- হে আল্লাহর দুশমন তুমি মিথ্যা বলেছ। এদের সকলেই জীবিত আছেন।
উমারের এই ঘোষণায় বিপদজনক অবস্থাতেও সাহসিকতা ও শত্রুদের প্রতি সজাগ থাকার পরিচয় পাওয়া যায়। এতে আরও পরিচয় পাওয়া যায় মুহাম্মাদের অনুসারীগণ বীরত্বের অধিকারী এবং তারা শত্রুদের থেকে ভীত নন। তার জবাবে শত্রুদের মর্ম জ্বালা সৃষ্টি হয়েছিল। আবু সুফিয়ান যখন প্রত্যেকের খবর আলাদাভাবে জানতে চেয়েছিল তখন তিনি জবাব দেন নি। আর যখন তিনজনের কথা একসাথে বলেছিল তখন জবাব দিয়েছেন। এতে তিনি তাদের শক্তিকে দুর্বল করতে চেয়েছেন। সুতরাং প্রথমবার জবাব না দেয়া উত্তম ছিল। দ্বিতীয়বার জবাব দেয়া উত্তম হয়েছে। প্রথমবার জবাব না দিয়ে তিনি আবু সুফিয়ানকে অপমানিত করতে চেয়েছেন। সে যখন তাদের তিনজনকে মৃত জেনে খুশী হতে চেয়েছিল এবং অহংকার করতে চেয়েছিল তখন জবাব দিয়ে তিনি তাকে নিরাশ করতে চেয়েছেন। সুতরাং উমার (রাঃ) এর জবাবে রসূল (ﷺ) এর নিষেধাজ্ঞার বিরোধীতা ছিলনা।
