Tuesday, September 1, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরএই ভয়াবহতার কোনো ব্যাখ্যা নেই!

এই ভয়াবহতার কোনো ব্যাখ্যা নেই!

দুই দিন আগে টাইমস অব ইসরাইল পত্রিকার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিদিন শয়ে শয়ে প্রাণ ঝরছে ইসরাইল-হামাস সংঘাতে। গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে চলমান যুদ্ধে গত চার মাসে গাজায় ২৭ হাজার ১৩১ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ শিশু রয়েছে। আহত হয়েছে ৬৬ হাজার ২৮৭ জন। অন্তত ১৭ হাজার শিশু পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে জাতিসংঘের চিলড্রেন এজেন্সির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউনিসেফ জানিয়েছে, গাজা উপত্যকার প্রায় সব শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে। ইউনিসেফের গাজা অঞ্চলের চিফ কমিউনিকেশন অফিসার জনাথান ক্রিক্স মিডিয়া ব্র্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘স্বজন ও পরিবার হারানোর একেকটি হূদয়বিদারক গল্প রয়েছে গাজার প্রতিটি শিশুর।’

ভয়াবহ গাজা যুদ্ধ শিশুদের জন্য কী ধরনের দুর্দিন বয়ে এনেছে, তা সহজে অনুমেয়। মারা যাওয়া শিশুর মধ্যে এমন ২৬৮ শিশু রয়েছে, যারা এক বছর বয়সের গণ্ডিও পার হতে পারেনি। বলা যায়, তাদের বয়স ‘শূন্য’ বছর! অনেক শিশু জন্মের পরপরই নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অনেকেই ‘নাম-পরিচয়হীন’—পরিবার তাদের নাম রাখারও সময় পায়নি!

আবদুল জাওয়াদ হুসু, আবদুল খালেক বাবা, আবদুল রহিম আওয়াদ, আবদুল রউফ আল-ফারা, মুরাদ আবু সাইফান, নাবিল আল-ইদি, নাজওয়া রাদওয়ান, নিসরিন আল-নাজার, ওদে আল-সুলতান, জায়েদ আল-বাহবানি, জেইন আল-জারুশা, জায়েন শাতাতের মতো বহু শিশু তাদের প্রথম জন্মদিন উদ্যাপন করতে পারেনি, কোনো দিন পারবেও না; কারণ, তাদের বাস আজ পরকালে।

একবার ভাবুন তো। তাদের বাবা-মা কি ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পেরেছিলেন যে, তাদের এমন দিন দেখতে হবে? গাজায় শুধু ‘এক বছর পার না করা’ শিশুই মারা পড়েনি; নিহত শিশুদের মধ্যে এক বা দুই বছর বয়সি শত শত শিশু রয়েছে। তিন বা চার বছর বয়সি শিশু কিংবা পাঁচ, ছয়, সাত বা আট বছর বয়সি শিশু—রেহাই পায়নি কেউই! প্রাণ ঝরেছে বহু যুবকের। লাশ হয়েছে অগণিত নারী-বৃদ্ধ।

যুদ্ধ মানেই হাজারে হাজারে হতাহত। তবে সংঘাতের মুখে পড়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিতান্ত হূদয়বিদারক। গাজায় শিশুমৃত্যুর তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে, বিখ্যাত কোনো সিনেমা শেষে নামের দীর্ঘ তালিকা ভেসে আসার মতো দৃশ্য, যে দৃশ্য দেখার সময় কানে ভেসে আসে বেদনাবিধুর সুর।

গাজার ২৩ লাখ মানুষের প্রায় অর্ধেকই শিশু। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যকার এই ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে তাদের জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মারাত্মকভাবে। ইসরাইল বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি এড়ানোর দাবি করছে বটে, কিন্তু থেমে নেই হতাহত। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় সাড়ে ১১ হাজারের বেশি শিশু তো নিহত হয়েছেই, একই সঙ্গে আহত হয়েছে এর চেয়ে বহুগুণ।

আরো দুঃখজনক হলো, এমন ঘটনাও আছে—গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেই হাসপাতালে শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। তার কোনো ‘নাম’ নেই। কেননা, তার নাম রেখে যেতে পারেননি বাবা-মা। এর আগেই ইসরাইলি হামলায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তারা। কী মর্মান্তিক!

যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু হামলা থেকে বেঁচে ফেরা শিশুদের অবস্থা কী? হাজার হাজার শিশু আছে, যারা খুব কাছ থেকে তাদের প্রিয়জনদের মৃত্যু দেখেছে। অনেকে বাবা-মাকে কবর দিতে দেখেছে। আগুন বা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে স্বজনদের দেহ বের করার চাক্ষুস সাক্ষী অনেক শিশু। কোমলমতি এসব শিশুর মনের অবস্থা কী, বুঝতে পারছেন?

হাজার হাজার শিশু পঙ্গুত্ব বরণ করতে বাধ্য হয়েছে। অনিশ্চিত জীবনে তাদের অবলম্বন এখন ‘কাঠের পা’। ভীতিকর পরিবেশ ও বোমার বিকট শব্দে শ্রবণশক্তি হারিয়ে চিরকালের জন্য ‘হতবাক’ হাজার হাজার শিশু। ভাবা যায় এই দৃশ্য!

ইউনিসেফের কর্মকর্তা জনাথান বলেছেন, গাজায় শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই অঞ্চলের প্রায় এক মিলিয়ন শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা বিশেষ প্রয়োজন। জনাথানের ভাষায়, ‘গাজার শিশুদের ক্রমাগত উদ্বেগ, ক্ষুধা হ্রাস ও ঘুমাতে না পারার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তারা যখনই বোমা হামলার শব্দ শোনে, মানসিকভাবে চরম আতঙ্কিত হয়।’

জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যান অনুসারে, এই যুদ্ধে বাবা-মা উভয়কেই হারিয়েছে ১০ হাজার শিশু। বলতেই হয়, এটা এমন এক যুদ্ধ, যেখানে প্রতি ঘণ্টায় মারা পড়ছেন দুই জন মা। কোনো ব্যাখ্যা, কোনো যুক্তি বা অজুহাত এই ভয়াবহতাকে ঢেকে রাখতে পারবে না কখনোই।

উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর ইসরাইল ভূখণ্ডে হামাসের নজিরবিহীন আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে গাজা উপত্যকায় অবিরাম বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। ইসরাইলি হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। নিহত হয়েছে বহু মানুষ। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ইসরাইলের অগ্রাসনে কমপক্ষে ২৭ হাজার ২৩৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এছাড়া ইসরাইলি হামলায় আহত হয়েছে আরো ৬৬ হাজার ৪৫২ ফিলিস্তিনি।

গাজায় নিহতের শিকার শিশুদের কথা ভেবে দেখুন। কোনো শিশু হয়তো দোলনার মধ্যেই মারা পড়েছে। ডায়াপার পরিহিত অবস্থাতেই মারা গেছে কেউ কেউ। ঠান্ডা মাথায় ভাবুন সেই শিশুদের কথা, যারা জীবন রক্ষার জন্য দৌড়ানোর মতো বয়সেরও ছিল না! এক মুহূর্তের জন্য হলেও চোখ বন্ধ করে ভাবুন, ১০ হাজার ক্ষুদ্র লাশের সারি দেখতে ঠিক কেমন হতে পারে! ধরুন, লাশগুলো পাশাপাশি পড়ে আছে; সেগুলোর কফিন খুলে তাদের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকান। গণকবরগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ান; সেখানে একই কবরে কয়টি লাশ দাফনে বাধ্য হয়েছেন পিতামাতা, গুনে দেখুন। পরিস্থিতি কতটা বিভীষিকাময়, বুঝতে পারছেন?

এই যে নির্বিচার শিশু হত্যা—এটা কী বার্তা দেয়? এর থেকে ঠিক কী লাভ হবে ইসরাইলের? এর জন্য অদূর ভবিষ্যতে তেল আবিবের কোনো মূল্য চোকাতে হবে কি না, তা নিয়ে কি কেউ ভাবছে? তবে যে যাই বলুক না কেন, শিশুরা যেভাবে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ও হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।

ইসরাইল কী ভাবছে, তারা কী বলছে, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। ‘তারা (হামাস) শুরু করেছে’, ‘এ ছাড়া আমাদের হাতে কোনো বিকল্প ছিল না, নেই’, ‘আমাদের কে কী করবে?’ ‘নিরপরাধ মানুষের হত্যা এড়াতে যা যা করা সম্ভব, তার সবই করেছে ও করছে আইডিএফ’—এ ধরনের নানা কথা ও মন্তব্য শোনা যায় তেল আবিবের পক্ষ থেকে। তবে সত্য বা বাস্তবতা যে ইসরাইল আদৌ পাত্তা দেয় না বা দিতে চায় না, এমনকি তারা এতে বিন্দুমাত্র আগ্রহও দেখায় না, তা সবার জানা!

ফিলিস্তিনিরা তাদের সন্তানদের ভালোবাসে না এবং ফিলিস্তিনি শিশুরা কেবল সন্ত্রাসীই হয়ে উঠবে—এ ধরনের কথার কি কোনো ভিত্তি আছে? এমন দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় একটা ভূখণ্ডের গোটা প্রজন্মকে মুছে ফেলার প্রবণতা কি কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এই দৃশ্য কি কোনোভাবে ভোলার মতো? যেসব পিতামাতা সন্তান হারাচ্ছেন, তারা কি সব বেমালুম মন থেকে ঝেড়ে ফেলবেন? বিশ্বের বিবেকবান মানুষই-বা শিশু হত্যার ঘটনায় কতক্ষণ নীরব থাকবে? এসব প্রশ্ন বেশ জটিলই।

একটা বিষয় অত্যন্ত হূদয়বিদারক। গাজায় এখন পর্যন্ত যেসব শিশু মারা গেছে, যদি ডিজিটাল স্ক্রিনের পর্দায় তাদের তালিকা প্রদর্শন করতে চাওয়া হয়, তাহলে পাক্কা সাত মিনিট সময় লাগবে! অর্থাত্, আপনি যদি গাজা যুদ্ধে নিহত শিশুদের তালিকা দেখতে চান, তাহলে আপনাকে সাত মিনিট ধরে দম বন্ধ করে তা দেখতে হবে। গাজার শিশুদের দুর্বিষহ জীবনের মতোই করুণ এই দৃশ্য। সত্যিই, গাজার হাজার হাজার শিশুর নির্বািচার হত্যাকাণ্ড দেখে চুপ থাকা কঠিনই। বাস্তবিক অর্থেই ‘শেষ পর্যন্ত চুপ থাকাটা যে কারো জন্যই কঠিন।’

লেখক: হারেটেজর নিয়মিত কলামিস্ট ও সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য

হারেটজ থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

5 × 5 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য