Wednesday, June 24, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াকর্জে হাসানা; ক্ষুদ্র ঋণের বিকল্প।

কর্জে হাসানা; ক্ষুদ্র ঋণের বিকল্প।

একটি পূর্নাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলামের একটি নিজস্ব অর্থব্যবস্থা রয়েছে। খেজুর পাতার মসজিদে নববী কেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্রের যে গোড়াপত্তন হয়েছিলো তার শুরুটা মোটেও সুখকর ছিলো না। মদীনার বিভিন্ন গোত্রের ষড়যন্ত্র মোকাবিলার পাশাপাশি বহিঃশত্রুর হামলা মোকাবিলা করতে হয়েছে অনেকবার। এমন রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও রাসূল (সাঃ) অর্থনীতি ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে একটি অভূতপূর্ব ও নৈতিক অর্থব্যবস্থার গোড়াপত্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সফল এই অর্থব্যবস্থা খেলাফতে রাশেদার সোনালী যুগ পেরিয়ে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানীয় শাসনামলেও দ্যুতি ছড়িয়েছে । জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ইসলামী রাষ্ট্রের সকল নাগরিক এই সুষম অর্থনীতির সুবিধা ভোগ করেছে যুগের পর যুগ। এই সফল অর্থনীতির উপর ভর করেই দুর্দান্ড প্রতাপে শতশত বছর মুসলিমরা অর্ধ-পৃথিবী শাসন করেছে।
কিন্তু গৌরবোজ্জ্বল সেই দিনগুলো এখন পুস্তকের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির দিকে চোখ বুলালে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক দৈন্যতা উপলব্ধি করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। জিডিপি, মাথাপিছু আয়, মাথাপিছু ঋণ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, দুর্নীতি, দারিদ্র্যের হার প্রভৃতি ক্ষেত্রে অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ভয়াবহ চিত্র এখন ওপেন সিক্রেট।


মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশের জনসংখ্যা মূলত গ্রামীণ। প্রায় ৮০ শতাংশ জনসংখ্যা গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। উইকিপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী গ্রামীণ এলাকায় আনুমানিক ৩৫ শতাংশ জনসংখ্যা দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। গ্রামীণ দারিদ্র্যের একটি প্রধান কারণ হচ্ছে দেশের ভৌগোলিক এবং জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। অর্থনৈতিক মন্দা সমস্যার পাশাপাশি প্রতিবছর বন্যায় কবলিত জনগোষ্ঠীর ফসল, বাড়িঘর এবং জীবিকার ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। উপরন্তু নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রাদুর্ভাব ঘটায় কলেরা, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগের। দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, চিকিৎসা, জীবিকানির্বাহ ও নতুন করে ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করতে ব্যাপক আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হয়। তাদের সহযোগিতার ক্ষেত্রে সরকার সহ বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।


বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এই আর্থিক দুরাবস্থাকে পুঁজি করে দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্ষুদ্রঋণ, পরিবেশ, নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক উন্নয়নের নামে ব্যাঙের ছাতার মতো নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার NGO ( Non Grovernment Organisation)। “৭১-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে NGO কার্যক্রম শুরু হয় ত্রাণ সহায়তার মাধ্যমে। গত প্রায় ৫০ বছরে এ সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে গিয়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সমাজসেবা অধিদফতরে নিবন্ধিত আছে ৫৬ হাজার, সমবায় অধিদফতরের অধীনে ১ লাখ ৫০ হাজার, মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের অধীনে ১৬ হাজার এবং এনজিও ব্যুরোতে নিবন্ধিত আছে ২ হাজার ৫০০”। (দৈনিক যুগান্তর-১৭মে ২০২০)। তন্মধ্যে বিদেশী সাহায্য পুষ্ট NGO-এর সংখ্যা প্রায় আট শত।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অপ্রতুল কর্মসংস্থান, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তর করার ব্যর্থতা, উদ্যোক্তার অভাব, সম্পদের অসম বণ্টন, দুর্নীতি, সুদ প্রথার ব্যাপক প্রচলন ইত্যাদি দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা সাধারণত সুদ গ্রহণ ও প্রদানকে ধর্মীয় ও নৈতিকতার দিক থেকে অপরাধ মনে করে। কিন্তু স্বচ্ছল জীবন গঠনের প্রত্যাশা এবং চরম অভাবের জীবন থেকে মুক্তির আশায় মানুষ ঋণের মুখাপেক্ষী হয়। তাদের এই দুর্বলতার সুযোগে দারিদ্র বিমোচনের নামে এনজিওগুলো চড়া সুদে ঋণ দিয়ে গরীব জনগণের অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততা আরও ত্বরান্বিত করছে। আবু ইসহাকের লেখা ‘জোঁক’ গল্পের নির্দয় মহাজন ‘চৌধুরী সাহেব’ চরিত্রের আধুনিক ভার্সন হলো এই ছদ্মবেশী এনজিও । সুন্দর কর্মসূচি ও তথাকথিত সমাজসেবার আড়ালে তাদের অশুভ কার্যক্রমের কথা সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান সকলেই অবগত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে বলেছেন,“একসময় আমরাও এটাকে সমর্থন দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম যে এর মাধ্যমে বুঝি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবে। কিন্তু যখন আমরা বিষয়টা আরও গভীরভাবে দেখলাম, তাতে দেখলাম আসলে এর মাধ্যমে দারিদ্র্য ঠিক বিমোচন হয় না, দারিদ্র্য লালন-পালন হয়।” (দৈনিক প্রথম আলোঃ ১৯ নভেম্বর)


শিক্ষা ও সেবার নামে এনজিওগুলো এদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কষ্টার্জিত অর্থ বিদেশে পাচারের পাশাপাশি ঈমান হরণের কাজেও বদ্ধপরিকর। পার্বত্য অঞ্চলে খ্রিস্টান মিশনারীর অপতৎপরতা ও ক্রমবর্ধমান খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী এর সুস্পষ্ট বার্তাবাহক। বর্তমানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অসহায়ত্বের সুযোগে সহযোগিতার নামে তাদের ধর্মান্তরিত করার সবরকম পাঁয়তারা তারা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এদেশের দরিদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীকে এই ইহকালীন ও পরকালীন অনিবার্য ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে এনজিও’র বিপরীতে যথাযথ আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তা না হলে তাদের এই অশুভ প্রচেষ্টা রুখে দেওয়া সম্ভব নয়।


অর্থ ছাড়া অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের সংক্ষিপ্ত ও ভিন্ন কোনো পথ নেই। তাই প্রান্তিক জনগণের দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের একটাই পথ; আর তা হলো টেকসই পদক্ষেপ ও সুদ মুক্ত আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের পথ তৈরী করা। এক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, দরিদ্র ভাতা প্রদান, এককালীন আর্থিক অনুদান, সুদ মুক্ত প্রণোদনা, যথাযথ যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের পাশাপাশি কর্জে হাসানা বা সুদ মুক্ত ঋণ প্রদান বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। উল্লেখ্য যে, কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ হলো মহান আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ও সওয়াবের আশায় বিনা শর্তে কাউকে কোনো কিছু ঋণ প্রদান করা।


প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন করতে ক্ষুদ্রঋণের বিরুদ্ধে সমালোচনা কিংবা সচেতনতা বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। এর বিকল্প হিসেবে যথাযথ আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের বাস্তব জীবনে এই সচেতনতা তেমন কোনো কাজেই আসবে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর “কর্জে হাসানা” প্রদানের সচল কার্যক্রম নেই বললেই চলে। বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংকে অফিসিয়ালি কর্জে হাসানা দেওয়ার বিধান থাকলেও আর্থিক নিরাপত্তা ও কমার্শিয়াল কারণে তা খুব একটা বাস্তবায়িত হয় না। তবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) এক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামী ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে আরডিএস বিশ্বে সর্ববৃহৎ। কিন্তু বিনিয়ােগের খাত ও ধরণের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়ােগ পদ্ধতির ভিন্নতা ও শর্তাবলী, মাঠ পর্যায়ে এনজিও’র তুলনায় কম তৎপরতা ও পরিচিতি, জামানতসহ বিভিন্ন কারণে এই প্রকল্প এখনও নিজেকে এনজিও’র শতভাগ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। তদুপরি দেশীয় প্রেক্ষাপটে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের এই কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। তাই সফল এই প্রকল্পকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে সকল ইসলামী ঘরানার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ব্যাপারে আন্তরিক হওয়া বাঞ্ছনীয়।


এদেশে এনজিও’র সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এককভাবে দায়বদ্ধ নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হিসেবে জনগণের দ্বীনি চেতনা হ্রাসও এক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী। সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা ঋণ দিয়ে অন্যকে সহযোগিতা করাকে অলাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে। অথচ এটি একটি আর্থিক ইবাদত এবং পরকালীন মুক্তির পথকে সহজ করার অন্যতম মাধ্যম। কোরআন ও সহীহ হাদীসে বহুবার কর্জে হাসানার প্রতি উৎসাহ ও ফজীলত বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
“তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে ,যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিবে? তাহলে তিনি তা তার বিনিময়কে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিবেন। আর তার জন্য আছে সম্মানজনক প্রতিদান।” (সূরা হাদীদঃ ১১)
উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদানের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করা। তবে ফজীলতের দিক থেকে কোনো কোনো বিদ্বান মানুষকে অর্থ ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করাকেও এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।


কর্জে হাসানার ফজীলত সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হলো। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন “কোন মুসলমান অপর মুসলমানকে দু’বার কর্জ দিলে সে সেই পরিমাণ অর্থ একবার দান করার সমান সওয়াব পায়। ”( ইবনে মাজাহঃ ২৪৩০)


আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে লোক কোনো অভাবী (ব্যক্তিকে ঋণ দেয় এবং ঋণ পরিশোধের জন্য) ঋনগ্রস্তকে যথেষ্ট সুযোগ প্রদান করে অথবা ঋণ মাফ করে দেয়, কিয়ামাতের দিবসে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে নিজের আরশের ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করবেন, যেদিন তাঁর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না।” (তিরমিজিঃ ১৩০৬)


বুরায়দাহ আল-আসলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাঃ) বলেছেন,“যে ব্যক্তি (ঋণগ্রস্ত) অভাবী ব্যক্তিকে অবকাশ দিবে, সে ঐ পরিমাণ দান করার সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি ঋণ শোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ও সময় বাড়িয়ে দিবে সেও প্রতিদিন ঐ পরিমাণ অর্থ দান করার সওয়াব পাবে!” (আহমাদ ২২৪৬১)


বুরায়দাহ আল-আসলামী (রাঃ) অপর এক হাদীসে বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ঋন পরিশোধের জন্য কাউকে নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত সুযোগ দেয় তাহলে প্রতিদিন ঐ পরিমাণ অর্থ আল্লাহর রাস্তায় দান করার সওয়াব তার আমলনামায় যুক্ত হয়! আর ঋণ পরিশোধের মেয়াদ শেষ হলে যদি আবারও মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় তাহলে প্রদেয় ঋণের দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ প্রতিদিন আল্লাহর রাস্তায় দান করার সওয়াব তার আমলনামায় যুক্ত হয়!” (সহীহ তারগীবঃ ৯০৭)।


আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে লোক কোন ঈমানদারের দুনিয়ার কোনো বিপদ দূর করে দিবে, আল্লাহ তা‘আলা বিচার দিবসে তার থেকে বিপদ সরিয়ে দিবেন। যে লোক কোন দুঃস্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন। যে লোক কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাই-এর সহযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন”। (মুসলিমঃ ৬৭৪৬)


উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস সমূহ দ্বারা শরীয়তে কর্জে হাসানার গুরুত্ব ও ফজীলত খুব সহজেই অনুমেয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই সুযোগ গ্রহণ করে নিজের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করা।


ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারাও এক্ষেত্রে দায়মুক্ত নয়। কর্জে হাসানা গ্রহণ করে পরিশোধের ক্ষেত্রে টালবাহানা করায় ঋণদাতারা আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে ঋণ দানে নিরুৎসাহিত হন। সমাজে কর্জে হাসানা প্রথা হ্রাস পাওয়ার এটা অন্যতম প্রধান কারণ। এ সকল কপটচারী ব্যক্তিদের সতর্ক করে রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ “ধনী ব্যক্তি কর্তৃক দেনা পরিশোধে টালবাহানা করাটা তার মানহানি [অর্থাৎ, তার সম্পর্কে অভিযোগ করা] এবং শাস্তিকে বৈধ করে দেয়”। (নাসায়ীঃ ৪৬৮৯)


তিনি আরও বলেনঃ “সামর্থ্যবান ব্যক্তির পক্ষ হতে ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম”। (বুখারীঃ ২২৮৮)

শুধু তাই নয় মুসলিম হিসেবে সুদের ভয়াবহতা জেনেও অনেকে সামান্য অভাব কিংবা নিছক বিলাসিতার জন্য ঋণ গ্রহণ করে। উৎপাদনমূলক বা আয়বর্ধক কাজের জন্য ঋণ না নিয়ে অনেকে অপেক্ষাকৃত ধনীদের জীবনযাত্রা প্রণালী অনুকরণের জন্য এনজিওগুলোর দ্বারস্থ হয়। ঋণ পরিশোধের সাপ্তাহিক/মাসিক কিস্তি প্রদানের বাধ্যবাধকতা, উচ্চ সুদের সমস্যা এবং ঋণের অন্যান্য কঠোর শর্তাবলী তাদের ঋণমুখী হওয়া থেকে নিবৃত করতে পারেনি। ফলে বহুমুখী ঋণের জালে তারা আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এভাবেই ঋণগ্রহীতাদের পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এনজিওগুলো তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মুসলিমদের দ্বীনি চেতনা জাগ্রত না হলে হয়তো এই অভিশাপ থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।
সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিশরসহ প্রত্যেকটি দেশেই কর্জে হাসানা প্রথা ব্যাপকভাবে চালু রয়েছে। সুদের কারণে এসব দেশে মাইক্রো ক্রেডিট ব্যাপকতা পায়নি। বেইজিং, ফিলিপাইনের ম্যানিলা, লসবেনস, মিন্দানাও এবং কালাম্বা শহরেও মুসলমানদের বেশ কিছু সমিতি ও ইসলামীক সেন্টার আছে যেখানে সদস্যরা কর্জে হাসানার লেনদেন করেন। (দৈনিক সংগ্রামঃ ৯ জুলাই,২০১৯)।

তাদের অনুকরণে এদেশের সরকার,ইসলামী ঘরানার ব্যাংক, ইসলামী রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক সংগঠন, সমাজসেবামূলক সংগঠন, সমবায় সমিতি কিংবা ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ যদি কর্জে হাসানা ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগী হন তাহলে আমরাও আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবো ইন শাআ আল্লাহ। এ অলাভজনক ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক ব্যয়ের খরচ যোগানের ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতার কাছে থেকে সর্বনিম্ন পরিমাণ ‘সার্ভিস চার্জ’ গ্রহন করা যেতে পারে, এ বিষয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ ইতিবাচক মত দিয়েছেন। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দাহ সুদ মুক্ত ঋণের ক্ষেত্রে ২% থেকে ৩% সাভির্স চার্জ আরোপ করে। তবে আদায়কৃত চার্জ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যয় ছাড়া অন্য খাতে ব্যবহার বৈধ নয়। পাকিস্তান সরকারের ন্যায় পল্লী ঋণের সার্ভিস চার্জ তৃতীয় পক্ষ হিসেবে সরকারও বহন করতে পারে।
পরিশেষ বলা যায় সরকার, সাধারণ জনগণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বীনি চেতনা ও আন্তরিকতা, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জোরালো পদক্ষেপ ও প্রচারণা ইত্যাদি সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন, আমিন।

আব্দুল্লাহ আরমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

four × 2 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য