ভারতের জাতীয় গণমাধ্যমের ওপর হিন্দুদের প্রাধান্য রয়েছে, এ জন্য অহিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যগুলো জাতীয় গণমাধ্যমে খুব বেশি স্থান পায় না। আর অহিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যগুলো এবং সেখানে সংঘটিত বিশৃঙ্খলার প্রতি এ কারণেই অপর সংবাদ সংস্থাগুলোর মনোযোগও কম হয়। কর্নাটকে যা কিছুই হচ্ছে, তার সব কিছু সেই অমনোযোগিতার কারণে মিডিয়ার শোভাবর্ধন করছে না। তা না হলে কর্নাটকে হিন্দুত্ববাদের বাড়াবাড়ি উত্তরপ্রদেশের মতোই ধ্বংসযজ্ঞ চললেও মিডিয়াতে আসছে না কেন?
হিন্দুত্ববাদের শান্তি বিনষ্টকারী তৎপরতা থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ‘গোদি মিডিয়া’র (গৃহপালিত পোষ্য মিডিয়া) পলিসিও দায়ী। ওই পলিসির রীতি হচ্ছে, প্রতিটি বিষয়কে মুসলিমবিরোধী বানিয়ে উপস্থাপন করা ও গেরুয়া বাহিনীকে সর্বাবস্থায় রক্ষা করা। দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বেশ ভালোভাবেই এ পলিসির ফায়দা নিচ্ছে। আর পাশাপাশি মুসলিমবিরোধী মানসিকতা এখানে ক্রমান্বয়ে ডালপালা ছড়াচ্ছে। এমনকি আজ কর্নাটকে মুসলিমবিরোধী প্রবণতার ধরন উত্তরপ্রদেশের মতো, বরং কিছু বিষয়ে তার চেয়েও গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্নাটক বিশেষত দক্ষিণ কর্নাটক অঞ্চল মুসলিম বিরোধিতার লালনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এ এলাকাটিতে অতীতে শান্তি বিরাজ করত। গত নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৮ সালে কর্নাটকের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯টি বিধানসভার আসনের ১৮টিতে বিজেপি জয় লাভ করে। তখন থেকেই এখানকার পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। পুলিশের হিসাব মতে ২০২১ সালে দক্ষিণ কর্নাটক অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার (মুসলমানদের ওপর হামলার) ৬৭টি ঘটনা ঘটেছে। শুধু মাঙ্গলুরুর মতো শহরে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ২৩টি ঘটনা ঘটেছে।
কর্নাটকে প্রতিটি ইস্যুকে মুসলিমবিরোধী রূপ দেয়ার মানসিকতা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ কর্নাটকে যেহেতু বিজেপি এক বিশাল রাজনৈতিক শক্তি, সে কারণে এখানে এ বিশৃঙ্খলা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিছু দিন আগে দু’জন মুসলিম যুবককে হত্যা এই সাম্প্রদায়িকতারই ফল। কর্নাটকের কালি মঠের নেতা ঋষি কুমার স্বামী মুসলিম যুবক ফাজিলের হত্যায় বলেন, ‘যদি তাকে (মুহাম্মদ ফাজিলকে) আমাদের লোকেরা হত্যা করে থাকে, তাহলে আমি বেশ খুশি। তবে এখনো ৯টি মাথা কাটা বাকি আছে। এক হিন্দু হত্যার বিনিময়ে আমাদের ১০ জন মুসলমানের মাথা কাটা উচিত। যদি পুলিশ তাদের এনকাউন্টার করতে না পারে, তাহলে আমাদের অস্ত্র তুলে দিক, আমরা নিজেদের বদলা নিজেরাই নেবো।’ ঋষি কুমার স্বামীর এত স্পষ্ট উসকানিমূলক উত্তেজনাপূর্ণ বিষোদগার সত্ত্বেও পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
এ সেই ঋষি কুমার স্বামী, যিনি ফেব্রুয়ারি মাসে বজরঙ্গ দলকর্মী হারশা হত্যার পর হিন্দুদের কাছ থেকে মুসলমানদের বয়কটের শপথ নিয়েছিলেন। বজরঙ্গ দলকর্মী হারশার হত্যাকে পুঁজি করে গেরুয়া বাহিনী এই এলাকায় সর্বাত্মক শক্তি দিয়ে মুসলিমবিরোধী বিষোদগারের কাজ করেছিল। সাম্প্রতিক খুনখারাবির সূচনা সেখান থেকেই হয়েছে। বজরঙ্গ দলকর্মী হারশার অনেক অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে। তার বিরুদ্ধে হত্যার উদ্যোগ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পাঁচটি মামলা আগেই দায়ের করা ছিল। হারশা হত্যার প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডকে ব্যক্তিগত আক্রোশ ও একটি সাধারণ অপরাধমূলক ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। কিন্তু পরে পুলিশ অজ্ঞাত কারণে নিজেদেরই তদন্তকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং এটাকে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড ঘোষণা করে।
এখানেই শেষ নয়, পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো বড় ধরনের ষড়যন্ত্র আছে বলেও ঘোষণা করে। বজরঙ্গ দলকর্মী হারশার পরিবারকে মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বরাজ বোমাই ২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। এর দুই মাস পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হিন্দু যুবক চান্দ্রুর মৃত্যুর দায়ও হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেয়। তারা এটাকে মুসলিমবিরোধী প্রোপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করে। এ ব্যাপারে পুলিশ শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থানে দাঁড়িয়ে থেকে বলেছে, উল্লিখিত মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনার কারণে হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কর্নাটক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টরূপে হিন্দুদের পক্ষে এবং মুসলমানদের বিপক্ষে। বিশ^রাজ বোমাই সরকার তাদের হিন্দুপ্রীতিতে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ রাখতে চায় না। সরকারের দ্বিমুখী নীতি ও দ্বিমুখী মনোভাব এটাকে স্পষ্টরূপে প্রকাশ করছে। আগস্টের শুরুতে এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী বোমাই সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য ওই তিন নিহত ব্যক্তির মধ্য থেকে শুধু হিন্দু নিহত পারভীনের পরিবারের সাথেই সাক্ষাৎ করেছেন। মুসলমান নিহতদের (মাসউদ ও মুহাম্মদ ফাজিলের) পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করার প্রয়োজন মনে করেননি। মাসউদের বাড়ি পারভীনের বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে।
শুধু তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বরাজ বোমাই পারভীনের জন্য ২৫ লাখ রুপি প্রদানেরও ঘোষণা করেন, পক্ষান্তরে মাসউদ ও মুহাম্মদ ফাজিলের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ প্রদানের ঘোষণা করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতেই মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বরাজ কর্নাটকে যোগী আদিত্যনাথের বুলডোজার মডেলকে বাস্তবায়নেরও কথা বলেন। একটা সময় ছিল, যখন কর্নাটককে শিক্ষিত ও উন্নত রাজ্য মনে করা হতো এবং সিঙ্গাপুর ও সাংহাইয়ের সাথে বেঙ্গালুরুর তুলনা করা হতো। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বরাজ এখন কর্নাটককে উত্তরপ্রদেশ বানানোর খায়েশ প্রকাশ করছেন। একটা সময় ছিল যখন কর্নাটকের জন্য সিঙ্গাপুর আদর্শ হিসেবে কাজ করত। আর এখন এমন এক সময় এসে গেছে যে, তার জন্য উত্তরপ্রদেশ আদর্শ হয়ে গেছে। কে ভেবেছিল, কর্নাটকের মতো রাজ্য উত্তরপ্রদেশকে নিজেদের জন্য অনুকরণীয় মানদণ্ড বানাবে। এ সব গেরুয়া ব্রিগেডেরই চরম পরাকাষ্ঠা। বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বরাজ এই গেরুয়া ব্রিগেডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বরাজের রাজনৈতিক যাত্রাও ধোঁকাবাজির এক অনন্য উদাহরণ। বিশ্বরাজ বোমাই কর্নাটকের বিখ্যাত সোশ্যালিস্ট নেতা এস আর বোমাইয়ের পুত্র। পিতার মতোই বিশ^রাজও শুরুতে সোশ্যালিস্টই ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন কর্নাটকের রাজনীতিতে বিজেপির সূর্যের ঊর্ধ্বারোহণ দেখলেন, তখন তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা হিন্দুত্ববাদী আসল রূপে ফিরে আসে। তিনি সোশ্যালিস্টর কায়া পাল্টে ফেলেন এবং নিজের আসল হিন্দুত্ববাদী রঙ প্রকাশ করেন, যা তিনি বেশ কষ্টে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এরপর এই সাবেক সোশ্যালিস্ট ব্যক্তি কর্নাটককে হিন্দুত্ববাদের নতুন ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফেলেন। তার শাসনামলে এমন এমন কাজ হয়েছে, যা কয়েকটি পুরাতন বিজেপি রাজ্যেও হয়নি।
কর্নাটকের স্কুলগুলোতে মুসলমান ছাত্রীরা চিরকাল হিজাব পরিধান করে আসছে। কখনো কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগেনি। কিন্তু বিশ্বরাজের প্রশাসনে হিজাবের এক মিটার কাপড়েও হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। ভারতের কোনো রাজ্য সরকারই হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল না, সাবেক সোশ্যালিস্ট নেতা বিশ্বরাজের সরকার প্রথম সরকার যারা স্কুলগুলোতে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করে। বিষয়টি এখানেই থামেনি, বরং এরপর হালাল গোশত বয়কটের মতো অবিশ্বাস্য অপতৎপরতাও এই কর্নাটক থেকে শুরু হয়। গেরুয়া জোট হালাল গোশতকে হিন্দুবিরোধী অভিহিত করেছে।
কয়েক মাস আগে কর্নাটকেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কিছু সন্ত্রাসী এক মুসলমানের মুরগির দোকানে যায়। তাকে ‘হারাম’ গোশত দিতে বলে। দোকানদার যখন এর অপারগতা প্রকাশ করে, তখন তারা তাকে মারধর করে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। হিজাব ও হালাল গোশত বয়কটের পর মুসলমান দোকানদারদের বয়কটের আহ্বান করা হয়। কর্নাটকে শত শত বছর ধরেই হিন্দু মন্দিরগুলোর বাইরে আয়োজিত মেলায় মুসলমান দোকানদার স্টল দিয়ে আসছে। কিন্তু গত এক বছরে এমন মেলাগুলোতে মুসলমানদের স্টল বসানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
মোট কথা, কর্নাটকে বিশ্বরাজ বোমাইয়ের সরকার গঠনের পর থেকে মুসলমানদের জীবনপরিধি সঙ্কীর্ণ করার কাজ একের পর এক অব্যাহত রয়েছে। এসব কিছুর ফলেই পরিস্থিতি খুনখারাবি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। জুন-জুলাইয়ে প্রায় ৪০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়েছে যে, দক্ষিণ কর্নাটকের কিছু এলাকায় পুলিশ মোটরসাইকেলে দু’জন আরোহী নিষিদ্ধ করে। এ নিষেধাজ্ঞা কিছু দিন পর প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তবে রাতে এখনো এ নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। কর্নাটকে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের মে মাসে বিধানসভা নির্বাচন। ধারণা করা হচ্ছে, যা কিছু হচ্ছে, সব কিছু নির্বাচনকে মাথায় রেখেই করা হচ্ছে। যেকোনো দল মুসলমানদের পক্ষে কিছু বলতে এ কথা ভেবে ভয় পাচ্ছে যে, পাছে হিন্দু ভোটব্যাংক তাদের প্রতি নাখোশ না হয়ে যায়। আর ভোটব্যাংকের এ ভীতিই হিন্দুত্ববাদী জোটকে সর্বপ্রকারের মুসলিমবিরোধী অপতৎপরতার পূর্ণ স্বাধীনতা দিচ্ছে।
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক উর্দু টাইমস-এর উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
