সম্পাদকীয় নোট
এই অনুসন্ধানটি কয়েক মাসব্যাপী পরিচালিত হয়েছে। এতে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকালীন সময়ে ভারতের হাইকমিশনারের আচরণসংক্রান্ত যোগাযোগ, বৈঠক, প্রকাশ্য বক্তব্য এবং সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনসমূহ যাচাই করা হয়েছে।
প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে কিছু সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য পর্যালোচনা করা হলেও কোনো ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, কারণ সেগুলো এই প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল না। এই অনুসন্ধান জনস্বার্থ, আনুপাতিকতা ও জবাবদিহিতার নীতির প্রতি কঠোরভাবে অনুগত থেকেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে—বিশেষ করে হত্যার দায়ে—দোষী সাব্যস্ত করেছে।
একাধিক অভিযোগের মধ্যে কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা দেওয়া এবং দায়িত্বে ব্যর্থতার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী করা হয়। তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
অভিযোগ নম্বর ৫ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ও কামাল আশুলিয়ায় ছয়জন ছাত্র আন্দোলনকারীকে গুলি করার ঘটনায় অভিযুক্ত হন। এদের মধ্যে পাঁচজনকে হত্যার পর আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং অপর একজনকে জীবিত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
এই রায়গুলো রাজনৈতিক সহিংসতার দায়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একই সঙ্গে এই সংকটকালে বিদেশি কূটনীতিকদের ভূমিকার দিকেও নতুন করে আলোকপাত করেছে।
ভারতের হাইকমিশনারের আচরণ

এই পত্রিকার অনুসন্ধান, যা একাধিক স্বাধীন সূত্র দ্বারা সমর্থিত ও যাচাইকৃত, নিম্নলিখিত তথ্য নিশ্চিত করেছে—
১৯ জুলাই ২০২৪ দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে ৬৫ সেকেন্ডের একটি ফোনালাপ করেন।
দিনটি ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রক্তক্ষয়ী দিন। সেদিন মোট ৫৬ জন মানুষ নিহত হন, যার মধ্যে ৪৬ জন ঢাকায় প্রাণ হারান। ওই দিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সরকার কারফিউ জারি করে এবং সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেয়।
একই দিনে পুলিশ আন্দোলনের তিন নেতা—নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বকর মজুমদারকে গ্রেপ্তার করে। এই সময় আবদুল কাদের নয় দফা দাবি ঘোষণা করেন।
৫ আগস্ট ২০২৪ দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিটে—যেদিন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে—সেদিন আসাদুজ্জামান খান কামাল নিজেই প্রণয় কুমার ভার্মাকে ফোন করেন। ফোনালাপটির স্থায়িত্ব ছিল ১৫৩ সেকেন্ড।
৩১ জুলাই ২০২৪, যখন প্রাণঘাতী সহিংসতা দ্রুত বাড়ছিল, তখন ভারতের হাইকমিশনার ঢাকায় শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠকের খবর ভারতীয় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
বৈঠকের পর ভারতীয় গণমাধ্যম, বিশেষ করে ডিডি নিউজ, প্রণয় কুমার ভার্মার বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায় যে তিনি বাংলাদেশে “ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরে আসছে” বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দেশটির স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে ভারতের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
ফোনকলের রেকর্ড দুটি স্বাধীন সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। এসব যোগাযোগ ও বক্তব্যের সময় বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ চলমান ছিল।
সহিংসতার ব্যাপ্তি
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (OHCHR) অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন এবং আরও হাজার হাজার মানুষ আহত হন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ মৃত্যুই নিরাপত্তা বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ফলে ঘটে এবং নিহতদের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ ছিল শিশু।
প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়, এই ঘটনাবলি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বহন করে।
এই প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জ্ঞান ও কূটনৈতিক দায়িত্ব
কূটনৈতিক রীতিনীতি অনুযায়ী, ব্যাপক গণহত্যা ও সহিংসতার সময়ে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ খুব কম ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই ধরনের বৈঠক, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং প্রকাশ্য বক্তব্য রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আন্তর্জাতিক নজরদারি ও সহনশীলতার বার্তা হিসেবে কাজ করে।
এই প্রেক্ষাপটে কোনো প্রকাশ্য শর্ত, উদ্বেগ বা আপত্তি ছাড়াই যোগাযোগ অব্যাহত রাখলে তা চলমান সহিংসতার প্রতি নীরব সম্মতি হিসেবে ব্যাখ্যা হওয়ার পূর্বানুমেয় ঝুঁকি তৈরি করে।
এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় যখন প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চলমান থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতিকে “স্বাভাবিকতায় ফিরছে” বলে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়।
ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের একাধিক কর্মকর্তা—যাদের মধ্যে জুলাই ও আগস্ট ২০২৪-এ বিভিন্ন ব্রিফিং ও প্রতিবেদনে প্রবেশাধিকার ছিল—স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছেন যে হাইকমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী অভিযানের মাত্রা সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা, স্থানীয় নাগরিক সমাজ এবং কূটনৈতিক অংশীদারদের তথ্য নিয়মিতভাবে মিশনের অভ্যন্তরে আদান-প্রদান হচ্ছিল।
এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হাইকমিশনারের সরকারি ইমেইলে যোগাযোগ করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
প্রকাশনার পর কোনো পূর্ণাঙ্গ জবাব পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে, যা এখনো বহাল রয়েছে।
এই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত
এই অনুসন্ধান কোনো ফৌজদারি দায় আরোপ করছে না। তবে এটি নিম্নলিখিত বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করেছে—
মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সময় ভারতের হাইকমিশনার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন, যাঁরা পরবর্তীতে ওই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন
গণহত্যা চলমান থাকা অবস্থায় তিনি পরিস্থিতিকে প্রকাশ্যে “স্বাভাবিকতায় ফিরছে” বলে আখ্যায়িত করেন
বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে তিনি কোনো প্রকাশ্য উদ্বেগ, নিন্দা বা দূরত্ব বজায় রাখার অবস্থান নেননি
এই আচরণ ব্যাপক নৃশংসতার সময়ে কূটনৈতিক সংযম ও নিরপেক্ষতার প্রত্যাশিত মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত।
আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক জবাবদিহি
ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস (১৯৬১) অনুযায়ী, কূটনীতিকরা স্বাগতিক দেশে বিচার থেকে দায়মুক্তি ভোগ করেন। ফলে বাংলাদেশ কোনো প্রমাণ থাকলেও ভারতের হাইকমিশনারকে বিচারের আওতায় আনতে পারে না।
তবে একই আইনি কাঠামো একটি সুস্পষ্ট জবাবদিহির পথও নির্ধারণ করে।
ভিয়েনা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৯ অনুযায়ী, স্বাগতিক রাষ্ট্র যেকোনো সময় এবং ব্যাখ্যা ছাড়াই কোনো কূটনীতিককে persona non grata ঘোষণা করতে পারে, যদি তার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।
কোনো কূটনীতিককে persona non grata ঘোষণা করা একটি বৈধ কূটনৈতিক পদক্ষেপ, যা আস্থার ভাঙন বা জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যতার প্রতিফলন।
এই প্রতিবেদন আমাদের কী জানায়
যাচাইকৃত যোগাযোগ, বৈঠক, প্রকাশ্য বক্তব্য এবং একই সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রামাণ্য মাত্রা বিবেচনায় এই অনুসন্ধান উপসংহারে পৌঁছেছে যে, ভারতের হাইকমিশনারের আচরণ মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত কূটনৈতিক দায়িত্বের মানদণ্ড ক্ষুণ্ন করেছে।
বাংলাদেশ নিজ দেশের নেতাদের গণহত্যা ও রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য জবাবদিহির আওতায় এনেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—একই সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত একটি সরকারের কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ্যে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করা আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও কি একই নৈতিক মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়?
ভারতের হাইকমিশনারকে persona non grata ঘোষণা করা হবে একটি বৈধ, আনুপাতিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদক্ষেপ, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সমুন্নত করবে, নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখবে এবং এই বার্তা দেবে যে গণহত্যার সময়ে নীরবতা বা স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টা আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও পরিণতি ডেকে আনে।
© The Deltagram থেকে অনুবাদকৃত
