নারীবাদের নামে যে ভণ্ডামি আজ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো বেছে বেছে ন্যায়–অন্যায়ের পক্ষে কথা বলা। কোথাও নারীর অধিকার নিয়ে সরব হওয়া, আবার কোথাও একই সময়ে নারীর জীবন, দেহ ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস হলেও সম্পূর্ণ নীরব থাকা—এই দ্বৈত আচরণ আসলে নারীবাদ নয়, এটি সুবিধাবাদ।
তেমনি একজন সুবিধাবাদী বিতর্কিত ব্রিটিশ লেখিকা ও নারীবাদী জে কে রাউলিং আবারও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া তার সাম্প্রতিক একটি পোস্ট ঘিরে এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাযায় ইসরায়েলি আগ্রাসন ও হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর বিষয়ে দীর্ঘ নীরবতার পর ইরানের মানবাধিকার নিয়ে তার এই হঠাৎ ‘উদ্বেগ’কে নেটিজেনরা ভণ্ডামি ও দ্বিমুখী নীতির উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সম্প্রতি ইরানে অর্থনৈতিক সংকট, রিয়ালের দরপতন ও মূল্যস্ফীতিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভের পক্ষে একটি এআই–নির্মিত ছবি শেয়ার করেন রাউলিং। ছবিতে দেখা যায়, একজন নারী ইরানের এক নেতার ছবিতে আগুন ধরিয়ে সেই আগুন দিয়ে সিগারেট জ্বালাচ্ছেন। ছবির ক্যাপশনে রাউলিং লেখেন—
“আপনি যদি মানবাধিকার সমর্থনের দাবি করেন অথচ ইরানের স্বাধীনতার লড়াইয়ে সংহতি প্রকাশ করতে না পারেন, তবে আপনি নিজের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। আপনি নিপীড়িত মানুষের তোয়াক্কা করেন না, যতক্ষণ না সেই নিপীড়ন আপনার শত্রুর শত্রুরা করছে।”
তবে এই বক্তব্যকে ‘নৈতিক আলটিমেটাম ’ হিসেবে দেখছেন অনেকেই, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। নেটিজেনরা ইরানের সরকারের পক্ষ না নিলেও রাউলিংয়ের বেছে বেছে মানবাধিকার চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সমালোচকদের দাবি, গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে, হাজার হাজার শিশু নিহত হয়েছে—কিন্তু সেই সময় রাউলিং সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন।
একজন এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন:
“গাজায় যখন শিশুদের গণহারে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন আপনি মৃতবৎ নীরব ছিলেন। আর এখন হঠাৎ করেই ইরানে নিপীড়ন খুঁজে পাচ্ছেন? এটি চরম নির্লজ্জতা।”
অনেক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক রাউলিংয়ের অবস্থানকে ‘সিলেক্টিভ ফেমিনিজম’ বা সুবিধাবাদী নারীবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, নারীর অধিকার নিয়ে তার অবস্থান সার্বজনীন নয়; বরং ভূরাজনৈতিক ও আদর্শিক পছন্দ–অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে ইসরায়েল গাযার প্রায় অর্ধেক এলাকা দখলে রেখেছে। অবরুদ্ধ এই অঞ্চলের বাকি অংশে দুই মিলিয়নের বেশি ফিলিস্তিনি আটকে রয়েছেন। যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেঙে নিয়মিত বোমাবর্ষণ চলছে, প্রতিদিনই বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা।
তবে এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নিয়ে জে কে রাউলিং কখনো প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেননি, সংহতির আহ্বান জানাননি কিংবা নিজের নীরবতা নিয়েও কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
এ প্রসঙ্গে একজন সাংবাদিক লিখেছেন :
“ইরানের নারীরা যে সার্বজনীন মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত—তাদের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু আপনার এই নির্বাচিত নারীবাদ আসলে নারীবাদ নয়। এটি একটি কৌশলী ভান, যার আড়ালে গাজা ও ফিলিস্তিনের নারী ও কন্যাশিশুদের পরিত্যাগ করা হয়েছে, যখন সেখানে চলমান গণহত্যায় তাদের অধিকার দশকের পর দশক ধরে পদদলিত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, রঙিন চামড়ার নারীদের দুর্দশা তখনই গুরুত্ব পায়, যখন তা বইয়ের বিক্রি, প্রশংসা বা সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে সহায়ক হয়—যা মূলত সুবিধাভোগী শ্বেতাঙ্গ নারীবাদেরই একটি রূপ।
