Sunday, September 20, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরজন্ম নেওয়াই যেন এ দেশে আজন্ম পাপ!

জন্ম নেওয়াই যেন এ দেশে আজন্ম পাপ!

আমার ছোট মেয়েটাকে নতুন স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। স্কুলে ভর্তির জন্য তার জন্ম নিবন্ধন লাগবে। তাই মেয়ের জন্ম নিবন্ধন করতে গেলাম।

গিয়ে শুনলাম, নতুন নিয়ম হয়েছে—বাবা-মা দুজনেরই জন্ম নিবন্ধন থাকতে হবে।

আমার জন্ম নিবন্ধন করা আছে, কিন্তু আমার স্বামীর জন্ম নিবন্ধন করা নেই। ঠিক আছে, তাহলে স্বামীর জন্ম নিবন্ধন করাতে হবে।

আমি ঢাকায় যেখানে থাকি, সেখানকার কমিশনার অফিসে গেলাম। তারা বলল, “উনার জন্মস্থান এখানে নয়। উনার জন্মস্থান যেখানে, সেখানেই জন্ম নিবন্ধন করতে হবে।”

ঠিক আছে। ঢাকার অফিসের কথা মেনে স্বামীর জন্মস্থান যেখানে, সেই গ্রামে গেলাম।

সেখানে গিয়ে যোগাযোগ করলে তারা বলল, “উনি তো এখানকার ভোটার না। উনি ঢাকার ভোটার। উনি যেখানের ভোটার, সেখানেই জন্ম নিবন্ধন করতে হবে। উনি গ্রামে জন্ম নিবন্ধন করতে পারবেন না।”

আমি বললাম, “ভাই, ঢাকা থেকে তো আমাকে বলা হয়েছে উনার জন্মস্থান যেখানে, সেখানেই জন্ম নিবন্ধন করতে হবে। ঢাকায় করা যাবে না।”

তখন গ্রামের অফিস থেকে বলা হলো, “উনি এখানে জন্ম নিবন্ধন করতে পারবেন, তবে আগে ঢাকা থেকে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে গ্রামের ভোটার হতে হবে।”

ভাবলাম, আচ্ছা, সেটাও করি।

ভোটার এলাকা পরিবর্তন করতে গেলাম। এবার বলা হলো—শ্বশুর-শাশুড়ির এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন লাগবে।

বললাম, শ্বশুর-শাশুড়ির এনআইডি দিতে পারব। কিন্তু আমার শ্বশুর তো মারা গেছেন।

তখন বলা হলো, “বাবা মারা গেলে বাবার মৃত্যু সনদ লাগবে।”

ঠিক আছে, মৃত্যু সনদই করি।

কিন্তু সেখানেও শুরু হলো আরেক বিরামহীন ভোগান্তি!

আমার শ্বশুর মারা গেছেন প্রায় ১৬ বছর আগে, ২০১০ সালে। তখন মৃত্যু সনদের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবেই তখন সেটা করা হয়নি।

এখন ১৬ বছর আগের সেই মৃত্যু সনদ তুলতে গিয়েও শুরু হলো নতুন কাগজপত্র, নতুন নিয়ম, নতুন দৌড়াদৌড়ি।

এদিকে আমার মেয়ের স্কুলে ছুটির সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পরেই তার পরীক্ষা। সব মিলিয়ে উপায় না দেখে আমাকে ঢাকায় ফিরে আসতে হলো।

ঢাকায় ফিরে আবার আমাদের এলাকার কমিশনার অফিসে যোগাযোগ করলাম। বারবার অনুরোধ করে পুরো বিষয়টি খুলে বললাম।

আমি বললাম, “গ্রামে গেলে আমাকে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করতে বলছে। কিন্তু ভোটার চেঞ্জ করতে গিয়ে তো আমার জন্য আরও বড় ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।”

তখন কমিশনার অফিস থেকে আমাকে বলা হলো, “ভোটার চেঞ্জ করার তো কোনো প্রয়োজনই নেই। উনার জন্মস্থান এখানে। উনি ওখানেই জন্ম নিবন্ধন করবেন। একজন মানুষ বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় ভোটার হতে পারেন। তাই শুধু জন্ম নিবন্ধনের জন্য ভোটার এলাকা পরিবর্তন করার কোনো প্রয়োজন নেই।”

আমি বললাম, “ভাই, তাহলে এখন আমি কী করব? আমাকে একটু বলেন।”

তখন আমাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলা হলো—

“হ্যাঁ, আমি করে দিতে পারব। তবে একটু বড়সড় খরচ হবে।”

আমি বললাম, “কত টাকা লাগবে?”

তিনি যে পরিমাণ টাকা চাইলেন, সেটা আমার কাছে যথেষ্ট বড় অঙ্কের মনে হলো।

এদিকে আমার মেয়ের ভর্তি ফর্ম জমা দেওয়ার সময়ও আর বেশি নেই—মোটামুটি ১৫ দিনের মতো।

উপায়ান্তর না দেখে বললাম, “ঠিক আছে ভাই, আপনি করে দেন।”

তিনি আমার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিলেন। আমার জন্ম নিবন্ধনের কাগজও নিলেন। আমাদের মধ্যে কথা হলো—প্রথমে আমার স্বামীর জন্ম নিবন্ধন করে দেবেন, এরপর আমার জন্ম নিবন্ধনের কাগজ নিয়ে আমার মেয়ের জন্ম নিবন্ধনও করে দেবেন।

আমি টাকা দিয়ে এলাম। তিনি আমার স্বামীর জন্ম নিবন্ধনের কাজ শুরু করলেন।

এরপর তিনি আমার জন্ম নিবন্ধনের কাগজ চাইলেন। আমি দিলাম।

তিনি বললেন, “আপনার জন্ম নিবন্ধন তো অনেক আগে করা। এটা শুধু ইংরেজিতে আছে। এখন বাংলা-ইংরেজি দুটোই থাকতে হবে।”

আমি বললাম, “ঠিক আছে। ইন্টারনেট থেকেই তো নেওয়া যাবে।”

তিনি অনলাইন থেকে আমার জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে তথ্য বের করে আমাকে পাঠালেন—“দেখেন, ঠিক আছে কি না।”

সেখানেই শুরু হলো আরেক বিপত্তি!

আমার ইংরেজি নামের বানান একদম ঠিক আছে। কিন্তু বাংলা নামের বানান সম্পূর্ণ ভুল!

আমার নাম সাবরিনা জান্নাত আরা।

আর সেখানে বাংলায় লেখা হয়েছে—“শুর্বনা জান্নাত আরা।”

আমার বাবার নাম খন্দকার এনায়েত হোসেন।

আর সেখানে বাংলায় লেখা হয়েছে—“খন্দকার এনায়েম হোসেন।”

অর্থাৎ ইংরেজি নাম ঠিক, কিন্তু তার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে বাংলা নাম লেখা হয়েছে!

এখন আবার সেটা সংশোধন করতে হবে।

আমাকে বলা হলো, আমি যেখান থেকে জন্ম নিবন্ধন করেছিলাম, সেই কাউন্সিলর/কমিশনার অফিসে যেতে।

আমি গেলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম, সরকারি ফি নাকি মাত্র একশো থেকে দুইশো টাকার মতো।

সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে গেলাম।

বললাম, “আমার জন্ম নিবন্ধনে নামের বানান ভুল হয়েছে। এটা কীভাবে ঠিক করব?”

আমাকে বলা হলো, “অনলাইন থেকে আবেদন করে আসুন।”

ঠিক আছে। অনলাইনে আবেদন করলাম। আবেদন ফর্ম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আবার গেলাম।

এবার আমাকে বলা হলো—

“দুই হাজার টাকা লাগবে।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “দুই হাজার টাকা কেন? এটা তো একশো-দুইশো টাকা সরকারি ফি হওয়ার কথা!”

তারা বলল, ওই টাকায় কাজ হবে না। আর কম টাকায় করলে কতদিন লাগবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

আমার কাছে তখন দুই হাজার টাকা ছিল না। আবার ফিরে এলাম।

যে কম্পিউটারের দোকান থেকে আগের কাজগুলো করেছিলাম, সেখানে গিয়ে বললাম, “ভাই, আসলে কি এত টাকা লাগে?”

তারা বলল, “আপা, এত টাকা তো লাগে না। তবে আপনি আমাদের এক হাজার টাকা দিলে আমরা তিন দিনের মধ্যে কাজটা করে দেব।”

আমি বললাম, “আপনারা কাজটা করতে পারবেন?”

তারা বলল, “হ্যাঁ, আমরা করে দেব।”

আমি যেহেতু অফিসে দুই হাজার টাকা চাওয়ার কথা শুনে বিপাকে পড়েছিলাম, শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে তাদের এক হাজার টাকা দিলাম। তারা আমার নামের সংশোধনের কাজ করে দিল।

এখন একটু চিন্তা করে দেখুন—

আমি এই দেশের একজন নাগরিক। এই দেশেই আমার জন্ম। আমার জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। আমার জন্ম নিবন্ধনও আছে।

শুধু আমার ছোট মেয়ের একটা জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে আমাকে কতটা ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হলো!

ঢাকা থেকে গ্রাম।

গ্রাম থেকে ঢাকা।

জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে ভোটার পরিবর্তনের কথা।

ভোটার পরিবর্তন করতে গিয়ে মৃত শ্বশুরের ১৬ বছর আগের মৃত্যু সনদের কথা।

এক অফিসে এক কথা, অন্য অফিসে আরেক কথা।

তারপর অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনে নিজের নামের বানান ভুল!

ভুল তথ্য সংশোধন করতে গিয়ে সরকারি ফি আর বাস্তবে চাওয়া টাকার মধ্যে এত পার্থক্য!

সবচেয়ে বড় কথা—এই ভুলগুলো আসলে কীভাবে হয়?

একজন মানুষের ইংরেজি নাম যদি সঠিক থাকে, তাহলে সেই নামের বাংলা রূপান্তর করতে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বানান কীভাবে আসে?

একটি জন্ম নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিতে এত বড় ভুল কীভাবে মেনে নেওয়া হয়?

এগুলো কি নিছক ভুল?

নাকি কোথাও কোথাও ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল রেখে পরে সংশোধনের নামে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়?

আমি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করছি না। কিন্তু যদি সত্যিই কোথাও ইচ্ছাকৃতভাবে এমন করা হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তদন্ত হওয়া দরকার।

আর যদি সমস্যাটা অদক্ষতা হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো—এত গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবার জায়গায় অদক্ষ লোকজনকে কেন রাখা হবে?

মানুষের জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র—এগুলো কোনো সাধারণ কাগজ নয়। এখানে একটি অক্ষরের ভুলও একজন মানুষের ভবিষ্যতে কত বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে, সেটা আমরা সবাই জানি।

দেশের মানুষ এমনিতেই নানাভাবে অতিষ্ঠ।

গ্যাস নেই, বিদ্যুতের সমস্যা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য—সবকিছুর সঙ্গে যখন সরকারি সেবা নিতে গেলেও দিনের পর দিন হয়রানি, ভুল তথ্য, দৌড়াদৌড়ি আর অতিরিক্ত টাকা চাওয়ার অভিযোগ শুনতে হয়, তখন একজন সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

সরকারি সেবা কি নাগরিকের অধিকার, নাকি টাকা খরচ করে, পরিচয়-যোগাযোগ ব্যবহার করে এবং দিনের পর দিন ঘুরে তারপর পাওয়ার বিষয়?

জন্ম নিবন্ধন করতে যান—ভোগান্তি।

জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করতে যান—ভোগান্তি।

একটি সাধারণ সরকারি কাজ করতে যান—ভোগান্তি।

আর সবশেষে মনে হয়—

এই দেশে নাগরিক হওয়াটাই যেন একটা অপরাধ!

সত্যিই কখনো কখনো মনে হয়—

জন্ম নেওয়াই যেন এ দেশে আজন্ম পাপ!

Subrina Jannat Ara

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 × two =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য