Thursday, June 25, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরজাতীয়জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের বিশ্লেষণ

জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের বিশ্লেষণ

আমেরিকান ইলেকশন নিয়ে আমেরিকা তো বটেই, সারা বিশ্বেই কম বেশি বহু এনালাইসিস হয়, তথ্য ভিত্তিক, পরিসংখ্যান ভিত্তিক। অজস্র বিশ্লেষণ, প্রজেকশন এর এক বিরাট যজ্ঞ। বাংলাদেশে এমন আলোচনা খুব একটা হয়না। আমরা ইমোশনাল ন্যারেটিভে চালিত হই, কে কাকে কোন ভাষায় কার অনুভূতিতে আঘাত করলো সেগুলোই মুখ্য আলোচনা।

এবারের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি একটি ম্যাপ চোখে পড়লো (ছবি-৩, সূত্রঃ উইকিপিডিয়া)। ভাবলাম কিছু তথ্য ভিত্তিক বিশ্লেষণমূলক আলাপ তোলা যায় কিনা। ম্যাপে সুষ্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিম বাংলাদেশের (রংপুর, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ময়মনসিংহ ও বরিশালের কিছু অংশ) অনেকখানি এলাকায় জামাত জয় পেয়েছে (সবুজ অঞ্চল), বাকি এলাকাগুলোতে বিএনপি (নীল অঞ্চল) এই এলাকাগুলোর জনগণের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্য কি, বিএনপি জেতা এলাকাগুলোর তুলনায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগের সাম্প্রতিক আর্থ সামাজিক তথ্যের ভিত্তিতে এই গ্রাফগুলো তৈরি করা হয়েছে। চলুন প্রথমে স্পাইডার চার্টটি দিয়ে শুরু করি (ছবি-১)। এখানে দেখা যাচ্ছে বিএনপি জেতা জেলাগুলোর সাথে জামাত জেতা জেলা গুলোর সব চেয়ে বেশি পার্থক্য লিঙ্গ বৈষম্য, শহরাঞ্চল এর পরিমাণ, শিল্প কারখানা ভিত্তিক চাকরি এবং বাল্যবিবাহ এর হার ক্ষেত্রে। এই ছবিতে অন্যান্য গ্রাফে দেখা যাচ্ছে বিএনপি জেতা জেলাগুলোতে জামাত জেতা জেলাগুলোর তুলনায় দারিদ্র্যের হার কম, বহুমাত্রিক (মাল্টি ডাইমেনশনাল) দারিদ্র্যের হার কম, প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশে পাঠানো রেমিটেন্স এর হার বেশি, দক্ষ কর্মী প্রবাসীর হার বেশি, শহরাঞ্চলের হার বেশি।

ছবি-২ এর গ্রাফগুলোতে দেখা যাচ্ছে বিএনপি জেতা জেলাগুলোতে জামাত জেতা জেলাগুলোর তুলনায় শিক্ষার হার বেশি, কর্মজীবী নারী বেশি। এতগুলো সূচকের মাঝে সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় বাল্য বিবাহের হার এর ক্ষেত্রে। জামাতের জেলাগুলোতে বাল্য বিবাহের হার অনেক বেশি। যেমন রাজশাহীতে ৬৬.৭%, সাতক্ষীরা ও রংপুরে যথাক্রমে ৬২% এবং ৫৭.৯%, অন্যদিকে ঢাকায় এই হার ৪৮.৬%, চট্টগ্রামে ৪৪.১%, সিলেটে ৩১%। চাকরিক্ষেত্রে দেখা যায় জামাতের জেলাগুলোতে কৃষিপ্রধান পেশাজীবী বেশি অন্যদিকে বিএনপির জেলাগুলোতে সেবা ও শিল্প ভিত্তিক পেশাজীবী বেশি।

শিক্ষার ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে বিএনপির জেলাগুলোতে ইউনিভার্সিটি ও আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর সংখ্যা বেশি অন্যদিকে জামাত এর অঞ্চলগুলতে মাদ্রাসা এর সংখ্যা অনেক বেশি বিশেষ করে রাজশাহীতে। এই মাদ্রাসাগুলোর মাঝেও আহলে হাদিস পন্থী মাদ্রাসা সবচেয়ে বেশি রাজশাহীতেই। উভয় দিকের জেলাগুলোতে মেজরিটি মুসলিম জনসংখ্যা হলেও রাজশাহীতে কট্টরপন্থী আহলে হাদিস তরিকার মানুষ বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশে সুফি ঘরানার যেসকল ইসলাম প্রচারক পীর আউলিয়া এর মাধ্যমে ইসলাম প্রবেশ করেছিলো তাদের দ্বারা প্রভাবিত সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধর্মপ্রাণ মুসলিম অনেক থাকলেও তারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে বেশি, জামায়াতকে দিয়েছে কম। জামায়াত যে ধর্মের কার্ড খেলে সারা দেশে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল সেটি উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের দরিদ্র অল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বাইরে তেমন কাজে লাগে নি। উদারপন্থী ধর্মপ্রাণ শিক্ষিত মুসলিমেরা জান্নাতের টিকিটের লোভে পড়েছে কম।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে শহরাঞ্চল, অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্যবান, শিক্ষিত, উদারপন্থী ধর্মপ্রাণ, কম বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া কর্মজীবী নারী ও দক্ষ প্রবাসী কর্মীরা বিএনপি কে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে দরিদ্র, অল্প শিক্ষিত, কৃষি প্রধান পেশাজীবী, কট্টরপন্থী ধর্মপ্রাণ, বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া আর্থ সামাজিকভাবে দুর্বল নারী, অদক্ষ প্রবাসীরা জামাতে ভোট দিয়েছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে এই চিত্রটি মিলে যায়। রক্ষণশীল, অল্পশিক্ষিত মানুষেরা উগ্র ডানপন্থীদের ভোট দেন। এই চিত্র ভারত ও আমেরিকার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। বাম ঘরানার (কাগজে কলমে) সোসালিস্টিক লিবারেল দলগুলো এইসব দেশে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে (বৈধ বা অবৈধ উপায়ে) দুর্নীতির অষ্টবাহুতে এতটাই আস্টেপৃষ্টে জড়িয়েছে এবং মধ্য কিংবা ডানপন্থী মানুষদের নাগরিক অধিকার এমনভাবে দমন কিংবা চাপে রেখেছে যে বাম ঘরানার লিবারেল মানুষেরাও ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে রক্ষণশীলদের ক্ষমতায় এনেছে। এই ট্র্যাপ থেকে বের হতে পেরেছে কানাডা। সেখানে সর্বশেষ ইলেকশনে নিশ্চিতভাবে লিবারেলদের হার ও কনজারভেটিভদের জয় হবার কথা থাকলেও লিবারেলরাই জিতেছে ট্রাম্প এর আগ্রাসন এর কারনে। জয়ী লিবারেলদের প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগের জনের মত ভুল করেন নি, তিনি কনজারভেটিভদের সেন্টিমেন্টকে আমলে নিয়েছেন যতটুকু যৌক্তিকভাবে নেয়া সম্ভব, তিনি রক্ষণশীল প্রধান অঞ্চলে উন্নয়ন শিক্ষা যোগাযোগ ব্যবসা বৃদ্ধির দিকে নজর দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ও উগ্র ডানপন্থার হাত থেকে এবারের মত বেচে গেছে। আগামীতে সেটা বজায় থাকবে কিনা তা নির্ভর করবে বিএনপির উপর। তারা কি আগের সব আমলের মত এইসকল অঞ্চলকে অন্ধকারেই রাখবে? তারা কি এসব যায়গায় আর্থ সামাজিক উন্নয়নের আলাদা পলিসি গ্রহণ করবে? মাদ্রাসা শিক্ষার (বিশেষ করে কওমি ও আহলে হাদিস ঘরানার) আধুনিকায়ন করে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক পেশা গ্রহণ ও স্বচ্ছল জীবনযাপনের পথে অংশ গ্রহণের সুযোগ বাড়াবে? এইসব জেলায় কি হবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল? বাড়বে কি নারী শিক্ষা, কমবে কি বাল্য বিবাহ? নাকি আমরা চিরকালই শুনতে থাকবো যে রংপুর মঙ্গার এলাকা সেখানে লেবার ভালো পাওয়া যায়?

গ্রাফগুলো তৈরিতে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছেঃ বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিসটিক্স এর তথ্য, বিবিএস ও ইউনিসেফের এমআইশিএস সার্ভে, বিবিএস এর হাউজহোল্ড ইনকাম এন্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে, বিশ্বব্যাঙ্ক ডাটা, সানেম ভোটার সার্ভে, বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিটেন্স ডাটা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য। গ্রাফগুলো তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে এন্থ্রপিক এর Sonet 4.5 extended LLM মডেল এবং গুগলের নোটবুক এলএম। তথ্যসূত্র সহ তুলামূলক পার্থক্যের আরও বিস্তারিত তথ্য কমেন্ট বক্সে।

*তথ্য সন্নিবেশ, উপস্থাপনা, বিশ্লেষণ ও মতামত নিজস্ব। এর সাথে আমার প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোন পেশাগত গোষ্ঠীর সম্পর্ক নেই*

*তথ্যে কোথাও কোন ভুল থাকলে সূত্র উল্লেখ পুর্বক মন্তব্য করতে পারেন।*

ডা. মোঃ মারুফুর রহমান

এমবিবিএস, এমপিএইচ, এমএসসি, পিএইচডি

জ্যেষ্ঠ দক্ষতা পরিমাপ কর্মকর্তা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সাস্কাচুয়ান, কানাডা

© Marufur Rahman Opu

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

nineteen − 2 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য