গত ৩০ জুলাই ৩ দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দক্ষিন এশিয়া ও মধ্য এশিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ দূত সার্জিও গোর। ১লা অগাস্ট তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। তার এই সফর উপলক্ষে সফরের অন্তত ৭ দিন আগে থেকেই বাংলাদেশ এবং ভারতের একশ্রেনীর গনমাধ্যমে তুমুল জল্পনা কল্পনা সৃষ্টি করা হয়। লক্ষনীয় বিষয় হলো এই যে মার্কিন বিশেষ দূতের এই সফরটি রাষ্ট্রীয় হলেও বাংলাদেশ সরকার এই সফর নিয়ে ফলাও করে কোনো সংবাদ পূর্বাহ্নে প্রকাশ করেনি। অনুরূপভাবে সফরকালে এবং সফর শেষেও সরকার এবং মার্কিন দূতাবাস গতানুগতিক প্রেস রিলিজ ছাড়া আর কোনো কিছু প্রকাশ করেনি।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশের এক শ্রেনীর সংবাদপত্র এই সফর নিয়ে একটি হাইপ তোলে। অন্যদিকে দিল্লী ও কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মাধ্যম ও নিউজ পোর্টাল গুলো এই সফরের ওপর রাজনৈতিক রং আরোপ করে। বিশেষ করে একশ্রেনীর ভারতীয় গনমাধ্যমে বলা হয় যে, সার্জিও গোর বাংলাদেশে আসছেন কথা বলতে, শুনতে নয়। ঐসব ভারতীয় গনমাধ্যমের মতে, মার্কিন দূত বাংলাদেশে ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভূক্তিমূলক রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ দেবেন। একশ্রেনীর ভারতীয় ও বাংলাদেশী গনমাধ্যমে আরো বলা হয় যে, বাংলাদেশ যেনো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং উত্থাপিত বাংলাদেশ মিয়ানমার চীন ইকোনোমিক করিডোর এবং তিস্তা মহা পরিকল্পনায় চীনকে জড়িত না করে সেজন্য এই বিশেষ মার্কিন দূত বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন। এসব গনমাধ্যমে আরো বলা হয় যে, সার্জিও গোর তার এই সফরকালে বাংলাদেশের পেশাজীবি এবং সুশীল সমাজের সাথেও বৈঠক করবেন।
যথারীতি মার্কিন বিশেষ দূত ৩০ জুলাই দুপুরের পূর্বে ঢাকা পৌঁছেন। ঢাকা পৌঁছানোর পর তিনি যথারীতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেন। এছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথেও সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু পেশাজীবি ও সুশীল সমাজের সাথে তার বৈঠকের কোনো খবর বাংলাদেশের কোনো গনমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যে, মার্কিন এই কূটনীতিক হোটেল ওয়েস্টিনে উঠেছিলেন। তিনি তাঁর অধিকাংশ সময় হোটেল ওয়েস্টিনেই কাটান। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর যে প্রেস ব্রিফিং হয় সেই ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাফ জানিয়ে দেন যে, বাংলা চীন ইকোনোমিক করিডোর বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বলেন যে, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা এসেছে। এমন একটি স্থিতিশীল পরিবেশে মার্কিনী বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকা অবস্থানকালেই একশ্রেনীর বাংলাদেশী ও ভারতীয় গনমাধ্যমে নানান ধরনের খবর প্রকাশিত হয়। গভীর অনুসন্ধান করে এসব খবরের আংশিক সত্যতা পাওয়া গেছে। আবার ঐ সব খবরের অপর অংশ ভিত্তিহীন প্রমানিত হয়েছে।
গভীর অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, সার্জিও গোর এই সফরকালে অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক রাষ্ট্রচার লংঘন করেছেন। শুক্রবার ৩১ জুলাই তার সন্মানে পররাষ্ট্র দফতর এক নৈশ ভোজের আয়োজন করেছিলো। কিন্তু কোনো যুক্তিসঙ্গত কারন না দেখিয়ে তিনি ঐ নৈশভোজ বাতিল করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সূত্রে জানা গেছে যে, দুপুরের পর তার তরফ থেকে মার্কিন দূতবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়কে জানায় যে, অনিবার্য কারণ বশত মার্কিন দূত ঐ নৈশভোজে হাজির হতে পারবেন না। অনিবার্য কারনটি বিস্তারিত ভাবে বলা হয়নি। খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে যে, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের সাথে যে বৈঠকের কথা ছিলো সেই বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়নি। এজন্য মার্কিন পক্ষ থেকে কোনো কারণও দর্শানো হয়নি।
.
সার্জিও গোর এই সফর কালে কিছু অকূটনীতিক সুলভ কাজ করেছেন। তিনি ৩১ জুলাই শুক্রবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাথে এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক করেন। অথচ এই বৈঠক তাঁর সফর সূচির অন্তর্ভূক্ত ছিলো না। বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশের মাটিতে অপর একটি দেশের রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠক খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই যে, ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে মার্কিন দূতের এই বৈঠকের ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো রাজনীতিবিদ বা গনমাধ্যমকে কোনো কথা বলতে শোনা যায়নি। তবে এক্ষেত্রে এক মাত্র ব্যতিক্রম হলেন আমীরে জামায়াত ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “তাঁরা তো (সার্জিও গোর ও দীনেশ ত্রিবেদী) ইন্ডিয়ায় বসেই কথা বলতে পারেন। এখানে এসে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলা যদি সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি দুই দেশের কোনো বিষয় হয়ে থাকে, সেটা সরকারের সঙ্গেই হওয়া উচিত… পার্টিকুলার কোনো দেশের কোনো কূটনীতিবিদের সঙ্গে এটা আমাদের কাম্য না।”
তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশে অবস্থান করে কোনো বিদেশি বিশেষ দূত ও অন্য একটি দেশের কূটনীতিকের মধ্যে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত আলোচনা হলে তা স্বচ্ছ ও উপযুক্ত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে হওয়াই উচিত।
রাজনৈতি পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন যে, তাদের এই বৈঠকে নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা হয়েছে। কারন এই বৈঠকের পর ১লা অগাস্ট জরুরি পরামর্শের জন্য ভারতীয় হাই কমিশনার বিমান যোগে দিল্লী গমন করেন। পরদিন অর্থাৎ ২ অগাস্ট তার দিল্লী থেকে ঢাকা ফেরার কথা। কিন্তু তার ঢাকা ফেরা সম্পর্কে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন বা অন্য কোনো সূত্রে কিছু বলা হয়নি।
ঢাকায় অবস্থানকালে সার্জিও গোরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক করার কথা ছিলো। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তিনি যেটা করেছেন সেটি হলো আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর সাথে ৩১ জুলাই বৈঠক। স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি যদি এই বৈঠক করতেন তাহলে কেউ কোনো কথা বলতেন না। কিন্তু তার বা মার্কিন দূতাবাসের বিলক্ষন জানার কথা যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সরকারীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দলটি বিগত নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে পারেনি। যতক্ষণ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে ততদিন আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ গ্রহন করতে পারবে না। যে দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ তেমন একটি দলের একজন সিনিয়র নেতার সাথে সার্জিও গোর কিভাবে বৈঠক করলেন সেটি একটি প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
এখানে আরো একটি বিষয় রাজনৈতিক মহল উল্লেখ করছেন। তারা বলছেন যে, তাঁর যেখানে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক করার কথা ছিলো সেখানে তিনি রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপি বা এনসিপির সাথে কোনো বৈঠক করলেন না। করলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতার সাথে।
‘দি ওয়াল’ সহ ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী এবং অমল সরকার ইউটিউব ভিডিওতে একাধিকবার বলেছেন যে, ঢাকা আসার বেশ কয়েক দিন আগে সার্জিও গোর দিল্লীতে শেখ হাসিনা সহ অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতার সাথে বৈঠক করেছেন। তারা এও জানিয়েছেন যে, দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের হাই কমিশনার নিযুক্ত হওয়ার পর ভারতেও সার্জিও গোর তার সাথে বৈঠক করেন।
সার্জিও গোরের ঢাকা সফর রহস্যের আবরনে ঢাকা পড়েছে। শুধু ঢাকা ও দিল্লি নয়, আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমেও খবর বেরিয়েছে যে, সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের উদ্দেশ্য ছিলো দ্বিবিধ। প্রথমত বাংলাদেশ মিয়ানমার চীন করিডোর প্রস্তাবটি যেনো আর এগুতে না পারে সে জন্য মার্কিন চাপ সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করা। এই উদ্দেশ্যে প্রথমে এটি নিশ্চিত করা যে, সরকার যেনো দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার মামলায় না যায়। একই সাথে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা ।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় যে, সার্জিও গোর এই উভয় প্রস্তাব পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু এ সম্পর্কিত কোনো আলোচনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে আলোচনায় সারজিও গোর এমন কোনো আভাস পাননি যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলা চীন করিডোর থেকে সরে আসবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য মহল জানিয়েছেন যে, করিডোর এবং আওয়ামী লীগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর অনঢ় মনোভাব বুঝতে পেরে পরবর্তী ভারতীয় কার্যক্রম কি হবে, সে সম্পর্কে জরুরি আলোচনার জন্য দীনেশ ত্রিবেদী পরদিনই বিমান যোগে দিল্লী যাত্রা করেন। ঐ সূত্র আরো জানিয়েছেন যে, সার্জিও গোর বাংলাদেশকে ভারতীয় চোখে দেখার সেই পুরাতন মার্কিন নীতির পুনঃ প্রতিষ্ঠা চান। তবে নিউইয়র্কের ২জন পলিটিক্যাল এক্টিভিস্ট এই প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগত ভাবে ভারতের লেন্স দিয়ে বাংলাদেশকে দেখার পক্ষপাতি নন। নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনের ভারতীয় লবির প্রভাবে সার্জিও গোর এই পথে হাঁটছেন।
তার আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ট এই পথে হেঁটেছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটি অনুমোদন করেননি। ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ প্রশাসন এখনো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আস্থাশীল বলে বাংলাদেশ কমিউনিটি জানিয়েছেন।
