আমানুর রহমান রনি , ঢাকা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের নানা অঙ্গীকার এবং তৎপরতার পরও রাজধানীতে অপরাধের মাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান প্রভাব নেই ; বিশেষ করে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য চরমে উঠেছে । চাঁদাবাজেরা এমনই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে আতঙ্ক ছড়াতে গুলি করে তার ভিডিও ধারণ করার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে । পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন , পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকায় এলাকায় প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠায় চাঁদাবাজির মতো অপরাধ বেড়েছে । সমস্যার সমাধানে ‘ রাজনৈতিক সহায়তা ‘ দরকার বলে মত দিয়েছেন তাঁরা । চাঁদাবাজদের গুলি করে ভিডিও ধারণের ঘটনাটি ঘটেছে গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টাউন হল এলাকায় । চাঁদা চেয়ে না পেয়ে মনির আহমেদ নামের এক আবাসন ব্যবসায়ীর অফিসে ঢুকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা । একজন গুলি করার সময় তার ভিডিও করছিল সঙ্গের একজন ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি » দেড় মাসে ১১৩ চাঁদাবাজির মামলা । » পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ । » মতিঝিল , তেজগাঁও , গুলশানে সবচেয়ে বেশি । » দমনে ‘ রাজনৈতিক সহায়তা ‘ দরকার : পুলিশ তৃতীয় আরেকজন মোটরসাইকেলে বসে অপেক্ষা করছিল । এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে । পুলিশ বলেছে , জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে । তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে । অপহরণের হুমকি দিয়ে আগেই চাঁদা চাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে । স্কুলশিক্ষকের মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও এর শিকার হয়েছেন । ১৭ মার্চ রাজধানীর গুলশানের একটি স্কুলের শিক্ষিকাকে ফোন করে চাঁদা চাওয়া হয় । অন্যথায় তাঁর সন্তানকে অপহরণের হুমকি দেন ফোন করা ব্যক্তি । ভুক্তভোগী নারী জানান , ফোনে তাঁকে বলা হয়
থানা , পুলিশ , র্যাব করে কোনো কাজ হবে না । তাঁর ছেলে বা মেয়েকে তুলে নেওয়া হবে । তা এড়াতে চাইলে এখনই বলতে হবে কত দেওয়া হবে । টাকা না দিলে ছেলের লাশ পাওয়া যাবে । ছেলেপেলে বাসায় গিয়ে পাঁচটি করে গুলি করবে । সন্ত্রাসীর নির্মম ভাষার হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে ওই শিক্ষিকা একপর্যায়ে ফোন রেখে দেন । তবে আবারও ফোন করে হুমকি দেওয়া হতে থাকে । দা ি করা হয় একটি মোটা অঙ্কের চাঁদা । ওই নারী এখনো তাঁর সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন । পুলিশের অনুসন্ধানে দেখা গেছে , যে
ফোন নম্বর থেকে ওই নারীকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল , তা গোপালগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের এক নারীর নামে নিবন্ধিত । তবে চাঁদা দাবি করা সন্ত্রাসী ফোন করেছিল মাদারীপুরে বসে । এখনো তাঁকে ধরতে পারেনি পুলিশ । এভাবেই রাজধানীতে নানা কায়দায় চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে । কখনো ফোনে , কখনো সামনাসামনি ব্যবসায়ী , শিল্পপতি , বাড়ির মালিক , উচ্চ বেতনের চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে চাঁদা দাবি করা হয় । চাঁদা না দিলেই দেওয়া হয় অপহরণ বা হত্যার হুমকি । কখনো কখনো সত্যি সত্যিই হত্যার ঘটনাও ঘটছে । ডিএমপির সদর দপ্তরের অপরাধ বিশ্লেষণ বিভাগের ( ক্রাইম অ্যানালাইসিস ডিভিশন ) তথ্য বলছে , হুমকি দিয়ে পুরোনো কায়দায়ই চাঁদাবাজি চলছে । তবে হুমকির ধরনে পরিবর্তন এসেছে । কাকে কী বলে হুমকি দিলে কাজ হবে , দৃশ্যত সেটা নিয়ে ভেবেচিন্তে কাজ করছে সন্ত্রাসীরা । আর ঢাকা মহানগর পুলিশের ( ডিএমপি ) তথ্য অনুযায়ী , সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে নির্মাণাধীন ভবন
ঢাকায় চাঁদাবাজি চরমে
ও বাণিজ্যিক আবাসন প্রকল্পগুলোতে । শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও চাঁদাবাজির বড় শিকার । ডিএমপির হিসাব বলছে , গত ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ৪৭ দিনে ঢাকা মহানগর পুলিশের ৮ টি ক্রাইম বিভাগের ৫০ টি থানায় ১১৩ টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে । এগুলোর মধ্যে রমনা বিভাগে ১১ টি , লালবাগে ১১ টি , মতিঝিলে ২২ টি , তেজগাঁওয়ে ২০ টি , মিরপুরে ১৭ টি , গুলশানে ১৭ টি , উত্তরা ৬ টি এবং ওয়ারীতে ৮ টি । একই সময়ে এসব মামলায় ১২৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ । এ ছাড়া র্যাব গ্রেপ্তার করেছে ২০ জনকে । সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে মতিঝিল , তেজগাঁও এবং গুলশানে । রাজধানীর উল্লিখিত তিন এলাকায় চাঁদাবাজি বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ডিএমপির সদর দপ্তরের অপরাধ বিশ্লেষণ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন , এসব এলাকায় ব্যাংক – বিমা , শিল্পকারখানাসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিত্তবান মানুষের বসবাস — দুটোই বেশি । অপরাধীরা এ জন্যই এসব এলাকাকে টার্গেট করে বেশি । মোহাম্মদপুরের বছিলা এবং এর আশপাশের এলাকায় অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠছে । এসব স্থানে প্রায়ই চাঁদাবাজি
করার অভিযোগ আসছে । পুলিশ জানায় , গত ২১ মার্চ বিকেলে বছিলার সিটি হাউজিংয়ে স্টকলট ব্যবসায়ী নাজিম খান অন্তরের কাছে গিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ফারুক হোসেন নামের এক সন্ত্রাসী । তাঁর সঙ্গে ওই এলাকার বড় সোহান , পিন্টুসহ সাত – আটজন ছিল । ভুক্তভোগী নাজিম খান সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীকে খবর দিলে সেনাসদস্যরা গিয়ে ফারুককে গ্রেপ্তার করেন । চাঁদাবাজির ঘটনা বর্ণনা করে নাজিম খান বলেন , চাঁদা চেয়ে না পেয়ে সন্ত্রাসীরা তাঁকে পথে আটকে মারধর করে । বিষয়টি সেনাবাহিনীকে জানালে সেনাসদস্যরা ফারুককে করেন । পুলিশ জানিয়েছে , ফারুকের বিরুদ্ধে থানায় আরও দুটি চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে ।
গ্রেপ্তার
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের রূপনগরের দুয়ারীপাড়ার একটি নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে শ্রমিকদের মারধর করে সন্ত্রাসীরা । চাঁদা না পেয়ে রাজমিস্ত্রি নিজাম উদ্দিনকে মারধর করে তারা । এই ঘটনায় রূপনগর থানায় স্থানীয় শফিকসহ ১০ ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা হয়েছে । অভিযুক্ত শফিক রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ৬ নম্বর আঞ্চলিক ওয়ার্ডের সেক্রেটারি । শফিকের বক্তব্যের জন্য কয়েকবার ফোন করা হলেও তাঁর নম্বর বন্ধ পাওয়া
যায় ।
ডিএমপির সূত্রই বলেছে , কাজ এগিয়ে নেওয়া নির্বিঘ্ন নেওয়া নির্বিঘ্ন রাখতে নির্মাণাধীন ভবনের চাঁদাবাজির ঘটনায় ভুক্তভোগীরা সাধারণত থানায় অভিযোগ করেন না । অপরাধীদের সঙ্গে আপস করার চেষ্টা করেন । অল্পসংখ্যক লোক সাহস নিয়ে মামলা করেন । সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চাঁদাবাজদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একই ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনার পর ঢাকার ব্যবসাক্ষেত্রে আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে । নির্মাণ খাতের অনেক ঠিকাদার হুমকির মুখে কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন । অন্যান্য খাতের ব্যবসায়ীদের অপহরণ বা হামলার শিকার হতে হচ্ছে । পুলিশ কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগীরা বলছেন , গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুসংখ্যক শীর্ষ অপরাধীর মুক্তিও চাঁদাবাজির মাত্রা বাড়িয়ে তোলার জন্য দায়ী । ডিএমপির একটি সূত্র জানিয়েছে ক্ষমতার হাতবদলের পর চাঁদাবাজদের মুখ পরিবর্তন হয়েছে মাত্র , চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি । গত জানুয়ারিতে এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজদের একটি তালিকা করে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী । তবে তাতে আশানুরূপ ফল আসেনি । চাঁদাবাজেরা রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে । গত
এক সপ্তাহে চাঁদাবাজির অভিযোগে একাধিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা – কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে । এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের গঠিত নতুন রাজনৈতিক দলের নেতাও রয়েছেন । ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন , ক্ষমতার পালাবদলের পরের অনিশ্চয়তা এবং অস্থিরতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যের জন্য দায়ী । পুলিশ চিহ্নিত অপরাধীদের যথেষ্ট সংখ্যায় গ্রেপ্তার করছে না । অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বের হয়ে লাপাত্তা রয়েছে । তাদের নামেও চাঁদা দাবি করা হচ্ছে । তবে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ । ডিএমপি দাবি করেছে , পুলিশ ও র্যাব চাঁদাবাজি মোকাবিলায় জোরদার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে । ডিএমপির জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মো . তালেবুর রহমান বলেন , ‘ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি । ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম বৃদ্ধিসহ টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে । ‘ পুলিশের একটি সূত্র দাবি করেছে , চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিক সহায়তা ছাড়া এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম রোধ করা কঠিন ।
