Tuesday, April 28, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরনগদ সহায়তা হারানোর শঙ্কায় পোশাক খাত

নগদ সহায়তা হারানোর শঙ্কায় পোশাক খাত

রফতানি খাতে নগদ সহায়তা তুলে দেয়ার আকস্মিক সিদ্ধান্তে রফতানি-প্রধান খাত পোশাক শিল্প সঙ্কটে পড়বে বলে মনে করছেন মালিকরা। তারা বলছেন, তাদের সাথে আলোচনা না করে এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে কোনো মহলের হাত থাকতে পারে।


বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের ক্লাবে গেলে তখন আর নগদ সহায়তা রাখার সুযোগ থাকবে না। তারই অংশ হিসেবে নগদ সহায়তা ধাপে ধাপে তুলে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রফতানি আয়ের শতকরা ৮৪ ভাগ আসে পোশাক খাত থেকে। পোশাক শিল্পের মালিকরা বলছেন, তাদের সাথে আলোচনা করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এটা করা যেত। কারণ, এই সময়ে ডলার সঙ্কটসহ নানা কারণে পোশাক খাত চাপে আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কথা প্রজ্ঞাপনে বললেও বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেন, ‘নগদ সহায়তা ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু হঠাৎ করে একেবারে শূন্য করে দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো চিঠি দেয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক জানান, ‘এটা বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সেভাবেই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পোশাক খাতের পাঁচটি এইচএস কোডের পোশাক রফতানিতে আর নগদ সহায়তা পাওয়া যাবে না। পণ্যগুলো হচ্ছে নিট কাপড়ের টি-শার্ট, শার্ট, ট্রাউজার, ওভেন কাপড়ের জ্যাকেট, ব্লেজার ইত্যাদি। আর রফতানিমুখী দেশীয় বস্ত্র খাতে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তা চার শতাংশ থেকে কমিয়ে তিন শতাংশ করা হয়েছে। ইউরো অঞ্চলে বস্ত্র খাতের রফতানিকারকদের অতিরিক্ত বিশেষ সহায়তা দুই শতাংশ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে এক শতাংশ। পোশাক খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার রফতানি প্রণোদনা চার শতাংশ বহাল রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে নতুন পণ্য বা নতুন বাজারে চার শতাংশ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে তিন শতাংশ। নতুন বাজার থেকে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে বাদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া তৈরি পোশাক রফতানিতে বিশেষ নগদ সহায়তা এক শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ করা হয়েছে। জানুয়ারি মাস থেকেই এটা কার্যকরের কথা বলা হয়েছে।

পোশাক শিল্প মালিকরা যা বলছেন
যে পাঁচ ধরনের নিট ও ওভেন পণ্য থেকে নগদ সহায়তা পুরোপুরি তুলে দেয়া হয়েছে ওই ধরনের পণ্যই রফতানির শীর্ষে আছে। তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘এমনিতেই যুদ্ধের কারণে পোশাকের অর্ডার কম। আর পাঁচ-ছয় মাস আগে আমরা অর্ডার নিয়েছি। নগদ সহায়তার ওপর ভিত্তি করেই আমরা দাম নির্ধারণ করেছি। এখন সেই দাম তো আর অ্যাডজাষ্ট করা যাবে না। আমরা ক্ষতির মুখে পড়ব। আর এই সেক্টরে নতুন যারা আসতে চান তারা নিরুৎসাহিত হবেন।’

তার কথায়, ‘পাঁচটি আইটেমে নগদ সহায়তা পুরোপুরি তুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওই পণ্যগুলো আমাদের মূল আইটেম এবং সবচেয়ে বেশি রফতানি হয়। আর আমরা যে নতুন মার্কেট তৈরি করেছি, সেখানে আবার ধস নামবে। আমরা সঙ্কটের সময় জাপান, ভারত ও অস্ট্রোলিয়ায় পোশাকের নতুন বাজার তৈরি করেছি। এই বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে।’

তার কথা, ‘গ্যাস নেই, ডলারের দাম বেশি ফলে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। উৎপাদনও কমে গেছে। নগদ সহায়তা উঠে গেলে উৎপাদন খরচ আরো বাড়বে। তখন প্রতিযোগিতায় টেকা অনেক কঠিন হবে।’

২০২৬ সালে নগদ সহায়তা তুলে দেয়ার বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালে এখনো তিন বছর বাকি আছে। সেটা আমাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে ধাপে ধাপে তোলা যেত। কিন্তু আমাদের সাথে কথা না বলে এভাবে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়ায় পোশাক খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।’

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়। এই রফতানি তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬.৬৭ শতাংশ বেশি। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ভাগে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। অর্থবছরে প্রথম ছয় মাসে দুই হাজার ৭৫৪ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ০. ৮৪ শতাংশ।’

বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি মো: হাতেম বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে নিট সেক্টর এবং ব্যাকওয়ার্ড ইন্ডাষ্ট্রির স্পিনিং মিলগুলো। আমরা যে পোশাক রফতানি করি, তার ৫৬ শতাংশ হলো নিট পোশাক। এই খাতে পুরোই নগদ সহায়তা তুলে দেয়া হয়েছে। এটাই আমাদের মূল উদ্বেগের বিষয়। অন্যান্য পোশাক থেকে বিভিন্ন হারে কমানো হয়েছে। আমাদের মনে হচ্ছে, কোনো একটি মহল সুকৌশলে নগদ সহায়তা কমানোর কথা বলে আসলে তুলে দিয়েছে।’

তার কথায়, ‘আমরা এই খাতের স্টেক হোল্ডার। আমাদের সাথে কথা না বলে এই সিদ্ধান্ত কিভাবে নেয়া হলো। আমাদের সাথে আলাপ করে কোন খাতে কিভাবে পর্যায়ক্রমে নগদ সহায়তা ২০২৬ সালের মধ্যে তুলে নেয়া হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। সেটা সহনীয় হতো। আমরাও প্রস্তুতি নিতে পারতাম। কিন্তু এখন আমরা সঙ্কটের মধ্যে পড়ে গেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে প্রণোদনার সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাওনা আছি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরাইল-হামাস সঙ্কট, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হাউছিদের হামলা- এসব কারণে বস্ত্রখাতে অর্ডার ৬০ ভাগ কমে গেছে। আর এখন নগদ সহায়তার ব্যাপারে এই সিদ্ধান্তের ফলে রফতানি আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। উৎপাদন কমে যাবে। আর ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের জন্য আগেই আমাদের প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। এখন যদি জানুয়ারি থেকে সেটা বাদ দেয়া হয়, তাহলে আমরা পোশাকের দাম কিভাবে নতুন করে ঠিক করব!’

তাদের সাথে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা বা প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এর ফলে পোশাককর্মীদের মজুরিসহ আরো অনেক সুবিধা অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। অনেকে চাকরি হারাতে পারেন। কারণ, প্রণোদনার অর্থ দিয়ে তাদের বেতন দেয়া হয়।’

বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, ‘পোশাক শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় এখন ওভারটাইম নেই। ফলে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নতুন মজুরি কাঠামো কিছু কারখানায় এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা চাই, সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক তা যেন শ্রমিকদের কল্যাণে হয়। শ্রমিকদের জন্য সরাসরি স্বল্পমূল্যে রেশন চালু এখন জরুরি।’

প্রণোদনা থাকবে না
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘প্রণোদনা তুলে দেয়া ভালো না খারাপ এই বিতর্কের এখন আর আমাদের সুযোগ নেই। আমাদের আইনি কাঠামোর দিক দিয়ে চিন্তা করতে হবে। এগুলো তুলে দিতে হবে। না দিলে ২০২৬ সালে আমাদের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতি অনুযায়ী শাস্তির মুখে পড়তে হবে। তাই এই কাজে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

তার কথায়, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে একবারে নয়, ধাপে ধাপে তুলে দেয়া হচ্ছে। আমার বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য এটা যত দিন বেশি রাখা যায়, সেটা করা উচিত। পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর নগদ সহায়তার ব্যাপারে একটি মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, যারা এখান থেকে টাকাটা নিয়ে নেয়। ফলে এটা পর্যায়ক্রমে তুলে নিলে পোশাক খাতে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।’

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘বাংলাদেশ যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাবে, এটা নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ের স্টেক হোল্ডারদের সাথে সরকার কথা বলেছে। কী করতে যাচ্ছে তার পরিকল্পনাও প্রকাশ হয়েছে। পোশাক শিল্পের মালিকরাও সেটা জানেন, তাদের প্রস্তুতিও আছে। কেউ যদি বলেন জানেন না সেটা ঠিক নয়।’

হঠাৎ শূন্য করে দেয়া নয়
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেন, ‘নগদ সহায়তা তো ধীরে ধীরে কমাতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে তুলে দিতে হবে। তবে এভাবে হঠাৎ করে শূন্য করে দেয়ার ব্যাপারে আমার জানা মতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো চিঠিও আমরা দেইনি। বৃহস্পতিবার আমাদের কী পরিকল্পনা তা পুরো জানাতে পারব।’

সব রফতানি খাতেই নগদ সহায়তা কমানোর কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে প্রথম দফায় সব মিলিয়ে নগদ সহায়তা গড়ে ১০ ভাগের মতো কমছে। এর মধ্যে আছে চামড়া, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, আসবাবপত্র, প্লাস্টিক পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি, মোটরসাইকেল, পেট বোতল ফ্লেক্স, জাহাজসহ ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের পণ্য।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘যেসব শিল্পকে এখনো প্রোটেকশন দেয়া দরকার, তাদের ক্ষেত্রে যে সময় আছে সেই সময়ের মধ্যে নগদ সহায়তা যত ধীরে সম্ভব কমিয়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা দরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতা করেই টিকতে হবে। আর নগদ সহায়তা উঠে গেলে যাদের দরকার, সরকার তাদের কিভাবে বিকল্প সহায়তা দিতে পারে, সেটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে।’
সূত্র : ডয়চে ভেলে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

twenty − eleven =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য