প্রায় প্রতিদিনই বাসে ওঠা লাগে। বাসে উঠলেই চোখে পড়ে মেয়েদের অভাবনীয় কষ্ট। বসার জায়গা পাচ্ছে না, ছেলেদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা লাগছে, ছেলেগুলো ইচ্ছে করে গা ঘেঁষে ঘেঁষে যাচ্ছে, হেল্পার গায়ে হাত দিচ্ছে, পাশে বসলে পারলে গায়ের উপর যেন উঠে বসে ছেলেরা। মাঝেমধ্যেই মনে হয়, কেন যে এসবে আসছে নারীরা? কী দরকার এতো অসম্মান, কষ্ট নিয়ে হলেও এসব করার। অথচ আমাদের ঘরের মায়েরা, বোনেরা ঘরে আছেন, যখন ইচ্ছে উঠে রাঁধছেন, নয় গল্প করছেন বাসার মানুষের সাথে, নিজের কলিজার টুকরা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন।
তাহলে কেন এসব কষ্ট স্বীকার করছে নারীরা?
মানুষ যেকোনো কষ্ট স্বীকার করে কোনোকিছুর বিনিময়ে। একজন বাবা সন্তানের জন্য এতো কষ্ট করে টাকা আনেন ঘরে, সন্তান যেন পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, জীবনে কষ্ট করতে না হয়। স্ত্রী ভোরে উঠে স্বামীর জন্য রাঁধে, যেন ঘুম থেকে উঠে তিনি ক্ষুধায় কষ্ট না পান। সাহাবারা বদরের ময়দানে জীবন দিয়েছেন ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য এবং হাশরে আল্লাহর সুনজর পাওয়ার জন্য। প্রত্যেকেই কিছু না কিছুর আশায় কষ্ট করে। কেবল কষ্ট করতে ইচ্ছে করছে বা কেউ বলেছে কষ্ট করতে এজন্য কেউ কষ্ট করে না। তাহলে ভার্সিটি বা অফিসগামী নারীরা কেন করছে?
অনেকভাবে এর জবাব দেওয়া যায়।
‘নিজের পায়ে দাঁড়াতে’, ‘স্বাবলম্বী হতে’, ‘কারো বোঝা না হতে’, ‘সম্মান পেতে’, ‘সুখী হতে’।
অর্থাৎ স্বাবলম্বিতা, মর্যাদা ও সুখ।
মজার বিষয় হলো, আমরা পরিষ্কারভাবে দেখছি, নারীর মর্যাদা, সুখ, স্বাবলম্বিতা কোনোভাবেই বাড়ছে না। জনাথান ও উলফারসের রিসার্চে দেখা যাচ্ছে, নারী ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির পর থেকে নারীর সুখ অনেক বেশি কমে গেছে। তাদের মধ্যে এন্টি-ডিপ্রেশন পিল খাওয়া, আত্মহত্যা, মাদকাসক্তির রেইট অনেক বেড়েছে। মর্যাদার কথা বলাই বাহুল্য। বাসের মত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, কর্মক্ষেত্র থেকে নিয়ে সমাজের পরতে পরতে সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্টের শিকার হয় নি, এমন নারী পাওয়াও যাবে না। মি টু আন্দোলন এর বড় একটা উদাহরণ। প্রায় প্রতিটি উন্নত দেশে মিনিটে মিনিটে ধর্ষণের যে সমীক্ষা তাও আধুনিক যুগেরই।
তাহলে স্রেফ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য নারী কেন এসব মেনে নিচ্ছে?
অনেক কারণই আছে। প্রধানতম একটা কারণ হলো, পরিবারের প্রতি ঘৃণা।
নারী যদি বাইরে কাজ করা, ক্ষমতায়িত হওয়া ছেড়ে দেয়, তাহলে তার সামনে একটাই অপশন- পরিবারে কাজ করা। কিন্তু নারীবাদ আঘাত করেছে এ পরিবারকেই। বিভিন্ন বোন যখন কো এডুকেশন ছেড়ে দেন, দ্বীন শিক্ষা ও পরিবারে মন দেন, তখন প্রায় সময়ই কিছু কথা শুনতে হয়, “জামাই টাকা নিয়ে খোঁটা দিলে বুঝবি”, “বাচ্চার ডাইপার চেইঞ্জ কর এখন বসে বসে”, “এতোদিন পড়াশোনা করেছিস কি কাজের বুয়ার মত রান্নাবান্না করার জন্য?”, “তুই ঘরে বসে থাকলে মানুষকে কী বলবো?”
কথাগুলো লক্ষ করুন। প্রতিটাতে পরিবারের প্রতি অশেষ ঘৃণা। স্বামী টাকা নিয়ে খোঁটা দিলে তা সহ্য করা যাবে না, কারণ স্বামী আসলে স্ত্রীকে দাস বানাতে চায়। কিন্তু বাবা-মা, বান্ধবী, কলিগ, বস- সবার খোঁটা সহ্য করা যাবে। সন্তানকে একজন মায়ের চেয়ে বেশি পৃথিবীর কারো ভালোবাসার কথা না। সন্তানকে লালন পালন করাকে কটাক্ষ করা হচ্ছে ‘ডাইপার চেইঞ্জ’ বলে। অফিসে বা ভার্সিটিতে কাজের প্রেসারে ভর্তা হয়ে গেলেও সমস্যা নেই, কিন্তু স্বামী সন্তানদের জন্য প্রবল ভালোবাসার সাথে রান্না করা হলো কাজের বুয়ার কাজ। পরিবার অসন্তুষ্ট থাক, সন্তান বুয়ার হাতে মানুষ হোক, স্বামী হতাশায় থাকুক, কিন্তু মানুষকে বলা জরুরি কোথায় কাজ করছে।
যৌন নিপীড়ন, ৮-১০ ঘন্টা কাজের প্রেসার, রোদে দৌড়াদৌড়ি, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের অসম্মান- এগুলো সবই স্বামীর দাসত্ব ও সন্তানের ডাইপার চেইঞ্জ করার চেয়ে ভালো। সব ধরণের অপমান, অপদস্ততা সহ্য করে হলেও করে যেতে হবে। কারণ পরিবারে কাজ করা হলো চূড়ান্ত অপমান। কোনোভাবেই সেখানে যাওয়া যাবে না।
অথচ পৃথিবীর ইতিহাসে সব যুগে, সব সংস্কৃতিতে, সব ধর্মে- নারীর মূল ও প্রাথমিক কাজ ছিলো পরিবারে। নারী সবসময় ঘরের কাজ করেছে, সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছে, স্বামী-সন্তান-পরিবারের ভালোবাসা ও সম্মানের অংশ হয়ে থেকেছে। কেউ কেয়ার করেনি যে তাদের ক্যারিয়ার কী ছিলো বা সার্টিফিকেটের বস্তা কটা ছিলো। সে সময় নারী ছিলো সবচেয়ে সুখী, সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে সম্মানিত। রিসার্চ বিশ্বাস না হলে নানী-দাদীদেরকে প্রশ্ন করে দেখুন। আর আজকে নারী সবচেয়ে বেশি অসুখী, অনিরাপদ, ধর্ষিত ও জনতার সম্পত্তি।
হিউগ হোয়ের একটা সিরিজ উপন্যাস আছে- Silo. সাইলো হলো একটা বিরাট ঘরের মত, যেখানে শত শত মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম থাকে। তারা কখনও বের হয় না। সেখান থেকে বাইরের দুনিয়ার আকাশ, রাস্তা- কিছুই দেখা যায় না। তাদেরকে বলা হয়েছে, সাইলোর বাইরে গেলেই মানুষ মরে যায়। তাদেরকে সিনেমার মাধ্যমে দেখানো হয় যে সাইলো বাদে আর যেকোনো কিছু খারাপ। সাইলোর বাইরে গেলেই মৃত্যু-ধ্বংস অপেক্ষা করছে। কিন্তু অনেক বছর পরে একজন এসব কিছু বিশ্বাস না করে বের হয়ে আসে। সাইলোর বাইরে এসে সে অবাক হয়ে যায়। পৃথিবী এতো সুন্দর! এতো বড়! কী ভুলভালই না এতোদিন, এতো প্রজন্ম ধরে বিশ্বাস করে এসেছে তারা সবাই।
বোনেরা! চিন্তার সাইলো থেকে বের হয়ে আসুন।
পরিবারের কাছে আসুন। এমন ভালোবাসা ও নিরাপত্তা এখানে আছে, যা কোনো কর্পোরেট দুনিয়া আপনাকে কোনোদিন দিতে পারবে না।
দেবে কীভাবে? তাদের কারণেই তো আপনি অনিরাপদ!
© Irfan Sadik
