নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের ‘হাসেম ফুড’ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ও নিহতদের প্রায় অর্ধেকেরই বয়স ১৮ বছরের কম। প্রশাসনের নিখোঁজ তালিকা এবং স্বজনদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় তালিকাভুক্ত ৪৮ জনের মধ্যে ২১ জনেরই বয়স শিশু বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শ্রম আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সের শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদের অনেকে করোনাকালে পরিবারের সংকট এবং স্কুল বন্ধ থাকায় ঠিকাদারদের মাধ্যমে হাসেম ফুডে কাজে যোগ দেয়। ৪৯টি দেহাবশেষ উদ্ধারের পর ধারণা kalerkanthoকরা হচ্ছে, নিখোঁজ তালিকার শিশুরাও পুড়ে মারা গেছে। শনাক্ত না হওয়া এসব সন্তানের খণ্ডিত দেহ পাওয়ার জন্যও হাহাকার করছেন স্বজনরা। তাঁরা বলছেন, দেহাবশেষ শনাক্ত হলে তাঁরা খণ্ডিত অংশগুলো কবরস্থ করবেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা বলছেন, শনাক্ত করতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগবে।
এদিকে ৫২ জনের প্রাণহানির ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় দায়ের করা মামলায় সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল হাসেমসহ আটজনের চার দিনের রিমান্ড শেষ হচ্ছে আজ বুধবার। গতকাল পর্যন্ত শিশু কর্মীদের নিয়োগ, তালাবদ্ধ করে রেখে প্রাণহানি, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের ব্যাপারে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ সূত্র।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের তাহের উদ্দিনের ছেলে নাঈম ইসলাম প্রায় দুই বছর হাসেম ফুডে কাজ করছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে। সন্তানের জন্য বারবার বিলাপ করছেন মা-বাবা। নাঈমের বড় বোন রোজিনা স্থানীয় একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। জানতে চাইলে সে কালের কণ্ঠকে বলে, ‘আমার ভাইয়ের বয় ১৬ বছর। আমরা গরিব মানুষ। স্কুলে একটু বেশি বয়সেই গেছি। সংসারে অভাব দেইখা আমার ভাইটা ওইকানে কাজে যায়। আর এখন লাশও পাই না…।’
কিশোরগঞ্জেরই চান মিয়া বলেন, তাঁর ছেলে নাজমুল হোসেন (১৭) স্থানীয় স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। করোনার সময় স্কুল বন্ধ, বাবার অভাব দেখে হাসেম ফুডে যায়।
মিঠাইনের শিশু সেলিনা আক্তারের মামা আব্দুর রহিম বলেন, রিকশা চালিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালায় সেলিনার বাবা সেলিম মিয়া। এ কারণে মাত্র ১৪ বছরেই কারখানায় কাজ করতে যায় সেলিনা।
ভোলার চরফ্যাশনের ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। অসুস্থ হয়ে অভাবে পড়ে গেছি। বাবার এই কষ্ট দেখে আমার ১২ বছরের ছেলে হাসনাইন কিছুদিন আগে মোতালেব নামে এক ঠিকাদারের মাধ্যমে হাসেম ফুডে কাজ নেয়। এখন হোলাই হারাইলাম।’ ফজলুর রহমান বিলাপ করে বলেন, ‘টুকরাগুলা ফালাইয়া রাইখেন না। দেন কবর দিমু। মনেরে সান্ত্বনা দিমু…।’
নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর আজমত আলীর মেয়ে তাকিয়া আক্তারকে (১৪) না পেয়ে তার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তার বড় বোন হাসিনা বেগম বলেন, চার মাস হইলো আমার বোনডা কাজে গেছে। সংসারের লইগা গিয়া ও নিজেই হারাইয়া গেল।’
নারায়ণগঞ্জের বেলাল হোসেনের দুই মেয়ে কাজ করত হাসেম ফুডে। বড় বোন খাদিজা আক্তার বেঁচে গেলেও খোঁজ নেই ছোট বোন মিতু আক্তারের (১৬)। খাদিজা বলেন, ‘আমার কাজ বিকেলের শিফটে। আমার বোইনডা নামতে পারলে হয়তো বাঁচত।’ তিনি জানান, পাঁচ হাজার ৯০০ টাকা বেতন ধরা হয়েছিল তাদের।
তালিকার নাম-ঠিকানা নিয়ে স্বজনদের কাছে যাচাই করে দেখা গেছে, ১৮ বছরের মধ্যে ছিল কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের ফারজানা, ফাতেমা আক্তার, সদরের শাহানা আক্তার, খাদেজা আক্তার, ভোলার চরফ্যাশনের শামীম, রাকিব হোসেন, নোয়াখালীর হাতিয়ার তারেক জিয়া, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের শান্তামনি, হিমা আক্তার, হবিগঞ্জের ইশরাত জাহান তুলি, শেফালী রানী সরকার, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের লাবনী আক্তার, গাজীপুরের জয়দেবপুরের রিপন মিয়া ও বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের নোমান। নিখোঁজ হিসেবে শনাক্ত করা ৪৮ জনের ৩১ জনই নারী। বাকি ১৭ জন পুরুষ। নিহতদের ১৮ জনের বাড়ি কিশোরগঞ্জে, পাঁচজনের বাড়ি ভোলায়, চারজনের নোয়াখালী, তিনজনের নেত্রকোনা, দুজনের নারায়ণগঞ্জে, তিনজনের হবিগঞ্জে, দুইজনের গাইবান্ধা এবং মোলভীবাজার, গাজীপুর, রাজশাহী, নরসিংদী, পাবনা, দিনাজপুর, জামালপুর, ঢাকা, নীলফামারী, বগুড়া ও বরিশালের একজন করে রয়েছে।
সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের প্রধান এস এস রুমানা আক্তার বলেন, ‘৪৮ জন ভিকটিমের বিপরীতে ৬৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নতুন করে কেউ স্বজনের খোঁজে এলে তাদেরও নমুনা আমরা নেব। পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া কমপক্ষে ২১ দিন সময় লাগবে। এ সময় মৃতদেহগুলো মর্গে রাখা হয়েছে।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মাকসুদ বলেন, ‘জায়গার সংকুলান না হওয়ায় এরই মধ্যে ১৫টি মরদেহ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়েছে। বাকি মরদেহ রাখা হচ্ছে ঢামেক হাসপাতাল মর্গে। মরদেহগুলো আপাতত মর্গে রাখা হলেও দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা না করা হলে পচে-গলে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ ঘটাবে।’
এদিকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে রেখে হাসেমসহ গ্রেপ্তার আটজনকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। আজ শেষ হচ্ছে এই রিমান্ড। তদন্ত কর্মকর্তা রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক হুমায়ূন কবীর বলেন, সবদিক বিবেচনা করে আমরা রিমান্ডে নেওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছি।’
