Monday, August 31, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াপরবর্তীদের তুলনায় সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব (১ম পর্ব) : ইমাম ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ)

পরবর্তীদের তুলনায় সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব (১ম পর্ব) : ইমাম ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ)

আল্লাহর ছিফাত অস্বীকারকারীদের প্রকারভেদ

আল্লাহর সত্তার ব্যাপারে মন্তব্যকারীরা দু’ভাগে বিভক্ত :

১). যে কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত আল্লাহর সত্তাগত একাধিক বিষয়কে অস্বীকার করে। কেননা সে মনে করে এতে করে আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়া আবশ্যক হয়ে যাবে। যেমন- মু‘তাযিলারা বলে থাকে, لو رؤي لكان جسما لأنه لايرى إلا في جهة ‘যদি আল্লাহকে দেখা সম্ভব হয়, তাহলে অবশ্যই তার শরীর আছে, কেননা শরীর ছাড়া তো আর দেখা সম্ভব নয়’। তারা আরো বলে, لو كان له كلام يسمع لكان جسما ‘তার কালাম যদি শ্রবণ যোগ্য হয়, তাহলে অবশ্যই তার শরীর আছে’।

আর যারা আল্লাহর আরশে সমুন্নত হওয়াকে অস্বীকার করে, তারাও তাদের সাথে একমত পোষণ করেছে, এজন্য তারা সাদৃশ্যকে অস্বীকার করে, আর এটা হল মু‘তাযিলা ও জাহমিয়্যাহদের রীতিনীতি।

সালাফগণ তাদের বিদ‘আতী ও ভ্রষ্ট হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরবর্তীদের এমন অনেকেই তাদের পদ্ধতিকে অনুসরণ করেছেন, যাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়।

২). যে আল্লাহর সত্তাকে নিজের বিবেক দ্বারা সাব্যস্ত করতে চায়, যে ব্যাপারে কোন আছার বর্ণিত হয়নি, তাই তাদের বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। যেমন মুক্বাতিল[১] ও তার অনুসারী নূহ ইবনু আবূ মারইয়ামের[২] পদ্ধতিও এ রকম ছিল, যাদেরকে অতীত ও বর্তমানের একদল মুহাদ্দিছও অনুসরণ করেছেন। তাছাড়া কারামিয়্যাদের[৩] পদ্ধতিও এ রকম। আবার শারীরিক ছিফাত সাব্যস্ত থাকার কারণে তাদের কেউ কেউ শাব্দিক বা অর্থগতভাবে সেটা সাব্যস্ত করে থাকে। আবার কেউ কেউ আল্লাহর জন্য এমন ছিফাতকে সাব্যস্ত করে, যা কুরআন ও সুন্নাহয় একেবারেই বর্ণিত হয়নি। যেমন আল্লাহর নাড়াচাড়া করা এবং অন্যান্য এমন ছিফাত যা তাঁর ব্যাপারে সাব্যস্ত হয়নি।

জাহামের বিরুদ্ধে মুক্বাতীলের দেয়া বিবেক প্রসূত দলীলকে সালাফগণ প্রত্যাখ্যান করে তাকে খুব কঠিনভাবে দোষারোপ করেছেন, এমনকি তাকে হত্যা করা জায়েয বলেও ফাৎওয়া দিয়েছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে ইমাম বুখারীর শায়েখ মাক্কী ইবনু ইবরাহীম[৪] এবং অন্যরাও আছেন।

এখানে সালাফগণ যে মতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন সেটিই সঠিক, তারা আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীছগুলোকে কোনরকম তাফসীর[৫], তাকয়ীফ[৬] এবং তামছীল[৭] ছাড়াই যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবেই সাব্যস্ত করেছেন। এর বিপরীত কোন বক্তব্য তাদের থেকে কোনভাবেই প্রমানিত হয়নি, বিশেষ করে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাপারে। তারা এগুলোর অর্থ নিয়ে খোঁজাখোজিও করেননি বা কোন ধরনের উদাহরণও পেশ করেননি।

যদিও ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) (১৬৪-২৪১ হি.) এর নিকটবর্তী সময়ের কিছু লোক মুক্বাতীলের অনুসরণ করে তার মত উল্টা পাল্টা কিছু মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করা যাবে না; বরং ইসলামের মহান ইমামদের অনুসরণ করতে হবে। যেমন- ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হি.), ইমাম মালেক (৯৩-১৭৯ হি.), আস-সাওরী (৯৭-১৬১ হি.), আওযাঈ (৮৮-১৫৭ হি.), ইমাম শাফেঈ (১৫০-২০৪ হি.), ইমাম আহমাদ (১৬৪-২৪১ হি.), ইসহাক্ব, আবু উবাইদ (রাহিমাহুমুল্লাহ) (১৫৭-২২৪ হি.) এবং তাদের মত যারা আছেন। তাদের কথায় দার্শনিক বক্তব্য তো দূরের কথা ধর্মতত্ত্ববিদদের বক্তব্য থেকেও কোন কিছু পাওয়া যায় না। যারা সব ধরনের দুর্নাম ও অপবাদ থেকে মুক্ত থেকেছেন তাদের বক্তব্যের মধ্যেও এমন কিছু প্রবেশ করেনি। আবূ যুর‘আহ আর-রাযী (রাহিমাহুল্লাহ) (২০০-২৬৪ হি.) বলেন, ‘যার নিকট ইলম আছে, আর সে তার ইলমকে সংরক্ষণ না করে তা প্রকাশের জন্য কোন মতবাদের দ্বারস্থ হয়, তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত নও’।

আরো কিছু নব-আবিষ্কৃত ইলম

আহলুর রায়ের ফক্বীহগণ যুক্তি নির্ভর যে সকল নিয়ম-নীতি আবিষ্কার করেছে এবং ফিক্বহের শাখা-প্রশাখাগত বিষয়াদীকে সেসব নিয়ম-নীতির দিকেই ধাবিত করেছে। এসব নির্ধারিত নিয়ম-নীতিগুলো সুন্নাহর বিরোধী হোক বা তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হোক উভয়াবস্থায় তা প্রত্যাখ্যাত হবে। যদিও সেগুলোর মূলকথা তাদের ব্যাখ্যানুযায়ী কুরআর ও সুন্নাহ থেকেই হয়। কিন্তু এসব ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অনেকেই তাদের বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতামতগুলো ইমামগণ দারুণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর এসব প্রত্যাখ্যাত ফক্বীহরা হচ্ছে ইরাক ও হেযাজ অঞ্চলের। সাথে সাথে ইমামগণ তাদের ব্যাপারে নিন্দাও করেছেন।

ইমামগণ ও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের বিদ্যানদের অবস্থা হল, তারা সর্বত্রই ছহীহ হাদীছের অনুসরণ করতেন, যখন তা ছাহাবী ও তাবেঈদের নিকট বা তাদের কোন এক দলের নিকট আমলযোগ্য হত। আর সালাফগণ যে বিষয়কে পরিত্যাগ করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন, সে বিষয়ে আমল করা জায়েয নেই। কেননা তারা এটা আমলযোগ্য নয় জেনেই পরিত্যাগ করেছেন।

ওমর বিন আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) (৬১-১০১ হি.) বলেন,خُذُوْا مِنَ الرَّأْىِ مَا يُوَافِقُ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ, فَإِنَّهُمْ كَانُوْا أَعْلَمَ مِنْكُمْ ‘রায় থেকে তোমরা ততটুকুই গ্রহণ করবে, যতটুকু তোমাদের পূর্ববর্তীদের সাথে মিলে যায়। কেননা অবশ্যই তারা তোমাদের থেকে অধিক জ্ঞানী ছিলেন’।

ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) (৯৩-১৭৯ হি.)-এর নিয়ম ছিল যে, কোন হাদীছ যদি মদীনাবাসীদের আমলের বিপরীত হত তাহলে তিনি মদীনাবাসীদের আমল গ্রহণ করতেন। তবে অধিকাংশ লোকেরা হাদীছই গ্রহণ করতেন।

হালাল-হারামের মাসআলা নিয়ে ঝগড়া করা উচিত নয়

সালাফগণ যে সকল বিষয়ে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তার মধ্যে ‘হালাল ও হারামের মাসআলার ক্ষেত্রে ঝগড়া-বিবাদ করা’ বিষয়টি অন্যতম।

তাছাড়া এটা ইমামগণের নিয়মও ছিল না। অর্থাৎ তারা হালাল-হারামের মাসআলা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করতেন না; বরং এসব ঝগড়া-বিবাদ তাদের পরে সৃষ্টি হয়েছে। যেমনটি শাফেঈ ও হানাফীদের মধ্যে মতানৈক্যপূর্ণ মাসআলার ক্ষেত্রে ইরাকের ফক্বীহরা সৃষ্টি করেছে। এমনকি তারা এ ব্যাপারে স্বতন্ত্র কিতাবও রচনা করেছে এবং ব্যাপক বিতর্ক করেছে। এ সবই আবিস্কৃত, যার কোন ভিত্তি নেই। আর এগুলোই পরবর্তীতে তাদের ইলমের মূল বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যার কারণে এগুলো তাদেরকে উপকারী ইলম অর্জন করা থেকে বিরত রেখেছে। অথচ সালাফগণ এ বিষয়গুলো সর্বদা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

সুনান গ্রন্থে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى إِلَّا أُوْتُوْا الْجَدَلَ ثُمَّ قَرَأَ ) مَا ضَرَبُوۡہُ لَکَ اِلَّا جَدَلًا بَلۡ ہُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُوۡنَ

‘কোন সম্প্রদায় হেদায়াতের রাস্তা পেয়ে আবার পথভ্রষ্ট হয়ে থাকলে, তা শুধু তাদের বিতর্কের কারণেই হয়েছে। তারপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন, ‘এরা শুধু বিতর্কের উদ্দেশ্যেই আপনাকে এ কথা বলে। বস্তুত এরাত এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়’ (সূরা আয-যুখরুফ : ৫৮)।[৮]

কোন কোন সালাফ বলেন,

إِذَا أَرَادَ اللهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا فَتَحَ لَهُ بَابَ الْعَمَلِ وَ أَغْلَقَ عَنْهُ بَابَ الْجَدَلِ وَإِذَا أَرَادَ اللهُ بِعَبْدٍ شَرًّا أَغْلَقَ عَنْهُ بَابَ الْعَمَلِ وَفَتَحَ لَهُ بَابَ الْجَدَلِ

‘মহান আল্লাহ যখন কোন বান্দার কল্যাণ চান, তখন তার জন্য আমলের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং ঝগড়ার দরজা বন্ধ করে দেন। আর আল্লাহ যখন কোন বান্দার অমঙ্গল চান, তখন তার জন্য আমলের দরজা বন্ধ করে ঝগড়ার দরজা উন্মুক্ত করে দেন’।[৯]

অধিক সমালোচনার ব্যাপারে নিন্দা

ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) (৯৩-১৭৯ হি.) বলেন,أَدْرَكْتُ أَهْلَ هَذِهِ الْبَلْدَةِ وَ إِنَّهُمْ لَيَكْرَهُوْنَ هَذَا الْإِكْثَارَ الَّذِيْ فِيْهِ النَّاسُ الْيَوْمُ ‘আমি মদীনা শহরের অধিবাসীদেরকে এমতাবস্থায় পেয়েছি যে, তারা বর্তমান মানুষের ন্যায় অতিরঞ্জিত করাকে অপসন্দ করতেন’।[১০] এ কথার দ্বারা তিনি মাসআলার বিষয়টিকে উদ্দেশ্য করেছেন।[১১] তিনি অতিরিক্ত কথা ও অধিক ফৎওয়া দেয়াকে অপসন্দ করতেন। তিনি বলেন,يتكلم أحدهم كأنه جمل مغتلم يقول هو كذا هو كذا يهدر في كلامه ‘কেউ কেউ এমনভাবে কথা বলে যে, মনে হয় সে যেন উত্তেজিত উট। যেমন সে বলে, এটা এমন, এটা এমন, এভাবে কথা বলতে বলতে সে গর্জন করে উঠে’।[১২] অধিক প্রশ্নের উত্তর দেয়াকেও তিনি অপসন্দ করতেন, তিনি বলতেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

وَ یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الرُّوۡحِ قُلِ الرُّوۡحُ مِنۡ اَمۡرِ رَبِّیۡ

‘আর তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, বলুন, রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ থেকে’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৮৫)। এক্ষেত্রে কোন উত্তর আসেনি।[১৩] তাকে বলা হল, সুন্নাহ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি কি সে বিষয়ে বিতর্ক করতে পারবে? তিনি বললেন, لَا وَلَكِنْ سَيُخْبِرُ بِالسُّنَّةِ فَإِنْ قُبِلَ مِنْهُ وَ إِلَّا سَكَتْ ‘না, তবে সে সুন্নাহ্ জানিয়ে দিবে, গ্রহণযোগ্য হলে হবে, অন্যথায় চুপ থাকবে’।[১৪] তিনি আরো বলেন,المِرَاءُ وَالْجِدَالُ فِيْ الْعِلْمِ يُذْهِبُ بِنُوْرِ الْعِلْمِ ‘ইলমের ক্ষেত্রে ঝগড়া-বিবাদ, ইলমের জ্যোতি নষ্ট করে দেয়’।[১৫] তিনি আরো বলেন,المِرَاءُ فِيْ الْعِلْمِ يُقَسِّي الْقَلْبَ وَ يُوْرِثُ الضَّغْنَ ‘ইলমের ক্ষেত্রে ঝগড়া-বিবাদ অন্তরকে কঠোর করে ফেলে এবং হিংসা-বিদ্বেষের জন্ম দেয়’।[১৬]

ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ)-কে মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলে অধিকাংশ সময় তিনি বলতেন, ‘আমি জানি না’। ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)ও তাঁর এই পদ্ধতি অনুসরণ করতেন।

অধিক প্রশ্ন, কঠিন মাসাআলা এবং কোন কিছু ঘটার পূর্বেই ফৎওয়া জিজ্ঞেস করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর এ ব্যাপারে এত অধিক বর্ণনা এসেছে, যা উল্লেখ করলে আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে।

ইমাম ও সালাফগণের মধ্য থেকে যারা অধিক তর্ক-বিতর্ক করা থেকে বিরত হয়ে চুপ থেকেছেন, তারা অজ্ঞতা ও অপারগতার কারণে চুপ থাকেননি; বরং সুদৃঢ় ইলম ও আল্লাহভীতির কারণেই চুপ থেকেছেন। তাদের পরে যারা অধিক হারে বক্তব্য দিয়েছে, ঝগড়া-বিবাদের ব্যাপকতা ঘটিয়েছে, তারা মূলত সালাফদের থেকে বেশি জ্ঞানের কারণে এমনটি করেনি; বরং যুক্তি-তর্কের প্রতি মোহ এবং আল্লাহ-ভীতি কম থাকার কারণেই এমনটি করেছে। যেমন হাসানুল বাছরী (রাহিমাহুল্লাহ) কিছু লোককে ঝগড়া করতে শুনে বলেন,

هَؤُلَاءِ قَوْمٌ مَلُّوْا الْعِبَادَةَ وَخَفَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ وَقَلَّ وَرَعُهُمْ فَتَكَلَّمُوْا

‘এরা এমন সম্প্রদায় যারা ইবাদত করতে ক্লান্তবোধ করছে, অথচ কথা বলা তাদের জন্য সহজ হয়েছে। তাদের আল্লাহ-ভীতি কমে গেছে, তাই তারা ঝগড়া করা শুরু করেছে’।[১৭]

মাহদী বিন মাইমুন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, অতি বুদ্ধিমান ব্যক্তি মুহাম্মাদ ইবনু সীরীনকে আমি বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘আমি জানি সে কী চায়, তোমার সাথে ঝগড়া করতে চাইলে আমি ঝগড়াটে আলেম হয়ে যাব’।[১৮] তিনি আরো বলেন,أَنَا أَعْلَمُ بِالْمِرَاءِ مِنْكَ وَلَكِنِّيْ لَا أُمَارِيْكَ ‘তর্ক-বিতর্ক আমি তোমার থেকে বেশিই জানি, তবে আমি তোমার সাথে তর্ক-বিতর্ক করব না’।[১৯]

ইবরাহীম আন-নাখয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, مَا خَاصَمْتُ قَطُّ ‘আমি কখনো (ইলম নিয়ে) ঝগড়া করিনি’।[২০] আব্দুল কারীম আল জাযারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, مَا خَاصَمَ وَرَعٌ قَطُّ ‘আল্লাহভীরু ব্যক্তি কখনো ঝগড়া করে না’।[২১] জা‘ফর ইবনু মুহাম্মাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন,

إِيَّاكُمْ وَالْخُصُوْمَاتِ فِيْ الدِّيْنِ, فَإِنَّهَا تَشْغَلُ الْقَلْبَ, وَتُوْرِثُ النِّفَاقَ

‘তোমরা দ্বীনের ক্ষেত্রে ঝগড়া করা থেকে বিরত থাক, কেননা তা অন্তরকে ব্যস্ত রাখে এবং কপটতার জন্ম দেয়’।[২২] ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন, إِذَا سَمِعْتَ الْمِرَاءَ فَأَقْصِرْ ‘যখন তুমি তর্ক-বিতর্ক শুনবে তখন থেমে যাবে’।[২৩] তিনি আরো বলতেন, مَنْ جَعَلَ دِيْنَهُ غَرَضًا لِلْخُصُوْمَاتِ أَكْثَرَ التَّنَقُّلَ ‘যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে ঝগড়ার লক্ষ্য-বস্তু বানিয়ে নেয়, সে দ্বীন ও সুন্নাহর উপর স্থির না থেকে বেশি বেশি মত পরিবর্তন করে’।[২৪] তিনি আরো বলতেন,

إِنَّ السَّابِقِيْنَ عَنْ عِلْمٍ وَقَفُوْا وَبِبَصَرٍ نَاقِدٍ كَفُّوْا وَكَانُوْا هُمْ أَقْوَى عَلَى الْبَحْثِ لَوْ بَحَثُوْا

‘নিশ্চয় পূর্ববর্তীগণ জেনে শুনেই চুপ থেকেছেন। দূরদর্শী হয়েও তারা বিরত থেকেছেন। অনুসন্ধানের জন্য তো তারাই বেশি উপযুক্ত ছিলেন, যদি তারা অনুসন্ধান করতেন’।[২৫] এই বিষয়ে সালাফ থেকে অনেক বক্তব্য পাওয়া যায়।

বক্তব্য কম মানেই জ্ঞান কম, বক্তব্য বেশি মানেই জ্ঞান বেশি- এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ

পরবর্তীদের মধ্য থেকে অনেকেই এর দ্বারা ফেতনায় পড়েছেন, তারা ধারণা করে যে, দ্বীনের মাসআলার ক্ষেত্রে যার আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ যত বেশি হবে, সে তত বেশি জ্ঞানী। তাদের এ ধারণা মূর্খতা বৈ কিছু নয়’।

মহান ছাহাবী এবং তাঁদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তাদের প্রতি লক্ষ্য করুন, যেমন আবূ বকর, ওমর, আলী, মু‘আয, ইবনু মাসঊদ ও যায়েদ ইবনু ছাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। তারা কেমন ছিলেন? তাদের সকলের বক্তব্য ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে কম ছিল অথচ তারা সকলেই ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর চেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন। এমনিভাবে তাবেঈদের বক্তব্য ছাহাবীদের বক্তব্যের চেয়ে বেশি, অথচ ছাহাবীরাই তাদের থেকে বেশি জ্ঞানী ছিলেন। একইভাবে তাবেঈ-তাবেঈদের বক্তব্য তাবেঈদের থেকে বেশি, অথচ তাবেঈরা তাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন।

সারগর্ভ উপকারী জ্ঞান

বর্ণনার আধিক্যতা আর বক্তব্যের প্রাচুর্যের মধ্যেই ইলম সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইলম হচ্ছে অন্তরে ঢেলে দেয়া এক জ্যোতি, যা দিয়ে বান্দা হক্ব বুঝে, সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে আর এমন সংক্ষিপ্ত বর্ণনাভঙ্গিতে তা ব্যক্ত করে যাতে করে উদ্দেশ্য অর্জিত হয়।

রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ‘জাওয়ামিউল কালিম’ (সংক্ষিপ্ত, অথচ ব্যাপক অর্থবহ বক্তব্য) এবং সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলার যোগ্যতা দেয়া হয়েছিল। এজন্যই বক্তব্যের আধিক্যতা এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

إِنَّ اللهَ لَمْ يَبْعَثْ نَبِيًّا إِلَّا مُبَلِّغًا وَإِنَّ تَشْقِيْقَ الْكَلَامِ مِنَ الشَّيْطَانِ

‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা নবীকে শুধু প্রচারকারী হিসাবেই প্রেরণ করেছেন, আর টুকরা টুকরা কথা শয়তানের পক্ষ থেকেই হয়’।[১] অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমনভাবে কথা বলতেন, যাতে করে উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে যায়, তবে বেশি এবং উদ্দেশ্যহীন টুকরা টুকরা কথা বলা নিন্দনীয়।

বক্তব্যের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দিক নির্দেশনা

রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর খুত্ববাগুলো একেবারে মধ্যবর্তী ধরনের ছিল। তিনি এমনভাবে কথা বলতেন যে, যদি কোন গণনাকারী তাঁর কথাগুলো গুণতে চাইত, তাহলে গণনা করতে পারত।[২] রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ سِحْرًا ‘কোন কোন বর্ণনা যাদুর মত হৃদয়গ্রাহী হয়’।[৩] এই কথাটি তিনি নিন্দা করেই বলেছেন; প্রশংসা করে নয়। যেমনটি অনেকেই ধারণা করে থাকে। তবে যে ব্যক্তি হাদীছের শব্দগুলোর প্রতি লক্ষ্য করবে সে অবশ্যই সঠিক বিষয়টি বুঝতে পারবে।[৪]

তিরমিযী এবং অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ ليُبْغِضُ الْبَلِيْغَ مِنَ الرِّجَالِ الَّذِىْ يَتَخَلَّلُ بِلِسَانِهِ كما تَتَخَلَّلَ الْبَقَرَةُ بِلِسَانِهَا

‘সেসব বাকপটু-বাগ্মী লোকদেরকে আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই ঘৃণা করেন, যারা গরুর জাবর কাটার ন্যায় কথা বলেই চলে’।[৫] যেমন এ ব্যাপারে অনেক মারফূ‘ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। তেমনি ওমর, সা‘দ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা), আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এবং অন্যান্য ছাহাবীদের থেকে মাওকূফ হাদীছও বর্ণিত হয়েছে।

মিতভাষী হলেই তার জ্ঞান কম নয়

বর্তমানে আমরা এমন কিছু মূর্খ লোকদের পাল্লায় পড়েছি, যারা পরবর্তী কিছু লোকের ব্যাপারে এ বিশ্বাস করে যে, যার বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে, সে অতীতের আলেমদের থেকে বেশি জ্ঞানী। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ কিছু লোকের ব্যাপারে এমন ধারণাও করে যে, তারা পূর্ববর্তী ছাহাবী বা তাবেঈর চেয়েও বেশী জ্ঞানী। যেহেতু তাদের বক্তব্য ও আলোচনার আধিক্যতা রয়েছে।

আবার কেউ বলে, অমুক ব্যক্তি প্রসিদ্ধ ফকী¡হদের থেকেও বেশি জানে! আর এটা পূর্বে যা বলা হল সে বিষয়কে আবশ্যক করে দেয়। কেননা প্রসিদ্ধ ফক্বীহগণ তো তাদের পূর্ববর্তীদের থেকে বেশি বক্তব্য দিয়ে গেছেন। যেহেতু পরবর্তীরা অধিক বক্তব্যের কারণে বেশি জ্ঞানী, তাহলে যুক্তিসঙ্গতভাবেই বর্তমানরাও সালাফদের থেকে বেশি জ্ঞানী হবেন। কেননা সালাফরা বর্তমানদের থেকে কম আলোচনা করেছেন। যেমন- সুফইয়ান ছাওরী, আওযাঈ, লাইছ, ইবনুল মুবারাক ও তাদের স্থলে যারা আছেন। এ রকমভাবে তাদের পূর্বের ছাহাবী এবং তাবিঈরাও। সবাই তাদের থেকে স্বল্প আলোচনাকারী ছিলেন।

এসব কথা মূলত সালাফে ছালেহীনের মর্যাদায় আঘাত, তাদের ব্যাপারে খারাপ ধারণা এবং তাদেরকে মূর্খ ও অল্প জ্ঞানের দিকে সম্পৃক্ত করা। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ! ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ছাহাবীদের ব্যাপারে যথার্থই বলেছিলেন, إِنَّهُمْ أَبَرُّ الْأُمَّةِ قُلُوْبًا وَ أَعْمَقُهَا عُلُوْمًا وَ أَقَلُّهَا تَكَلُّفًا ‘অন্তরের দিক থেকে ছাহাবীগণ ছিলেন উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সদয়, ইলমে গভীর আর ফৎওয়া প্রদানের দায়িত্ব গ্রহণে খুবই অল্প।[৬] ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা এসেছে।[৭]

ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর এই উক্তির মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ছাহাবীদের পরে যারা আসবে তারা ইলমে পিছিয়ে থাকবে, আর ফৎওয়া প্রদানের দায়িত্বে এগিয়ে থাকবে। ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আরো বলেন,

إِنَّكُمْ فِيْ زَمَانٍ كَثِيْرٌ عُلَمَاؤُهُ قَلِيْلٌ خُطَبَاؤُهُ وَ سَيَأْتِيْ بَعَدَكُمْ زَمَانٌ قَلِيْلٌ عُلَمَاؤُهُ كَثِيْرٌ خُطَبَاؤُهُ

‘তোমরা এমন একটি যুগে আছ, যে যুগে আলেমের সংখ্যা বেশি বক্তার সংখ্যা কম। তবে তোমাদের পরে এমন একটি যুগ আসবে, যখন আলেমের সংখ্যা কম হবে কিন্তু বক্তার সংখ্যা বেশি হবে’।[৮] সুতরাং যার ইলম বেশি কিন্তু বক্তব্য কম, সেই প্রশংসিত। পক্ষান্তরে যার ইলম কম, বক্তব্য বেশি সেই নিন্দিত।

রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইয়ামানবাসীদের ইমান ও ফিক্বহের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন।[৯] কারণ তারাই মানুষদের মধ্যে মিতভাষী এবং বাহ্যিক দৃষ্টিতে অল্প জ্ঞানী হলেও তাদের জ্ঞান ছিল উপকারী, যা তাদের অন্তরে গেঁথে ছিল। সেই উপকারী জ্ঞান থেকে তারা প্রয়োজনে প্রকাশ করতেন, আর এটাই হল ফিক্বহ ও উপকারী জ্ঞান।

সালাফদের জ্ঞানই উত্তম

কুরআনের তাফসীর, হাদীছের তাৎপর্য এবং হালাল-হারাম সংক্রান্ত বিষয়ে উত্তম ইলম হচ্ছে- যা ছাহাবী, তাবেঈ, তাবে তাবেঈ এবং অনুসরণীয় ইমামদের যুগ পর্যন্ত সালাফ কর্তৃক বর্ণিত। যাদের নাম আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। অতএব তাদের থেকে বর্ণিত বিষয়গুলো অনুধাবনকরতঃ সে বিষয়ে পা-িত্য অর্জন করে তা সংরক্ষণ করাই উত্তম ইলম। আর তাদের পরবর্তীতে যেসব ইলমের প্রচার-প্রসার ঘটেছে, তার অধিকাংশের মধ্যেই কোন কল্যাণ নেই। তবে পরবর্তীতে প্রসারিত ইলম যদি সালাফদের কোন বক্তব্যের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হয়, তাহলে তাতে কোন সমস্যা নেই। পক্ষান্তরে পরবর্তীতে প্রসার লাভ করা ইলম যদি সালাফদের বক্তব্য বিরোধী হয়, তাহলে তার বেশির ভাগই বাতিল হিসাবে গণ্য হবে।

কুরআনের তাফসীর, হাদীছের ব্যাখ্যা ও হালাল-হারামের আলোচনার ক্ষেত্রে সালাফদের বক্তব্যই যথেষ্ট। অতএব তাদের পরবর্তী যুগে কারো বক্তব্যে যে হকই¡ পাওয়া যাবে তা সালাফদের আলোচনায় বাহুল্যবর্জিত শব্দে এবং সংক্ষিপ্ত বর্ণনাভঙ্গিতে বিদ্যমান। এমনিভাবে তাদের পরবর্তী যুগে কারো বক্তব্যে যদি নতুন কোন বাতিলের সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে যে বুঝে এবং গবেষণা করে তার জন্য সালাফদের আলোচনাতেও এমন কিছু বিদ্যমান রয়েছে যা সেটাকে বাতিল করে দেয়। সালাফদের বক্তব্যে এমন অলংকার ও তাৎপর্যপূর্ণ কিছু সূত্র পাওয়া যায়, যা পরবর্তীরা আবিষ্কার করতে পারে না এবং সে সম্পর্কে তারা জানতেও পারে না। সুতরাং যে সালাফদের বক্তব্য থেকে ইলম গ্রহণ করেনি, বুঝতে হবে কল্যাণ তার হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং পরবর্তীদের অনুসরণ করতে গিয়ে সে অনেক বাতিলের মধ্যে পতিত হয়েছে।

ছাহাবীদের বক্তব্য গ্রহণের ক্ষেত্রে ছহীহ-যঈফ বিষয়ে জ্ঞান থাকা যরূরী

ছাহাবীদের বক্তব্য সংকলনকারীর জন্য উচিত হচ্ছে তাদের বক্তব্যের মধ্যে কোন্টি ছহীহ আর কোন্টি যঈফ সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। আর এটা ‘আল-জারাহ ওয়াত তা‘দীল’এবং ‘ইলাল’ শাস্ত্র জানার মাধ্যমেই সম্ভব। আর যে এ সম্পর্কে জানে না, সে তাদের বক্তব্য বর্ণনা করার ক্ষেত্রে নিভর্রযোগ্য নয়। তার কাছে হক্ব বাতিলের সাথে মিশে তালগোল পাকিয়ে যাবে আর তার কাছে যা থাকবে তাও আস্থাযোগ্যও হবে না। যেমন দেখা যায়, জারাহ ওয়াত-তা‘দীল সম্পর্কে যার জ্ঞান কম, সে যদি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা সালাফদের থেকে বর্ণনা করে, তাহলে তার ব্যাপারে ছহীহ-যঈফ সম্পর্কে আস্থাশীল হওয়া যায় না। তার ছহীহ ও যঈফের মধ্যে পার্থক্য করার জ্ঞান না থাকার কারণে এমন হয়। আর এই অজ্ঞতার কারণে তার সকল বর্ণনাকে বাতিল গণ্য করা জায়েয আছে। কারণ সে ছহীহ-যঈফের পার্থক্য বুঝে না। ইমাম আওযাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, الْعِلْمُ مَا جَاءَ بِهِ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَا كَانَ غَيْرُ ذَلكَ فَلَيْسَ بِعِلْمٍ ‘মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ছাহাবীগণ যা নিয়ে এসেছেন তাই ইলম, এছাড়া আর কিছইু ইলম নয়’।[১০]

ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)ও একই কথা বলেছেন। তিনি তাবেঈদের ক্ষেত্রে বলতেন, ‘তোমার ইচ্ছা, অর্থাৎ তাবেঈদের বক্তব্য লেখা ও না লেখার ক্ষেত্রে তোমার ইচ্ছা’।

ইমাম যুহুরী (রাহিমাহুল্লাহ) (৫৮-১২৪ হি.) তাবেঈদের কথা লিখে রাখতেন, কিন্তু ছালিহ ইবনু কাইসান (রাহিমাহুল্লাহ) (৪০-১৪০ হি.) তার বিরোধিতা করতেন, তবে পরবর্তীতে তাবেঈদের কথা না লেখার কারণে তিনি অনুতপ্ত হয়েছিলেন।[১১]

তাবেঈ বা ইমামদের বক্তব্য লিখার বিধান

আমাদের যুগে ইমাম শাফেঈ, আহমাদ, ইসহাক্ব এবং আবূ উবাইদ পর্যন্ত অনুসরণীয় আইম্মাতুস সালাফের বক্তব্য লিখা নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। তবে তাদের পরবর্তীতে যা ঘটেছে, সে ব্যাপারে মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত। তাদের পরে বহু ঘটনা প্রবাহই তো ঘটে গেছে। তাদের পরবর্তীতে জাহিরিয়্যা ও তাদের মত এমন লোকদের আবির্ভাব ঘটেছে, যাদেরকে সুন্নাহ ও হাদীছ অনুসরণের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। অথচ নিজস্ব বুঝ এবং স্বীয় চিন্তা-চেতনা নিয়ে উম্মাহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে তা সুন্নাহর সাথে কঠিনভাবে সাংঘর্ষিক। অথবা সে এমন কিছু গ্রহণ করেছে, যা তার পূর্ববর্তী ইমামগণ গ্রহণ করেননি।

যুক্তিবাদী বা দার্শনিকদের বক্তব্যে অনুপ্রবেশ ক্ষতিকারক

যুক্তিবাদী ও দার্শনিকদের বক্তব্যে প্রবেশ করা ক্ষতি ছাড়া আর কিছু নয়। যারাই তাতে প্রবেশ করেছে তারাই তাদের আবর্জনা দ্বারা কলঙ্কিত হয়েছে। যেমন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, لَا يَخْلُوْ مَنْ نَظَرَ فِيْ الْكَلَامِ إِلَّا تَجَهَّمَ ‘যারা যুক্তিবিদ্যার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে, তারা জাহমিয়্যা না হয়ে থাকতে পারেনি’।[১২] তিনি ও সালাফদের অন্যান্য সম্মানিত ইমামগণ আহলে কালামদের ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন, যদিও তারা সুন্নাহকে রক্ষা করে থাকে।

আর যে ব্যক্তি বিদ‘আতপূর্ণ বক্তব্যকে ভালোবাসে, বিদ‘আতীকে অনুসরণ করে এবং যে ব্যক্তি ঝগড়া-বিবাদে জড়ায় না তাকে নিন্দা করে জাহেল বা মূর্খতার দিকে সম্পৃক্ত করে এবং বলে সে না-কি আল্লাহ বা ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানই রাখে না, তাহলে এসব কিছুই শয়তানের পরিকল্পনা, এগুলো থেকে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।

নব আবিষ্কৃত ইলমের মধ্যে আরো রয়েছে, চিন্তাধারা, ঝোঁক অথবা কাশফের দ্বারা মা‘রিফাত, অন্তরের আমল এবং এ ধরনের অপ্রকাশ্য ইলম নিয়ে আলোচনা করা, যাতে ভয়াবহ বিপদ বিদ্যমান। স্বয়ং ইমামগণ এর প্রতিবাদ করে গেছেন। যেমনটা ইমাম আহমাদ এবং অন্যদের ব্যাপারে ঘটেছে। আবূ সুলায়মান (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন,

إِنَّهُ لَتَمُرُّ بِيَ النُّكْتَةُ مِنْ نُكَتِ الْقَوْمِ فَلَا أُقَبِّلُهَا إِلَّا بِشَاهِدَيْنِ عَدْلَيْنِ: الْكِتَابُ وَ السُّنَّةُ

‘মানুষের কত কথার মালা আমার পাশ দিয়ে চলে যায়, অথচ ন্যায়পরায়ণ দু’টি সাক্ষী ছাড়া আমি তা গ্রহণ করি না। তাহল কুরআন ও সুন্নাহ’।[১৩] জুনাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন,

عِلْمُنَا هَذَا مُقَيَّدٌ بِالْكِتَابِ وَ السُّنَّةِ مَنْ لَمْ يَقْرَأِ الْقُرْآنَ وَيَكْتُبِ الْحَدِيْثَ لَا يُقْتَدَى بِهِ فِيْ عِلْمِنَا هَذَا

‘আমাদের ইলম তো কুরআন ও সুন্নাহর সাথে মিশে আছে। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআন পড়বে না এবং হাদীছ লিখবে না, আমাদের এ ইলমের ক্ষেত্রে তার অনুসরণও করা যাবে না’।[১৪]

ইলমে কালাম শাস্ত্রে নির্বুদ্ধিতা ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এ বিষয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে অনেক লোক নাস্তিক এবং মুনাফিক্ব হয়ে গেছে। এমনকি তাদের অনেকে এই দাবী পর্যন্ত করেছে যে, আল্লাহর ওলীগণ নবীদের থেকেও উত্তম কিংবা তারা নবীদের মুক্ষাপেক্ষী নয় এবং রাসূলদের নিয়ে আসা শরী‘আত অসম্পূর্ণ। কখনো তারা হুলূল, ইত্তিহাদ বা ওয়াহদাতুল ওজুদের দাবি করেছে। এছাড়াও কুফুরী, ফাসেকী এবং অবাধ্যতার অনেক মূলনীতি তো আছেই। যেমন- হালালকে হারাম বা শরী‘আতের নিষিদ্ধ বিষয়ের ক্ষেত্রে হালালের দাবি করা ইত্যাদি।

এসব নিয়ম-নীতিতে তারা এমন অনেক বিষয় প্রবেশ করিয়েছে যার সাথে দ্বীনের কোন সম্পর্ক নেই। তবে কিছু কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে তারা ধারণা করে যে, এগুলোর দ্বারা অন্তর নরম হয়। যেমন গান ও নৃত্য! আর কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে তাদের ধারণা, এগুলোর দ্বারা প্রবৃত্তির ব্যায়াম হয়। যেমন- হারাম ছবির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া ও তা দেখা! আর কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে তারা মনে করেছে যে, তা অন্তরের ফাটল এবং বিনয়ীর জন্য। যেমন- পোশাকের প্রসিদ্ধতা। এছাড়াও এমন কিছু বিষয় আছে যা শরী‘আত প্রবর্তন করেনি!

আবার কিছু কিছু বিষয় আছে, যা আল্লাহর যিকির ও ছালাত থেকে বিরত রাখে। যেমন গান-বাজনা, হারামের প্রতি দৃষ্টি। আর এসব কিছুর মাধ্যমে তারা তাদের মত হয়ে গেছে, যারা দ্বীনকে খেল-তামাশা হিসাবে গ্রহণ করেছে।

তথ্যসূত্র :
[১]. মা‘মার বিন রশিদ তাঁর ‘জামে‘ গ্রন্থে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন, যেটি মুছান্নাফে আব্দুর রাযযাকের সাথে সংযুক্ত, (১১তম খণ্ড, পৃ. ১৬৩), তবে এটি যঈফ মুরসাল।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৬৭; ছহীহ মুসলিম হা/২৪৯৩, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত।
[৩]. ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে لَسِحْرًا শব্দে বর্ণনা করেছেন, হা/৫১৪৬; ইমাম মুসলিম ‘আম্মার বিন ইয়াসার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে উল্লিখিত শব্দে বর্ণনা করেছেন, হা/৮৬৯।
[৪]. রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীছ ‘কোন কোন বর্ণনা যাদুর মত হৃদয়গ্রাহী’ এটি প্রশংসা ও নিন্দা উভয় প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।
প্রশংসনীয় প্রসঙ্গের উদাহরণ হল

(ক) ছহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

أَنَّهُ قَدِمَ رَجُلَانِ مِنْ الْمَشْرِقِ فَخَطَبَا فَعَجِبَ النَّاسُ لِبَيَانِهِمَا فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ مِنْ الْبَيَانِ لَسِحْرًا أَوْ إِنَّ بَعْضَ الْبَيَانِ لَسِحْرٌ

‘একবার পূর্বাঞ্চল (নজদ এলাকা) থেকে দু’জন লোক এসে তারা ভাষণ দিল। লোকজন তাদের ভাষণে বিস্মিত হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কোন কোন ভাষণ অবশ্যই যাদুর মত’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৬৭)।

(খ) ছহীহ মুসলিমে আবূ ওয়ায়িল থেকে বর্ণিত, তিনে বলেন,

خَطَبَنَا عَمَّارٌ فَأَوْجَزَ وَأَبْلَغَ فَلَمَّا نَزَلَ قُلْنَا يَا أَبَا الْيَقْظَانِ لَقَدْ أَبْلَغْتَ وَأَوْجَزْتَ فَلَوْ كُنْتَ تَنَفَّسْتَ. فَقَالَ إِنِّىْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ إِنَّ طُوْلَ صَلَاةِ الرَّجُلِ وَقِصَرَ خُطْبَتِهِ مَئِنَّةٌ مِنْ فِقْهِهِ فَأَطِيلُوا الصَّلَاةَ وَاقْصُرُوا الْخُطْبَةَ وَإِنَّ مِنَ الْبَيَانِ سِحْرًا

‘আম্মার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের উদ্দেশে সংক্ষেপে একটি সারগর্ভ ভাষণ দিলেন। তিনি মিম্বর থেকে নামলে আমরা বললাম, হে আবুল ইয়াক্বযান! আপনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ ভাষণ দিয়েছেন, তবে যদি তা কিছুটা দীর্ঘ করতেন। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, কোন ব্যক্তির দীর্ঘ ছালাত ও সংক্ষিপ্ত ভাষণ তার প্রজ্ঞার পরিচায়ক। অতএব তোমরা ছালাতকে দীর্ঘ ও ভাষণকে সংক্ষিপ্ত কর। অবশ্যই কোন কোন ভাষণে যাদুকরী প্রভাব থাকে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৯৪)।

নিন্দনীয় প্রসঙ্গের উদাহারণ হল

বুুরাইদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,

إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ سِحْرًا وَإِنَّ مِنَ الْعِلْمِ جَهْلًا وَإِنَّ مِنَ الشِّعْرِ حُكْمًا وَإِنَّ مِنَ الْقَوْلِ عِيَالًا. فَقَالَ صَعْصَعَةُ بْنُ صُوْحَانَ صَدَقَ نَبِىُّ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَّا قَوْلُهُ إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ سِحْرًا. فَالرَّجُلُ يَكُوْنُ عَلَيْهِ الْحَقُّ وَهُوَ أَلْحَنُ بِالْحُجَجِ مِنْ صَاحِبِ الْحَقِّ فَيَسْحَرُ الْقَوْمَ بِبَيَانِهِ فَيَذْهَبُ بِالْحَقِّ

‘কোন কোন বর্ণনা যাদুর মত হৃদয়গ্রাহী হয়, কোন কোন ইলম অজ্ঞাতাপূর্ণ হয়, কোন কোন কবিতা হিকমাতপূর্ণ হয় এবং কোন কোন কথা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়’। ছা‘ছা‘আহ ইবনু ছূহান বলেন, আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঠিক বলেছেন। প্রথমত রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী : ‘কোন কোন বর্ণনা যাদুর মত হৃদয়গ্রাহী হয়’ প্রায় দেখা যায়, কোন ব্যক্তির নিকট অপরের হক্ব থাকে কিন্তু সে হক্বদারের সাথে এমন সুন্দরভাবে যুক্তিপূর্ণ কথা বলে, যাতে পাওনাদারের দেনা পরিশোদ করতে হয় না’ (আবূ দাঊদ, হা/ ৫০১২, সনদ দুর্বল)। এজন্যই ক্বাযী ই‘আয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর দু’টি ব্যাখ্যা আছে।

নিন্দা। কেননা কথার ছন্দের মাধ্যমে মানুষের অন্তরসমূহকে সে তার নিজের দিকে আকৃষ্ট করে এমনকি এর দ্বারা তখন গুনাহও কামাই করে। যেমন যাদুর দ্বারা কামাই করে থাকে।
দুই. প্রশংসনীয়। কেননা বাগ্মীতা শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর অন্তরসমূহকে তার দিকে আকৃষ্ট করার কারণে তাকে যাদুর সাথে সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে। আর যাদুর মূলই হল ফিরানো। আর বায়ানও অন্তরসমূহকে তার আহ্বানকৃত বিষয়ের দিকে ফিরিয়ে দেয় এবং আকৃষ্ট করে। ইমাম নববী বলেন, ২য় ব্যখ্যাটিই বিশুদ্ধ (নববী, শারহু ছহীহ মুসলিম, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১৫৯)।

[৫]. আবূ দাউদ, হা/৫০০৫; তিরমিযী, হা/২৮৫৩; আহমাদ শাকের সনদটিকে ছহীহ বলেছেন, তাহক্বীক্বে মুসনাদে আহমাদ, ১০তম খণ্ড, পৃ. ৫৩); শায়খ আলবানীও ছহীহ বলেছেন, ছহীহুল জামে‘, হা/ ১৮৭৫।
[৬]. ইবনু আব্দুল বার্র, জামি‘ঊ বায়ানিল ইলম ও ফাযলিহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৯৮৭, সনদ মুনক্বাতে‘, সানিদ আল-মাসীসী নামক একজন রাবী আছেন, যিনি ইবনু আবী হাতেম ও অন্যান্যের নিকট দুর্বল।
[৭]. আবূ নু‘আইম, হিলয়াতুল আউলিয়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩০৫, সনদে ওমর ইবনু নুবহান নামক রাবী আছেন, যিনি দুর্বল। হাসান বাছরী থেকেও এমন আছার বর্ণিত হয়েছে।
[৮]. যুহাইর ইবনু হারব ‘ইলম’ গ্রন্থে ছহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন, পৃ. ২৭; হাকেম পাশাপাশি শব্দে মুসতাদরাকে বর্ণনা করেছন, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৫২৯; ত্বাবারাণী, আল-মু‘জামুল কাবীর, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১০৮; হান্দাদ, যুহুদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৫৫; হাকেম শায়খাইনের শর্তে ছহীহ বলেছেন, ইমাম যাহাবীও তার সাথে একমত পোষণ করেছেন, শায়খ আলবানী ছহীহ বলেছেন। সিলসিলাহ ছহীহাহ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৫৭৬।
[৯]. লেখক সেই হাদীছের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,الْإِيمَانُ يَمَانٍ وَالْحِكْمَةُ يَمَانِيَةٌ ‘ঈমান হল ইয়ামানীদের আর হিকমাতও ইয়ামানীদের’।
[১০]. ইবনু আব্দুল বার্র, জামে‘ঊ বায়ানিল ইলম ও ফাযলিহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬১৭।
[১১]. খতিব বাগদাদী, ‘তাক্বঈদুল ইলম, পৃ. ১০৬-১০৭; ইবনু আব্দিল বার্র, ‘জামে‘ঊ বায়ানিল ইলম ও ফাযলিহ, ১ম খ-, পৃ. ৩৩৩; ছালেহ ইবনু কায়সান (৪০-১৪০ হি.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি এবং যুহুরী একত্রিত হয়ে ইলম অর্জন করছিলাম। অতঃপর আমরা হাদীছ লিখব বলে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তা লিখে ফেললাম। অতঃপর তিনি (যুহুরী) বললেন, ছাহাবীদের থেকে বর্ণিত বিষয়গুলোও আমরা লিখব, কেননা তাও সুন্নাহ। আমি বললাম, তা সুন্নাহ্ নয়, সুতরাং আমরা তা লিখব না। অতঃপর তিনি লিখলেন আর আমি লিখলাম না। তাই তিনি সফলকাম হলেন, আর আমি ক্ষতিগ্রস্থ হলাম।
[১২]. ইবনুল বাত্তাহ, আল-ইনাবাতুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৩৮।
[১৩] আর-রিসালাতুল কুশায়রিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬১; তারীখে দামেস্ক, ৩৪তম খণ্ড, পৃ. ১২৭। আবূ সুলায়মান হলেন আদ-দারানী, তিনি যাহেদ ছিলেন। তার নাম আব্দুর বিন আহমাদ বিন আতিয়্যাহ আল-আনাসী।
[১৪] আর-রিসালাতুল কুশায়রিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৯; মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১১তম খণ্ড, পৃ. ২১০।

তথ্যসূত্র :
[১]. মুক্বাতীল ইবনু সুলাইমান ইবনু বশির আল-আযদী আল-বালখী, তিনি ছিলেন তাফসীরের ইমাম, তবে তিনি ‘মাতরুকুল হাদীছ’ ছিলেন। ১৫০ হিজরীতে মৃত্যবরণ করেন-তাহযীবুত তাহযীব, ১০ম খণ্ড, পৃ. ২৭৯।
[২]. নূহ ইবনু ইয়াজিদ (আবূ মারইয়াম) ইবনু জা‘ঊনাহ্ আল-মারওয়াযী, আবূ ইসমাহ্। তিনি মারবের একজন বিচারক ছিলেন, বহু বিদ্যা সংকলন করার কারণে তাকে জামে‘ উপাধি দেয়া হয়। কিন্তু তিনি মুরজিয়্যা এবং হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে দোষী ছিলেন। আবূ হাতেম (রাহিমাহুল্লাহ) তাকে ‘মাতরুকুল হাদীছ’ বলেছেন- তাহযীবুল কামাল, ৩০তম খণ্ড, পৃ. ৫৬।
[৩]. এরা মুহাম্মদ ইবনু কেরামের অনুসারী। যিনি ২৫৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের আক্বীদা হচ্ছে : ঈমান হল কেবল মুখের স্বীকৃতি, ঈমান বাড়েও না এবং কমেও না, কাবীরা গোনাহকারীও পরিপূর্ণ ঈমানদার, আল্লাহর ক্ষেত্রে শরীর শব্দ ব্যবহার করা, আল্লাহর জন্য দিক সাব্যস্ত করা, আল্লাহর সত্তার দ্বারা ঘটনাপ্রবাহ প্রতিষ্ঠিত থাকা জায়েয- আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০৮।
[৪]. মাক্কী এর পরিচয় : মাক্কী ইবনু ইবরাহীম ইবনু বাশির ইবনু ফারক্বাদ (রাহিমাহুল্লাহ)। তাকে মাক্কী ইবনু ফারক্বাদ ইবনু বাশির আত-তামীমী আল-হানযালী আবুস সাকান অ াল-বালখী আল-হাফেযও বলা হয়। ইমাম আল-আজলী (রাহিমাহুল্লাহ) তাকে ছিক্বাহ বলেছেন। আবূ হাতেম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, তার অবস্থা ঠিক আছে, ইমাম নাসাঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, তার কোন সমস্যা নেই। ইমাম দারুকুতনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ছিক্বাহ্, মা’মুন। তিনি ২১৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন-তাহযীবুত তাহযীব, ১০ম খণ্ড, পৃ. ২৯৩।
[৫]. অর্থাৎ এমন তাফসীর ছাড়া যা তার প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত হয়, আর তা হল নিন্দীত তা‘বীল যার প্রকৃত অবস্থা হল তাহরীফ।
[৬]. তাকয়ীফ হল- সাদৃশ্য না দিয়ে কোন বস্তুকে নির্দিষ্ট একটা অবস্থার উপর নির্ধারণ করা, কুরআন-সুন্নাহ এবং বিবেকের দলীল দ্বারা এই আক্বীদা বাতিল বলে প্রমানিত। কুরআনের দলীল : আল্লাহ তাআলা বলেন, وَ لَا یُحِیۡطُوۡنَ بِہٖ عِلۡمًا ‘আর তারা জ্ঞান দিয়ে তাকে বেষ্টন করতে পারে না’ (সূরা ত্ব-হা : ১১০)। বিবেকের দলীল : কোন জিনিসের ছিফাতের অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের কোন একটির জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ১. জিনিসের সত্তা বা ২. তার সমতুল্যের সত্তা অথবা ৩. তার সম্পর্কে সত্যবাদীর সংবাদ। আর এগুলো পদ্ধতিই আল্লাহ তা‘আলার ছিফাতের অবস্থার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ। সুতরাং তাকয়ীফ বাতিল বলে গণ্য হওয়া আবশ্যক। (মাওসূ‘আতুল আক্বীদা ফি মাওক্বিউদ দুরার আস-সানিয়্যা।)
[৭]. তামছীল : আল্লাহর গুণ সাব্যস্তকারীদের বিশ^াস যে, সে আল্লাহর যে গুণাবলী সাব্যস্ত করে তা সৃষ্টির গুণাবলীর অনুরূপ। কুরআন-সুন্নাহ এবং বিবেকের দলীল দ্বারা এই আক্বীদা বাতিল বলে প্রমানিত। কুরআনের দলীল : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ‘তাঁর অনুরূপ কিছুই নেই’ (সূরা আশ-শূরা : ১১)। বিবেকের দলীল : এটা সুস্পষ্ট যে, ¯্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে সত্তাগতভাবে বিশাল পার্থক্য আছে। আর এটাই আবশ্যক করে দেয় যে, তাদের গুণাবলীর মধ্যেও বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান থাকা উচিত। (মাওসূ‘আতুল আক্বীদা ফি মাওক্বিউদ দুরার আস-সানিয়্যা)।
[৮]. তিরমিযী, হা/৩২৫৩; ইবনু মাজাহ, হা/৪৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২১৬৪ এবং অন্যরাও আবূ উমামা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীছ হাসান ছহীহ, শায়খ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)ও ছহীহ বলেছেন, ছহীহুল জামে‘, হা/৫৬৩৩; মুসনাদের তাহক্বীক্ব কারীগণ বিভিন্ন সনদ এবং শাওয়াহেদের মাধ্যমে হাদীছটিকে হাসান বলেছেন।
[৯]. আবূ নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৩২১, মা‘রূফ আল-কারখী থেকে; ইমাম যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামীন নুবালা, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৩৪০।
[১০]. খতিব আল-বাগদাদী, আল-ফাক্বীহ্ ওয়াল-মুতাফাক্বিহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫; ইবনু আব্দুল বার্র, জামে‘ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাযলিহ্, ২য় খণ্ড, পৃ. ১০৬৬।
[১১]. ‘মাসআলাকে উদ্দেশ্য করেছেন’ কথাটি ইমাম মালেক থেকে বর্ণনাকারী ইবনু ওয়াহাব বলেছেন। খত্বীব বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কথার উপর পর্যালোচনা করে বলেন, এটা কোন বিষয় ঘটার পূর্বে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হতে নিষেধাজ্ঞার সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহর ইচ্ছা ও তার সাহায্যে আমরা তার উত্তর এভাবে দিব যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উম্মতের উপর দয়া, অনুকম্পা এবং সহানুভূতি প্রদশর্নের জন্য অধিক প্রশ্ন করাকে অপসন্দনীয় মনে করতেন। আর এই ভয়ে যে আল্লাহ তা‘আলা প্রশ্নকারীর প্রশ্নের মাধ্যমে এমন বিষয়কে হারাম করে দিবেন, যা প্রশ্ন করার পূর্বে হালাল ছিল। অতঃপর প্রশ্নটাই এমন বস্তু নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হবে যার বৈধতার মধ্যেই উম্মতের জন্য উপকার নিহিত। সুতরাং এই প্রশ্নই তাদের কষ্ট এবং ক্ষতির কারণ হল। আর এই বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মৃত্যুর মাধ্যমে দূর হয়ে গেছে এবং শরী‘আতের বিধিবিধান সমূহ সুদৃঢ় হয়েছে। তাই এর পরে আর হারামও হবে না এবং বৈধও হবে না। দ্রষ্টব্য : আল-ফাক্বীহ ওয়াল মুতাফাক্বীহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫-১৮। ইবনু রজব এই মাসআলার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম’-এ (১ম খণ্ড, পৃ. ২৩৮)।
[১২]. ক্বাজী ইয়ায, তারতীবুল মাদারীক ওয়া তাক্বরীবুল মাসালীক, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯০।
[১৩]. এটি লেখক তার ‘জামেঊল ‘উলুম ওয়াল হিকাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৪৮।
[১৪]. ইবনু আব্দিল বার্র, জামে‘ বায়ানিল ‘ইলম ও ফাযলিহ্, ২য় খণ্ড, পৃ. ৯৩৫; ক্বাজী ইয়ায, তারতীবুল মাদারীক ওয়া তাক্বরীবুল মাসালীক, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৯।
[১৫]. তারতীবুল মাদারীক ওয়া তাক্বরীবুল মাসালীক, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৯; সিয়ারু আ‘লামীন নুবালা, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৬।
[১৬]. ইবনু বাত্তাহ, আল-ইনাবাতুল কুবরায়, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৩০; ইমাম মালেক এর উক্তি থেকে, ইমাম বায়হাক্বী, আল-ই‘তিক্বাদ, পৃ. ২৩৯; ইমাম বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান, ইমাম শাফেয়ীর উক্তি হিসাবে বর্ণনা করেছেন, ১১তম খণ্ড, পৃ. ৪১।
[১৭]. ইমাম আহমাদ, আয-যুহুদ, পৃ. ২২০; আবূ নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫৬; আবুল ফজল আল- বাগদাদী, হাদীছুয যুহুরী, পৃ. ৫২০।
[১৮]. আল-ইনাবাতুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫২২।
[১৯]. আল-আজরী, শারী‘আহ্, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৫৩; আল-ইনাবাতুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫২২, সনদ ছহীহ।
[২০]. আল-ইনাবাতুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫২৪।
[২১]. প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫২৫।
[২২]. আল-লালিকাঈ, শারহু উছূলি ই‘তিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৪৫।
[২৩]. ইবনু আবিদ-দুনিয়া, আস-সামত, পৃ. ১০০; আল-ইনাবাতুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫২৭; আল হারভী, যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩২।
[২৪]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৯১৮, মুহাম্মাদ ইবনু হাসান সূত্রে; দারেমী, ‘সুনান’, হা/৩২০, সনদ ছহীহ।
[২৫]. উল্লিখিত শব্দে ইমাম আহমাদ যুহুদে বর্ণনা করেছেন (পৃ. ২৪০); ‘আল-ইনাবাতুল কুবরায়’ نَاقِدٍ এর স্থানে نَافِذٍএবং শেষে وَلَمْ يَبْحَثُوْا শব্দে বর্ণনা করেছেন, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫২৪।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

16 + eight =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য