এসএসসি পরীক্ষা ২০২৫ শুরু হয়েছে গত ১০ এপ্রিল। বিগত বছরের মতো এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ বা আলোচনা না হলেও অনেকটা ভিন্নরূপে চলছে প্রশ্নফাঁস। পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিটের মাথায় প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলে আসে। এর ৩০ মিনিট পর সমাধানও চলে আসে ওই ফেসবুকে। এবার পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নফাঁস না হলেও দায়িত্বরত শিক্ষক বা বিদ্যালয়ের অন্য কর্মচারীদের মাধ্যমে পরীক্ষার দিন সকালে এমন প্রশ্নফাঁসের তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ১৫ এপ্রিল সকালে পরীক্ষা শুরুর ২০ মিনিটের পর সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ‘আমাদের চৌহালী’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে ওই প্রশ্ন ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতায় বেলা ১১টার দিকে গ্রুপ থেকে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোডের পর বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে বেকায়দায় পড়েছে ওই এলাকার প্রশাসন।
অভিযোগ উঠেছে, শুধু সিরাজগঞ্জ নয়, পরীক্ষা শুরুর পর প্রায় জেলা-উপজেলা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। পরীক্ষা শুরুর ১০-২০ মিনিটের মাথায় প্রশ্নফাঁস, এর ৩০ মিনিট পর এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তরপত্রও মিলে যায় ফেসবুকে। কোনো কোনো কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরা সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সমাধান তৈরি করে ফেসবুকে ভিডিও লাইভ করেন।
তবে বর্তমান সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল (সি আর) আবরার বলেন, ‘যাচাই-বাছাই না করে প্রশ্নফাঁসের তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ালে তার দায় তাকেই নিতে হবে। আমরা আশা করব, তারা এসব থেকে বিরত থাকবেন। আমার রাজনৈতিক অবস্থান যাই থাকুক না কেন, দেশের মঙ্গলের জন্য এসব থেকে বিরত থাকবেন। পরীক্ষা এমন একটা বিষয়, এটি অনেক প্রস্তুতির পর নেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মানসিক চাপ তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, প্রশ্নফাঁসের তথ্য পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগে জানাতে হবে, যাতে তারা যাচাই-বাছাই করতে পারেন। কিন্তু আপনি একটা বিষয় পেলেন, সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলেন এবং তার দায়দায়িত্ব অবশ্যই আপনাকে নিতে হবে। এর মাধ্যমে কিন্তু অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। তাই, আমাদের আবেদন থাকবে, আপনারা এসব থেকে বিরত থাকবেন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল এই পাঁচ বছর শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন আ ন ম এহসানুল হল মিলন। ওই সময় প্রশ্নফাঁস ও নকল রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। তখন প্রশ্নফাঁস বিষয়টি তেমন পরিচিত না হলেও বিভিন্ন পরীক্ষায় নকল বিষয়টি ছিল বহুল পরিচিত। তখন ওই প্রতিমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন কেন্দ্র গিয়ে পরিদর্শন করেছেন। কারও কাছে নকল পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেন। এমন বিষয়গুলো ছিল পরীক্ষায় নকল করার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন ঘটনা।
পরীক্ষা শুরুর ২০ মিনিটের মধ্যে প্রশ্নফাঁস : পরীক্ষা শুরুর ২০ মিনিটের মধ্যেই ফেসবুকে ‘আমাদের চৌহালী গ্রুপ’ নামে একটি গ্রুপে প্রশ্নপত্রটি আপলোড করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে পোস্টদাতা লেখেন, ‘পরীক্ষা শুরুর ২০ মিনিটের মধ্যেই ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্নফাঁস, নকলমুক্ত চৌহালী।’ বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বেকায়দায় পরে উপজেলা প্রশাসন। এরপর তারা তৎপর হলে বেলা ১১টার দিকে গ্রুপ থেকে আপলোডকারীরা ওই প্রশ্নপত্র সরিয়ে ফেলেন। এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার খালিদ মাহমুদ বাদী হয়ে চৌহালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
এ বিষয়ে চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের চৌহালী নামে ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে ব্যবস্থা নিতে থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ায় পরীক্ষায় এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
চৌহালী থানার ওসি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টির তদন্ত চলছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’ তবে ‘আমাদের চৌহালী গ্রুপের’ অ্যাডমিন মনিরুল ইসলাম বলেন, সানজিদা নামে একজন সকাল ১০টা ২০ মিনিটে গ্রুপে এসএসসির ইংরেজি প্রথমপত্রের প্রশ্ন পোস্ট করেন। পরে তিনি নিজেই তার পোস্ট ডিলিট করে দেন। সানজিদা নামের আইডিটা কার তা এখনো জানতে পারিনি। আইডি ভুয়াও হতে পারে। তবে বিষয়টি বিব্রতকর।
ফেসবুকে প্রশ্নফাঁস হওয়া নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বোর্ডের রাজশাহী বিভাগের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চৌহালীতে এসএসসির ইংরেজি প্রথমপত্রের প্রশ্ন আপলোড করার বিষয়টি শুনেছি। তবে পরীক্ষার হল বা কেন্দ্র থেকে আপলোড করেছে বা তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা এখনো জানায়নি। পরীক্ষার হল বা কেন্দ্রের কেউ জড়িত থাকলে বোর্ড, অন্যথায় স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। এতে পরীক্ষায় কোনো প্রভাবই পড়েনি।’
বই দেখে শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষা : টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা খোলামেলা বই দেখে উত্তর লিখছে এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। কালিহাতীর নারান্দিয়া ইউনিয়নের তোফাজ্জল হোসেন তুহিন কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোকেশনাল শাখার শিক্ষার্থীরা বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় শিক্ষকদের সরাসরি সহায়তায় বই দেখে পরীক্ষা দেয় এমন দৃশ্যই উঠে আসে ভিডিওতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায় এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার প্রশ্নে ভিডিওটি ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে।
এ বিষয়ে কেন্দ্র সচিব তোফাজ্জল হোসেন তুহিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, ভিডিওটি অনেক আগের। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সঞ্জয় কুমার মহন্ত জানিয়েছেন, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরপরই কালিহাতীর ইউএনওকে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র পরিদর্শনে পাঠানো হয়েছে। তখন তিনি বলেন, যেসব শিক্ষক ওইদিন কক্ষে দায়িত্বে ছিলেন, তাদের চলমান পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন আদান-প্রদানের অভিযোগে দুজনের সাজা : নরসিংদীর শিবপুরে এসএসসি পরীক্ষায় মোবাইল ডিজিটাল ডিভাইসে প্রশ্নপত্র আদান-প্রদানের অভিযোগে মোবাইল কোর্টে দুজনকে ১৫ দিনের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার উপজেলার লাখপুর শিমুলিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসির বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় এ ঘটনাটি ঘটেছে।
অভিযুক্তরা হলো উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের মানিকদী গ্রামের কবির উদ্দিনের ছেলে দিনার আহমেদ (২০) ও শিমুলিয়া গ্রামের মজিবুর রহমানের ছেলে রিফাত হোসেন (১৯)।
জানা যায়, পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের বাইরে ডিজিটাল ডিভাইস মোবাইলের মাধ্যমে তারা পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র আদান-প্রদান করছিল। এ সময় মোবাইল কোর্টের হাতে আটক হয় তারা। আটকদের মোবাইল ডিভাইসে যাচাইয়ে সত্যতা পাওয়ায় তাদের মোবাইল কোর্ট ১৫ দিনের সাজা প্রদান করে। এ ব্যাপারে লাখপুর শিমুলিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার ভেন্যু কেন্দ্রের সহকারী কেন্দ্র সচিব ও প্রধান শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান জানান, পরীক্ষার কেন্দ্রের ভেতরে কোনো সমস্যা হয়নি। যা হয়েছে কেন্দ্রের বাইরে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বাঁশখালীতে যুবক গ্রেপ্তার : চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার উপজেলার পুকুরিয়া এলাকায় থেকে তাকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম আদিব (২৫)। গ্রেপ্তারকালে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের বিভিন্ন নমুনা পাওয়া যায়। এর আগে বাঁশখালীতে এক যুবকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কেনার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করছে, এমন সংবাদে গোয়েন্দারা অনুসন্ধানে নামে। একপর্যায়ে চক্রের সন্ধান পায় তারা।
এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জামশেদুল আলম বলেন, ‘ভুয়া প্রশ্নপত্র বানিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল ওই যুবক। বিভিন্নজন থেকে পরীক্ষার প্রশ্ন বলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে এই প্রথম এসএসসি পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহ করে তা অর্থের বিনিময়ে বিক্রয়ের চেষ্টা করেছে বলে স্বীকার করেছে।’
প্রশ্নফাঁস বন্ধে বিশেষজ্ঞদের মতামত : বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি এখন আর নতুন কিছু নয়। তবে দেরিতে হলেও প্রশ্নফাঁসের বিষয় নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাই। তবে এখন প্রশ্নফাঁসের ধরন পাল্টে গেছে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে যদি প্রশ্ন ফেসবুকে এসে যায় তাহলে এটাও প্রশ্নফাঁসের অংশ। আর এর সমাধান তৈরি করেন শিক্ষকরা। তাই পরীক্ষা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ বিষয়গুলো নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে বলেন তিনি। আর যারা পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নফাঁস করছেন তারা কোনো না কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কর্মচারী। তাই যেখান থেকেই প্রশ্নফাঁস হোক না কেন সেখানের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে বিশেজ্ঞরা মনে করেন।
প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ৩৩ দিন বন্ধ কোচিং সেন্টার : প্রশ্নফাঁস ও গুজবরোধে পরীক্ষা শুরুর দিন গত ১০ এপ্রিল থেকে আগামী ১৩ মে মোট ৩৩ দিন সব ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়। এ ছাড়া পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর সরবরাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও এই কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরা অনলাইনে সক্রিয় রয়েছেন। প্রতিটি পরীক্ষার শর্ট সাজেশন ও পরীক্ষা শুরুর পরে তার সমাধান বিশ্লেষণ করছেন অনলাইনে।
