দীর্ঘ বিতর্ক আর কঠিন দর-কষাকষির পর দুবাই কপ সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব এড়াতে তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়েছে। কপ সম্মেলনের ইতিহাসে এবারই প্রথম বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য প্রধানত দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সে কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আয়োজিত কপ সম্মেলনের ঘোষণাকে বলা হচ্ছে ঐতিহাসিক। গতকাল বুধবার এসংক্রান্ত চুক্তিতে প্রায় ২০০ দেশের সম্মতির মধ্য দিয়ে পর্দা নেমেছে ঘটনাবহুল কপ২৮-এর।
গত ৩০ নভেম্বর সম্মেলন শুরুর দিন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল গঠনের ব্যাপারে দেশগুলো একমত হয়েছিল। সেটিও ছিল জলবায়ু সম্মেলনের এক মাইলফলক। এরপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থা নেওয়া, অভিযোজন, জলবায়ু অর্থায়নসহ নানা ইস্যুতে সপ্তাহ দুয়েক ধরে বিশ্বের দেশগুলোর প্রতিনিধিরা তাঁদের মত দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ মোকাবেলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে সতর্কও করেছেন তাঁরা।
বিপন্ন ধরিত্রীকে নিয়ে উদ্বেগ চরমে ওঠায় এবার বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ ও আন্দোলনকর্মীর নজর ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির দিকে। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, বিশ্বনেতারা তেল, গ্যাস ও কয়লার ব্যবহার দ্রুত পুরোপুরি বন্ধে একমত হবেন কিংবা ধাপে ধাপে বন্ধের (ফেজ আউট) একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করে দেবেন। কিন্তু তা যাতে না হয়, সে জন্য তৎপর ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক-সরবরাহকারী বিভিন্ন দেশ এবং এই খাতসংশ্লিষ্ট লবি। কপ২৮-এর আয়োজক সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী।
আর সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট সুলতান আল জাবের স্বয়ং জাতীয় এক তেল কম্পানির শীর্ষ কর্তা। এ বিষয়টি নিয়েও কথা কম হয়নি।
সম্মেলনের প্রথম খসড়ায় জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কিছু বলা না হওয়ায় ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি হয়েছিল, বিশেষ করে খুদে দ্বীপরাষ্ট্রসহ বিপন্ন দেশগুলোতে। বড় দূষণকারী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউসহ অনেক উন্নত দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের পক্ষে জোরালো ভাষায় দাবি জানায়। দুই পক্ষের বিভেদ কমিয়ে আনতে সম্মেলনের মেয়াদ এক দিন বেড়ে যায়।
মঙ্গলবার তা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় সারা রাত আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত গতকাল সকাল পর্যন্ত গড়ায়। সকালে কপ প্রেসিডেন্ট সুলতান আল জাবের চুক্তির নতুন এক খসড়া হাজির করেন। এতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে দূষণমুক্ত জ্বালানির ব্যবহার এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’ (যতটা কার্বন নিঃসৃত হবে ততটাই সরিয়ে নেওয়া) লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর অঙ্গীকার ছিল। ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোসহ কিছু দেশ এই খসড়ার ভাষা নিয়ে খানিকটা আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়। সম্মেলনস্থলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে স্বস্তি, এমনকি কিছুটা উচ্ছ্বাসও।
কপের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমন কোনো চুক্তি হলো, যার মাধ্যমে তেল (পেট্রল, ডিজেল) যুগের চূড়ান্ত সমাপ্তি হতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত মিলল। এই চুক্তি নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদেরও এ সংকেত দিল যে বিশ্ব জীবাশ্ম জ্বালানির আধিপত্য ভাঙতে এখন ঐক্যবদ্ধ।
চুক্তির মূল বিষয়গুলো
নতুন চুক্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসতে ‘অন্তর্বর্তীকালীন জ্বালানি’ হিসেবে গ্যাস ও কার্বন দূষণ কমানো কষ্টসাধ্য এমন খাতে কার্বন নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ (সিসিএস) প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের কিছু ‘ত্রুটিবিচ্যুতি’ নিয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা গতকাল খোলাখুলি আপত্তিও তুলেছেন। তাঁদের কথা, জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহারেও বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়বে। তাই এর বদলে সরাসরি নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করলে চুক্তিটি আরো স্পষ্ট বার্তা দিত। আবার সিসিএসের মতো এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয় এমন প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়েও নাখোশ তাঁরা। তেল-গ্যাস-কয়লা যাদের বড় ব্যবসা সেই সব রপ্তানিকারক দেশ তথা জীবাশ্ম জ্বালানি লবি বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। বাস্তবে এগুলোর কার্যকারিতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রথামতো ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত সমঝোতা’ নামের চুক্তিটিতে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ তিন গুণ এবং বিদ্যুত্শক্তির সক্ষমতা দ্বিগুণ করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তবে এই চুক্তিতে অর্থায়ন ও অভিযোজন বা মানিয়ে নেওয়ার মতো জরুরি বিষয়গুলো ততটা গুরুত্ব পায়নি। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা কিংবা অভিযোজনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর যে অর্থ লাগবে, তা কিভাবে মিলবে সে বিষয়েও চুক্তিতে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
সম্মেলন সফল, দাবি আমিরাতের
কিছু সমালোচনা, কথিত সীমাবদ্ধতা আর প্রশ্ন সত্ত্বেও এবারের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলনকে সফল বলেই মনে করছে আয়োজক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত।
কপ২৮-এর প্রেসিডেন্ট সুলতান আল জাবের সর্বশেষ চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অবশ্য এও বলেছেন, চুক্তির সত্যিকারের সফলতা নির্ভর করছে এর বাস্তবায়নের ওপর।
মোটের ওপর একমত অন্যরাও
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে কাজ শুরুর স্পষ্ট প্রতিশ্রুতিসংবলিত এই চুক্তিকে বড় সফলতা মানছে অনেক দেশই। তারা বলছে, কয়েক দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চললেও এবারই তা মোকাবেলায় কার্যকর কিছুর সূচনা হলো। ‘জীবাশ্ম জ্বালানি পরিত্যাগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এমন স্পষ্ট চুক্তিতে এই প্রথমবার একমত হলো বিশ্ব,’ বলেছেন নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস্পেন বার্থ আইদে।
শুরু থেকেই পাল্টাপাল্টি
এবারের সম্মেলনের শুরু থেকেই শতাধিক দেশ কপ২৮-এর চুক্তিতে যেন কড়া ভাষায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধের বিষয়টি থাকে, তার জন্য তদবির করছিল। তাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল তেল উৎপাদক দেশগুলোর জোট ওপেক। তাদের যুক্তি ছিল, জীবাশ্ম জ্বালানিকে ছাড় দিয়েও কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো সম্ভব। দুই পক্ষের এই বিরোধের কারণেই সম্মেলন নির্ধারিত দিনে শেষ করা যায়নি।
নতুন চুক্তিতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোট এওএসআইএস। তাদের পক্ষের প্রধান আলোচক অ্যান রাসমুসেন আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির বিরোধিতা না করলেও বলেছেন, নতুন চুক্তিটি উচ্চাভিলাষশূন্য।
অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক সৌদি আরবের এক প্রতিনিধিও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘উৎস যা-ই হোক, আমাদের অবশ্যই নিঃসরণ কমানোর সব সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রীর জলবায়ুবিষয়ক দূত সাবের হোসেন চৌধুরী চুক্তির ভাষাকে স্বাগত জানালেও বলেছেন, ‘সব মনমতো হয়েছে এমন নয়। কিন্তু এই চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। আমি নিশ্চিত, এই চুক্তির নানা বিষয় নিয়ে আরো আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু এখান থেকে আমরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে যেতে পারব।’
আগামী বছর আজারবাইজানের বাকুতে বসবে জলবায়ু সম্মেলনের পরের আসর।
