প্রযুক্তিবিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নতুন চ্যাটবট ‘চ্যাটজিপিটি’। আগ্রহ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশিদের মধ্যেও। এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, এর সুবিধা-অসুবিধা কী, জীবনযাপনে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে ইত্যাদিও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ‘চ্যাটজিপিটি’ নিয়ে।
চ্যাটজিপিটি চালু করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ‘ওপেনএআই’। গত নভেম্বরে চালুর পরই বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে এই প্রযুক্তি। বলা হচ্ছে, ২০২৩ সাল হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারিক প্রসারের বছর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বাংলাদেশে আইটি খাতের কিছু ব্যবসা দখল করে নিতে পারে। কৌশলগতভাবে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে না শিখলে অনেক ফ্রিল্যান্সারের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
‘জেনারেটিভ প্রি-ট্রেন্ড ট্রান্সফরমার’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো চ্যাটজিপিটি। এখানে জেনারেটিভ শব্দের অর্থ হলো তৈরি করা। আর চ্যাটজিপিটিতে ট্রান্সফরমার এমন একটি মেশিন লার্নিং মডেল, যা কোনো কিছুর বিষয়ে সহজেই বুঝতে পারে। চ্যাটজিপিটি হলো আসলে একটি চ্যাটবট যা ‘ওপেনএআই’ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। জিপিটি ৩.৫-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে এটি। এটি এক ধরনের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল।
চ্যাটবট হলো এক ধরনের কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গঠন করা হয়। ফলে কোনো ডিভাইসের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষের মতো করে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে, অর্থাৎ ম্যাসেজের রিপ্লাইও দিতে পারে।
সর্বশেষ এমএলআইভি পালস জরিপ অনুসারে, উন্নত এআই সিস্টেমগুলো ভবিষ্যতে আর্থিক, গণমাধ্যম, আইনি এবং প্রযুক্তি খাতে কিছু মানুষের চাকরি বিকল্প হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চ্যাটজিপিটির বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে গুগল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছিল। চ্যাটজিপিটির সঙ্গে টেক্কা দিতে খুব দ্রুতই পরীক্ষামূলকভাবে ‘বার্ড’ চালু করেছে গুগল। এর কারণ হলো, গুগলের সার্চ ইঞ্জিন যেখানে মানুষকে নানা ধরনের সূত্র ধরিয়ে দিয়েই শান্ত হয়, সেখানে চ্যাটজিপিটি রীতিমতো সাহিত্যের রিভিউ পর্যন্ত করে দেয়।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই জগতে চ্যাটজিপিটি এবং গুগলেরর পর চীনের শীর্ষ জনপ্রিয় সার্চইঞ্জিন বাইদু পিছিয়ে থাকতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে বাইদু ‘আর্নি বট’ নামে নিজস্ব ওপেন এআই চ্যাটবট চালুর ঘোষণা দিয়েছে। আগামী মার্চের মধ্যেই এআই চ্যাটবটটির পরীক্ষা শেষ হবে বলে জানিয়েছে বাইদু।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে আইটি-সম্পর্কিত ব্যবসায় দক্ষ লোকের অভাবের কারণে সেখানে চ্যাটজিপিটি কিছু কাজ নিতে পারে। কারণ এটি অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে সক্ষম।
ডাবলিনভিত্তিক বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল মার্কেটার খালিদ ফারহান বলেন, ‘চ্যাটজিপিটি ইন্টারনেটের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। সুপার আপগ্রেডেড এআই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নতুন কোম্পানিগুলো বড় হতে শুরু করেছে।’
বাংলাদেশে সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার এবং দুই হাজারের বেশি ফার্ম রয়েছে, যারা বিশ্বব্যাপী আইটি এবং আইটি সেবা দিয়ে আসছে। ফারহানের মতে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে, যেখানে অনেক ফ্রিল্যান্সার ডাটা এন্ট্রির মতো নিম্নস্তরের কাজ করে, যাদের সামান্য মস্তিষ্কের শক্তি প্রয়োজন, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের যেসব ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তিতে মানিয়ে নেবে, তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে, নইলে প্রতিযোগীদের কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হবে।’
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ‘ব্রেইন স্টেশন ২৩’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাইসুল কবির বলেন, ‘চ্যাটজিপিটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী প্রযুক্তি। আমাদের এখন যা দরকার তা হলো, প্রযুক্তির ব্যবহার জানা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষদের যুক্ত করা। তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে এখনই আমাদের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি মনে করেন, ‘এটা প্রতিষ্ঠানের মধ্যম পর্যায়ের কর্মীদের জায়গা নিতে পারবে না, বরং আমরা গড়পড়তা মানুষের কাছ থেকে এখন উচ্চ দক্ষতা পাব।’
বিভিন্ন ধরন কমে আসবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যেসব বৈশ্বিক কোম্পানির সঙ্গে কাজ করি, তাদের মধ্যে একটি কোম্পানি ইতোমধ্যে আমাদের অ্যাপ্লিকেশনগুলো চ্যাটজিপিটিতে যুক্ত করতে বলেছে। আমরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী এটি যুক্ত করছি। চ্যাটজিপিটির জ্ঞান সীমিত, তাই নিখুঁত আউটপুটের জন্য মানুষের স্পর্শ এখনো প্রয়োজন।’
বিডিজবস-এর সিইও এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘চ্যাটজিপিটির মতো একটি সক্ষম প্রযুক্তির মধ্যে এআই, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং ইত্যাদি জড়িত। আমরা ইন্টারনেটে নতুন নতুন এআই প্রযুক্তির মতো অনেক বিষয়ে পিছিয়ে আছি।’ তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মাধ্যমে আমরা গ্রাহক সেবার মান বাড়াতে সক্ষম হব।’
