বরাদ্দ পেলেও খরচ করতে পারে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন (টিকা) ও কিট-পিপিই কেনার জরুরি দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের তিন হাজার ৪১৫ কোটি টাকা পড়ে আছে। এটি বিশ্বব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের অর্থ। গত অর্থবছর টিকা কেনার প্রকল্পে খরচ হয়েছে মাত্র ১৫০ কোটি ৪২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা বা মোট বরাদ্দের প্রায় ৫ শতাংশ। আর কিট ও পিপিই কেনার প্রকল্পে মাত্র ৬৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বা ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, যথাসময়ে ভ্যাকসিন ক্রয় করতে না পারায় বিশাল অঙ্কের এই অর্থ অব্যয়িত রয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি কম হওয়াতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়ে ব্যবস্থাপনার দিকে এখন বেশি দৃষ্টি দেয়া দরকার। ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ঘটাতে পারলে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহার হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাংক সহায়তাপুষ্ট কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (প্রথম সংশোধন) প্রকল্পটি ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছর দুই মাস মেয়াদে ২০২০ সালের এপ্রিলে অনুমোদন দেয়া হয়। গত অর্থবছরে এই অর্থ খরচ করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পে ভ্যাকসিন কেনা ও আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল দুই হাজার আট শ’ কোটি টাকা।
অন্য দিকে কোভিড-১৯ রেসপন্স ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স শীর্ষক প্রকল্পও ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পে গত অর্থবছর আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৬৭৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। সিএমএসডির মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে টেস্টিং কিট ও পিপিই কেনার কথা এই অর্থ দিয়ে। কিন্তু এক বছরে অর্থাৎ জুন পর্যন্ত খরচ হয়েছে বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ৬৩ কোটি ৯৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। বাকি অর্থ অব্যয়িতই আছে।
চলমান কোভিড-১৯ প্রকল্প প্রস্তাবনা দলিল ও পরিকল্পনা কমিশনের দেয়া তথ্যানুযায়ী, প্রথমে বিদেশী ঋণে এক হাজার ১২৭ কোটি ৫১ লাখ ৬২ হাজার টাকা খরচে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। পরে ভ্যাকসিন কেনার বিষয়টি ওই প্রকল্পে যুক্ত করা হয়। এর জন্য বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ বাড়িয়ে ছয় হাজার ৬১৪ কোটি ১৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা দিচ্ছে। এখানে ভ্যাকসিনের জন্য ৫০ কোটি ডলার। ভ্যাকসিন কেনা, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণে খরচ ধরা হয়েছে চার হাজার ২৩৬ কোটি ৪২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। প্রকল্পের ব্যয় বিভাজনে দেখা যায়, মোট জনশক্তির ২০ শতাংশ বা তিন কোটি ৪৪ লাখ জনের জন্য দুই ডলার দামে দু’টি করে ডোজ কিনতে খরচ এক হাজার ১৭৫ কোটি ১০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা বা ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এখানে ছয় কোটি ৯১ লাখ ২৫ হাজার ডোজ কেনা হবে। আর প্রাপ্তি সাপেক্ষে ১১ শতাংশ বা এক কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষের জন্য ৬ থেকে ১০ ডলার দামে তিন কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ডোজ কেনা হবে; যাতে খরচ হবে দুই হাজার ২৬২ কোটি ৭ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বা ২৬ কোটি ৬১ লাখ ডলার।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ১১ শতাংশের জন্য যে ভ্যাকসিন আনা হবে তাতে শিপিং খরচ ভ্যাকসিন মূল্যের ৩ শতাংশ ধরে ৬৭ কোটি ৮৬ লাখ ২২ হাজার টাকা বা ৭৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আর সবগুলো ভ্যাকসিন পরিবহন ও অপারেশনে খরচ হবে ৩৮৪ কোটি ৬২ লাখ ৮ হাজার টাকা বা ৪ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ভ্যাকসিন সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় ৩৪৬ কোটি ৭৬ লাখ ৬১ হাজার টাকা বা ৪ কোটি ৮ লাখ ডলার।
এদিকে, চলতি আগস্ট মাসের শুরুতেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পর্যালোচনা সভায় জানানো হয়, গত অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে করোনা ভ্যাকসিন কেনার জন্য বরাদ্দ ছিল তিন হাজার ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। গত জুন পর্যন্ত এক বছরে খরচ হয়েছে দেড় শ’ কোটি ৪২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা; যা বরাদ্দের মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এই অর্থ ভ্যাকসিন কেনা এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য ক্রয় বাবদ রাখা ছিল। কিন্তু এই অর্থ খরচ ছিল ভ্যাকসিন প্রাপ্তির ওপর নির্ভরশীল। যথাসময়ে ভ্যাকসিন ক্রয় করতে না পারায় এই বিশাল অঙ্কের অর্থ অব্যয়িত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (পরিকল্পনা) ওই সভায় জানান, প্রকল্প পরিচালক অসুস্থ বা করোনা আক্রান্ত থাকায় প্রকল্পের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ চলমান রাখার স্বার্থে একজন উপ-পরিচালককে আর্থিক ক্ষমতা দিয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব জানান, প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শেষ করার জন্য মনিটরিং জোরদার করতে হবে। যথাসময়ে প্রকল্প সমাপ্ত করা না গেলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়-দায়িত্ব নিরূপণ করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সভায় অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রকল্পের সব কেনাকাটা পিপিআর অনুযায়ী করার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কোনো ক্রয় করা যাবে না। তিনি কোভিড প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো জোর দেয়ার নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্টদের। পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য মোসাম্মাৎ নাসিমা বেগমের সাথে গতকাল বুধবার এ বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি অবগত না। প্রকল্প সংশোধন করতে এলে তখন আমরা সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করি।
গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে গত রাতে কথা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারণেই এত টাকা পড়ে আছে। তারা টিকা ও কিট কিনতে পারছে না। আমরা তাদের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ইচ্ছা করেই তারা আমাদের হয়রানি করছে। আমরা তাদেরকে কোনো ঘুষ দিতে পারব না। তিনি বলেন, আমরা তাদেরকে বলেছিলাম প্রতিটি সাড়ে ৭ ডলার। কিন্তু তারা চীন থেকে ১২ ডলারে টিকা আনছে। আমরা বলেছিলাম ১০ দিনে ৫০ লাখ টিকা সরবরাহ করতে পারব।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের সাথে গতকাল কথা হলে তিনি বলেন, এই অর্থ ব্যবহার করতে না পারাটা ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের সমস্যা। কেন তারা বাস্তবায়ন করতে পারছে না? এখানে কি অবহেলা, অদক্ষতা, নাকি সমন্বয়হীনতা? সেটা চিহ্নিত করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের এই প্রকল্পের টাকায় অর্থ ছাড় না হলে তার জন্য কোনো চার্জ দিতে হবে না। তবে বিদেশী ঋণের টাকা এভাবে ব্যবহার করতে না পারাটাও ভালো দৃষ্টিতে দাতারা দেখবে না।
