দিল্লি ও মালের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এবার স্বাস্থ্য খাতে ভারতের ওপর ‘নির্ভরশীলতা’ কাটানোর নতুন উদ্যোগ নিয়েছে মালদ্বীপ।
সম্প্রতি চীন সফর থেকে ফিরে এসে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু ভারতকে ১৫ মার্চের মধ্যে মালদ্বীপ থেকে সেনাসদস্যদের সরিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানায়। এছাড়া তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে দৃশ্যত ভারতের দিকে ইঙ্গিত করে হুঁশিয়ারির সুরে জানান, ক্ষুদ্র দেশ হলেও মালদ্বীপকে ধমকানোর জন্য কোনো দেশকে ছাড়পত্র দেয়নি তার সরকার।
গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পাওয়ার আগেও মালদ্বীপের রাজনীতিতে ‘চীনপন্থী’ রাজনীতিক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন মুইজ্জু। নির্বাচনী প্রচারে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহম্মদ সোলির ভারতকে অগ্রাধিকার দেয়ার নীতি ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ থেকে সরে এসে ‘ইন্ডিয়া আউট’-এর পক্ষে কথা বলেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার পূর্বসুরীদের পথ অনুসরণ করে প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে আসেননি তিনি। নির্বাচনী প্রচারে যে ভারত -নির্ভরতা কমানোর ডাক দিয়েছিলেন মুইজ্জু, প্রশাসক হয়েও তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবার ইঙ্গিত দেন।
এত দিন মালদ্বীপের বাসিন্দারা স্বাস্থ্য পরিষেবা পেতে মূলত ভারত এবং শ্রীলঙ্কার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। মালদ্বীপ সরকার বাসিন্দাদের জন্য বিনামূল্যে যে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে থাকে, তাতে এত কাল পর্যন্ত রোগীদের ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যেতে বলা হতো।
কিন্তু গত শনিবার মুইজ্জুর সচিবালয়ের তরফে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, এবার থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং থাইল্যান্ডেও স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবেন মালদ্বীপের বাসিন্দারা।
সংবাদ সংস্থা এপি মুইজ্জুর সচিবালয়কে উদ্ধৃত করে জানায়, মালদ্বীপ এবার সরাসরি আমেরিকা এবং ইউরোপের ওষুধ প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে ওষুধ আমদানি করবে। বিবৃতিতে কোনো দেশের নাম না করেই বলা হয়, কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা কাটাতেই এই সিদ্ধান্ত।
২০২২ সালের পর্যটন-সংক্রান্ত একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর ভারতে আসা বিদেশীদের মধ্যে ১.৭ শতাংশ মালদ্বীপের বাসিন্দা। আবার ভারতে আসা মালদ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই এখানে চিকিৎসা পরিষেবা নিতে আসেন। এবার বিপুল জনস্রোতকে অন্য দেশে পাঠাতে চায় মালদ্বীপ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের জোগান নিশ্চিত করতে এত দিন ভারতের ওপরেই ভরসা রাখত মলদ্বীপ। কিন্তু এই বিষয়েও ভারত নির্ভরতা কাটাতে সাম্প্রতিক চীন সফরে সে দেশের সাথে খাদ্য নিরাপত্তার চুক্তি করেছেন মুইজ্জু।
মনে করা হচ্ছে যে এবার চাল, চিনি, গম ইত্যাদি খাদ্যবস্তুর সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে নয়াদিল্লি নয়, বেইজিংয়ের ওপরেই নির্ভর করবে মালদ্বীপ। গত শনিবার মুইজ্জুর সচিবালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মালদ্বীপে খাদ্যবস্তু আমদানি করার ক্ষেত্রে একটা দেশের ওপর নির্ভরতা বন্ধ করতে চায় সরকার।
এই ‘একটা দেশ’ যে ভারত, তো বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধিমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৫ সালের পর থেকে ক্রমশ মালদ্বীপে খাদ্যবস্তু রফতানিক পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে ভারত। কিন্তু এবার সেই পরিমাণ কমার ইঙ্গিত মিলছে।
এত দিন মালদ্বীপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এবং শিল্পক্ষেত্রের নিরাপত্তা জোগানোর জন্য এবং প্রান্তবর্তী দ্বীপগুলোতে ত্রাণ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেয়ার জন্য ৭৭-৮০ জন ভারতীয় সেনাসদস্য সে দেশে ছিল। এবার চীনা সেনাবাহিনীর একাংশকে একাজে মোতায়েন করতে পারে মুইজ্জুর সরকার।
ভারতের বিরুদ্ধে মালদ্বীপের সার্বভৌমত্ব খর্ব করার অভিযোগ তুললেও মুইজ্জুর প্রশাসন কিন্তু সম্প্রতি সে দেশে চীনের একটি নজরদার জাহাজকে প্রবেশাধিকার দিয়েছে। সূত্রের খবর, কলম্বো বিমানবন্দরকে পোতাশ্রয় হিসাবে ব্যবহার করতে না-পেরে মালদ্বীপের কোনো বন্দরে ভিড়তে চলেছে সেটি।
সাম্প্রতিক চীন সফরের তৃতীয় দিনে গত বুধবার জিনপিংয়ের সাথে রাজধানী বেজিংয়ে বৈঠক করেছিলেন মুইজ্জু। সেখানেই ভারতের সাথে সাম্প্রতিক সংঘাতের আবহে মালদ্বীপের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন চীনা প্রেসিডেন্ট তথা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষনেতা।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে ওই বৈঠকেই বেইজিংকে তাদের ‘পুরনো বন্ধু এবং ঘনিষ্ঠতম সহযোগী’ বলেন মুইজ্জু। দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় আর্থিক এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত কয়েকটি চুক্তি সই হয়। ওই চুক্তিগুলোতে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষাসহ একাধিক ক্ষেত্রে ভারত-নির্ভরতা থেকে বেরোনোর চেষ্টা করা হয় বলে সূত্রের খবর।
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা
