Saturday, August 1, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবর‘মিনিকেট’ নামে ধানের জাত নেই, তবু বাজার সয়লাব চালে

‘মিনিকেট’ নামে ধানের জাত নেই, তবু বাজার সয়লাব চালে

দেশে ‘মিনিকেট’ নামে কোনো স্বীকৃত ধানের জাত নেই। অথচ প্রায় প্রতিটি বাজারেই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া চালের অন্যতম নাম মিনিকেট। একইভাবে ব্রি-৪৯ ধানকে নাজিরশাইল নামেই চালিয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অধিক মুনাফার লোভে সাধারণ মানুষকে ঠকাচ্ছেন তারা।

সূত্র জানায়, সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে একই জাতের ধান থেকে উৎপাদিত চাল ভিন্ন ভিন্ন নামে বিক্রি হচ্ছে। এটার প্রমাণ পাওয়ার পর খাদ্য মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করেছিল। সেখানে চালের বস্তায় ধানের প্রকৃত জাত, উৎপাদনের তারিখ, মিলের নাম-ঠিকানা ও মিলগেট মূল্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে চালকল মালিকদের ১০০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে পরিপত্রটি কার্যত আটকে দেওয়া হয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে অভিযুক্তরা কারাগারে আটক থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ শাখা ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘রাইস মিল (অটোমেটিক ও হাস্কিং) থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহকৃত চালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ মূল্য অবহিতকরণ সংক্রান্ত’ পরিপত্র জারি করে।

সেখানে উল্লেখ করা হয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিদর্শনে দেখা গেছে, একই জাতের ধান থেকে উৎপাদিত চাল বাজারে বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন এবং চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় মিলার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতি নিরসনে চালের প্রতিটি বস্তায় উৎপাদনকারী মিলের নাম, জেলা, উপজেলা, উৎপাদনের তারিখ, মিলগেট মূল্য এবং ধান-চালের প্রকৃত জাত (ভ্যারাইটি) উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে মিল মালিকদের বড় অংশ প্রকাশ্যেই আপত্তি তোলে। তাদের যুক্তি ছিল, তারা ধানের জাত দেখে ধান কেনেন না, ফলে চালের বস্তায় জাত উল্লেখ করাও সম্ভব নয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দপ্তরের কাজ করা কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে জানান, কুষ্টিয়া, শেরপুর, নওগাঁ ও দিনাজপুর অঞ্চলের চালকল মালিকদের পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে পরিপত্রটির বাস্তবায়ন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

একই অভিযোগ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সরেজমিন উইংয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আমার দেশকে বলেন, এই নির্দেশনা ধামাচাপা দিতে এবং মন্ত্রীকে ‘ম্যানেজ’ করতেই সারা দেশের চালকল মালিকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো চালকল মালিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে বছরে মোট চাল উৎপাদন হয় চার কোটি ছয় লাখ ২৯ হাজার টন। ডিএইর হিসাবে উৎপাদন চার কোটি ১৫ লাখ ১৬ হাজার টন। ডিএইর সরেজমিন উইংয়ের হিসাবে উৎপাদনের পার্থক্য প্রায় এক লাখ টন, যা মোট উৎপাদনের ০.২৫ শতাংশ। উৎপাদনের দিক থেকে ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯ এবং ব্রি ধান-৪৯ সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া জাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। অথচ বাজারে এসব জাতের চাল খুব কমই প্রকৃত নামে বিক্রি হয়।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, অটোরাইস মিলে চাল ৫-৭ শতাংশ পর্যন্ত পলিশ করার কথা। কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় অনেক মিলে ১৫-২০ শতাংশ পলিশ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে চালের পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ওজনও কমে যায়। মোটা চাল চিকন করে পরে সেটিই ‘মিনিকেট’, ‘নাজিরশাইল’, ‘কাটারি’, ও ‘জিরাশাইল’সহ বিভিন্ন নামে বাজারজাত করা হয়।

একজন কৃষিবিদ বলেন, মোট উৎপাদিত চার কোটি ছয় লাখ টন চালের প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ চাল অতিরিক্ত পলিশের কারণে অপচয় হচ্ছে।

কৃষিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ সালের দিকে ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে যশোর-কুষ্টিয়া এলাকার কৃষকদের জন্য ধানের বীজ, সার ও কীটনাশকসহ একটি ‘মিনি কিট (Mini Kit)’ বিতরণ করা হয়েছিল। সেই ‘মিনি কিট’ থেকেই ধীরে ধীরে ‘মিনিকেট’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশে এ নামে কোনো নিবন্ধিত বা স্বীকৃত ধানের জাত কখনোই ছিল না।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুল মোমিন আমার দেশকে বলেন, ব্রির উদ্ভাবিত ধানের জাত ১২৭টি। এর মধ্যে ১০টি হাইব্রিড ও ১১৭টি ইনব্রিড উচ্চফলনশীল। কিন্তু ‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধানের জাত নেই। এটি মূলত মোটা চাল অতিরিক্ত পলিশ করে তৈরি করা একটি বাণিজ্যিক নাম।

তিনি আরো বলেন, বাজারে ‘নাজির’ নামে ব্যাপক চাল বিক্রি হলেও প্রকৃত নাজির ধানের উৎপাদন খুবই সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্রি-৪৯সহ অন্যান্য জাত পলিশ করে নাজির নামে বিক্রি করা হয়।

ডিএইর সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ধানের নিবন্ধিত জাত ১২৮টি। এর মধ্যে মিনিকেট নামে কোনো জাত নেই। যারা এই নামে ধান উৎপাদনের দাবি করেন বা চাল বিক্রি করেন, তারা ভুল তথ্য দিচ্ছেন।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ব্রি ধান-২৮ তিন মৌসুম মিলিয়ে প্রায় ৮৯ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়, যেখান থেকে ৪০-৪৫ লাখ টন চাল পাওয়া যায়। একইভাবে ব্রি ধান-২৯ এর উৎপাদন প্রায় ৬৭ লাখ টন ধান, যেখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল উৎপাদিত হয়। অথচ বাজারে এই চালের বড় অংশই মিনিকেট নামে বিক্রি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

একজন কৃষিবিদের মতে, প্রকৃত হিসেবে মিনিকেট নামে চালের উৎপাদন সর্বোচ্চ এক লাখ টনের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে বাজারে বিপুল পরিমাণ মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে, যা প্রমাণ করে এটি কোনো ধানের জাত নয়; বরং বিভিন্ন জাতের চালের বাণিজ্যিক নাম।

কুষ্টিয়ার রাইস মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বাবলু আমার দেশকে বলেন, দেশে ‘মিনিকেট’ নামে নিবন্ধিত বা সরকারি স্বীকৃত কোনো ধানের জাত নেই। মূলত ব্রি-২৯, ৪৯ কিংবা ভারতীয় কিছু সরু ধানকে অতিমাত্রায় (১৫-২০ শতাংশ) পলিশ করে বাজারে ‘মিনিকেট’ নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে চালের প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ নষ্ট হচ্ছে।

তিনি জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫-৭ শতাংশ চাল পলিশের বিধান থাকলেও ক্রেতাদের নজর কাড়তে মিল মালিকরা অনিয়ম করছেন। ফলে চাল চকচকে হলেও মূল ভিটামিন চলে যাচ্ছে কুঁড়ায়। বস্তার গায়ে ধানের আসল জাত ও উৎপাদন তথ্য লেখার সরকারি নির্দেশ থাকলেও বাজারে তার প্রয়োগ নেই।

তবে দিনাজপুরের চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান সরকার বাজারে ‘মিনিকেট’ নামের ধানের চাল বিক্রি নিয়ে প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে নকল চাল বানানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আমার দেশ-এর কাছে তিনি দাবি করেন, ‘মিনিকেট ধান নেই’—এই তথ্যটি সম্পূর্ণ ভুয়া। সরকারি নথি বা গবেষণায় উল্লেখ না থাকলেও স্থানীয় গৃহস্থরা মাঠপর্যায়ে সরাসরি এই চিকন ধানের আবাদ করছেন এবং মিলাররা তাদের কাছ থেকেই এটি কেনেন। অন্য কোনো জাতের ধান (যেমন ২৮ ধান) অতিরিক্ত পলিশ করে মিনিকেটে রূপান্তর করা কোনো মিলারের পক্ষে সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

এছাড়া চালের বস্তায় জাত উল্লেখ করার প্রজ্ঞাপন ধামাচাপা দিতে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও তিনি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। চালের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে অতিমাত্রায় পলিশ করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, সরেজমিনে চালকল ও মাঠ পরিদর্শনে এলেই মিনিকেট ধানের অস্তিত্ব দেখা যাবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকার মূলত আউশ ও বোরো মৌসুমে সিদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহ করে। ধানের নির্দিষ্ট কোনো জাতভিত্তিক চাল সংগ্রহ করা হয় না।

এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাক্ষাৎ দেননি। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জসীম উদ্দিন খান ‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধানের জাত না থাকা সত্ত্বেও বাজারে এ নামে চাল বিক্রির বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। ২০২৪ সালের পরিপত্রের প্রসঙ্গ তোলা হলে তিনি সেটির কপি পাঠাতে অনুরোধ করে বলেন, আমার জানা নেই। প্রজ্ঞাপনটা আমাকে একটু পাঠিয়ে দেন, আমরা দেখব।

কৃষিবিদদের মতে, চালের বস্তায় প্রকৃত ধানের জাত, উৎপাদনের তারিখ, মিলের নাম ও মূল্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা হলে ভোক্তা প্রতারণা অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পলিশের কারণে চালের অপচয় ও পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার প্রবণতাও কমবে। তাদের মতে, সরকার যদি ২০২৪ সালের পরিপত্র কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে, তাহলে ‘মিনিকেট’সহ বিভ্রান্তিকর নামে চাল বিক্রির সুযোগ অনেকটাই বন্ধ হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

fourteen − 2 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য