Saturday, August 1, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরশিল্পে অচলাবস্থা, বিনিয়োগে ভাটা

শিল্পে অচলাবস্থা, বিনিয়োগে ভাটা

জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার, ডলার সংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতায় দেশের শিল্প খাত নজিরবিহীন চাপে পড়েছে। গত এক বছরে আড়াই শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে দেড় লাখের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। উৎপাদন কমেছে প্রায় সব প্রধান শিল্পে, কমছে রপ্তানি আদেশও।

এ অবস্থায় শিল্পে গতি ফেরাতে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। তবে উদ্যোক্তাদের প্রশ্ন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগ কীভাবে আসবে?

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ছোট-বড় মিলিয়ে আড়াই শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেড় লাখের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী সরাসরি কর্মহীন হয়েছেন। চালু থাকা অনেক কারখানাও সক্ষমতার অনেক নিচে উৎপাদন করছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বিক্রি কমে যাওয়ায় অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বলছে, শিল্পে গতি ফেরাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

এ বিষয়ে আমার দেশ-এর প্রশ্নের জবাবে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরির কাজ একসঙ্গে এগোচ্ছে। অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ), স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল, আইএসও ট্যাংকের ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প—সবই সরকারের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ।

তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আমরা বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখছি। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। সে লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ, সরকারি অব্যবহৃত জমিতে পিপিপি মডেলে প্রকল্প, গ্রিড সংযোগ ও শিল্পের জন্য বিকল্প জ্বালানি সমাধান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করছি।

আশিক চৌধুরী আরো বলেন, বাংলাদেশ এখনো একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য। ২০২৫ সালের জন্য বিডার পাইপলাইনে থাকা দেড় বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। আমরা বিনিয়োগকারীদের এমন প্রতিশ্রুতিই দিই, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কোন খাতে, কোথায় ও কী ধরনের জ্বালানি সুবিধার ভিত্তিতে বিনিয়োগ এগোনো যাবে, সেটিও স্পষ্ট করে তুলে ধরা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জিডিপির অনুপাতে ব্যক্তি খাতের মূলধন প্রবাহ দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যার নেতিবাচক ছাপ পড়ছে শিল্পের কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল যন্ত্রপাতি আমদানির বড় পতনে। পাশাপাশি বৈশ্বিক উত্তেজনার মুখে নতুন বিদেশি পুঁজির প্রবাহেও ধস নামায় কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও সামগ্রিক জাতীয় প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখোমুখি।

জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে উৎপাদন শিল্প

দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোয় বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকায় প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় দিনের বড় একটি সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, যেসব কারখানায় ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে মিলছে মাত্র এক থেকে দুই পিএসআই। ফলে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় একদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে সমস্যা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

উৎপাদন কমছে, বাড়ছে লোকসান

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শিল্প উৎপাদন সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ওয়েভিং টেক্সটাইল খাতে উৎপাদন কমেছে ২৯ দশমিক ৩১ শতাংশ, জুট টেক্সটাইলে ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, ওষুধ শিল্পে ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ, সিমেন্ট-লাইম-প্লাস্টার শিল্পে পাঁচ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ১৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। ছোট ও মাঝারি শিল্পেও একই চিত্র। ফিনিশড টেক্সটাইল উৎপাদন কমেছে আট দশমিক ৬৭ শতাংশ, হ্যান্ডলুম টেক্সটাইল পাঁচ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং আয়রন ও স্টিল শিল্পে ছয় দশমিক ৫৭ শতাংশ।

শিল্প খাতে স্থগিত নতুন গ্যাস সংযোগ

দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান ও অনুমোদিত লোড বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই এক চিঠিতে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনকে (পেট্রোবাংলা) বিষয়টি জানিয়েছে। এরপর ১৭ জুলাই পেট্রোবাংলা এ-সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা জারি করে।

জানা গেছে, দেশীয় কূপগুলো থেকে স্বাভাবিক গ্যাস উত্তোলন ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে বর্তমানে চালু থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সক্ষমতাও সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির ভারসাম্য রক্ষা করতেই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হালনাগাদ তথ্যমতে, বর্তমানে বিভিন্ন বিতরণ সংস্থার অধীনে প্রায় এক হাজার ৮৫৭টি আবেদন ঝুলে রয়েছে। বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো কারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নতুন কোনো সুযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে পেট্রোবাংলাকে অবহিত করা হয়েছে।

এরই ভিত্তিতে তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ, কর্ণফুলী, পশ্চিমাঞ্চল ও সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে।

মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তে নতুন গ্যাস সংযোগের প্রত্যাশায় থাকা শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানা এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। এতে ব্যবসা শুরু না হলেও ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বহন করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। আবার কেউ কেউ কারখানার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেও গ্যাসের সরবরাহ ও লোড বৃদ্ধির নিশ্চয়তা না পাওয়ায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারছেন না।

তিন অর্থবছরে ধারাবাহিক পতন

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। পরের বছর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরো নেমে হয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের অনুপাত কমেছে প্রায় দুই শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই অনুপাত ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। এরপর কোভিড-১৯, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির চাপের মধ্যে তা ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হয়েছে।

১৪ বছরে সর্বনিম্ন স্থানে বেসরকারি বিনিয়োগ

বিবিএসের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুসারে, জিডিপি অনুপাতে ব্যক্তি খাতের পুঁজি সংস্থান কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পর থেকে অর্থাৎ গত ১৪ বছরের মধ্যে জিডিপির বিপরীতে এই খাতের অংশ এটাই সর্বনিম্ন। যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, সেখান থেকে ধারাবাহিক পতনে অর্থনীতির সক্ষমতা নিয়ে সংশয় জেগেছে।

নতুন প্রকল্পে ঝুঁকি নিতে নারাজ উদ্যোক্তারা

ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণ, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ডলার বাজারের চাপ, নীতিগত অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ থমকে আছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও অর্থনৈতিক আস্থার সংকট কাটেনি। ফলে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ‘অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার’ প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসিসহ দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠানের কাছে বর্তমানে শিল্পকারখানায় সংযোগের জন্য এক হাজার ৮৫৭টির বেশি আবেদন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান সংযোগ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠান সংযোগের বিপরীতে নির্ধারিত অর্থও পরিশোধ করেছে। তবে প্রক্রিয়া শেষ করেও এখনো গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় উৎপাদনে যেতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, কারখানা চালু করতে না পারলেও ব্যাংকের কিস্তি দিতে হচ্ছে। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে গ্যাসভিত্তিক নতুন শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ আসবে না।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, শুধু গ্যাসের অভাবে রপ্তানিমুখী ৪৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি এজন্য বিগত সরকারের জ্বালানি খাতে লুটপাট ও খাতটিকে বিদেশনির্ভর করে তোলাকে দায়ী করেন।

উচ্চ সুদে বাধাগ্রস্ত শিল্প সম্প্রসারণ

নতুন বিনিয়োগের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। শিল্পঋণের সুদ অনেক ক্ষেত্রে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর সঙ্গে কাঁচামাল, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর হিসাব আর আগের মতো লাভজনক থাকছে না।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, ঋণ নিয়ে প্রকল্প শুরু করলে মুনাফা নিশ্চিত না হলেও সুদ পরিশোধের দায় থাকছেই। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে নতুন প্রকল্পে অর্থ না ঢেলে বিদ্যমান ব্যবসা সচল রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন অনেকে।

ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট

খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, তারল্য সংকট ও ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা শিল্প অর্থায়নকে কঠিন করে তুলেছে। শুধু দীর্ঘমেয়াদি মূলধন নয়, দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় চলতি মূলধন জোগাড় নিয়েও সংশয় রয়েছে। অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্ক অবস্থান নেওয়ায় উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

ড. মিজানুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ব্যাংকিং খাত বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আস্থার সংকটে ভুগছে। অনেক ব্যাংকে অলস টাকা পড়ে থাকলে বিনিয়োগ করতে পারছে না। খেলাপি ঋণের লাগাতার বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে নতুন ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এছাড়া ব্যাংকগুলো মনে করছে, দেশের বড় শিল্পগ্রুপগুলো ঋণ নিচ্ছেই পরিশোধ না করার জন্য। আবার ব্যাংকের উচ্চ সুদের কারণে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে যাচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। ফলে উভয় পক্ষের আস্থার সংকটে বিনিয়োগ থমকে দাঁড়িয়েছে।

ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয়

বাংলাদেশের উৎপাদনশীল শিল্পের বড় অংশ আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ডলার বাজারের অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। ফলে এলসি খোলা, কাঁচামাল সংগ্রহ ও আমদানি ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। মুদ্রার বিনিময়হারের ওঠানামায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার ব্যয় নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলসির মাধ্যমে আমদানি দায় পরিশোধ মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেড়ে ৭০ দশমিক চার বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময় শিল্পের কাঁচামাল আমদানি তিন দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ২৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে এক দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিতে এই পতন বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিদেশি বিনিয়োগেও নতুন পুঁজির ধস

দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা নেট ইকুইটি প্রবাহ ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে সাত কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে নেমেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে যা ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। গত চার প্রান্তিকের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন নতুন বিদেশি মূলধন প্রবাহ।

নতুন ইকুইটি, পুনর্বিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ মিলিয়ে মোট এফডিআই-ও ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে কমে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। তবে বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ বাড়ায় এফডিআইয়ের মোট স্থিতি বা স্টক মার্চ শেষে ২১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন প্রকল্পে ফ্রেশ ইকুইটি প্রবেশের প্রবণতাই বিনিয়োগ পরিবেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।

দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে চাপ

বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু শিল্প স্থাপনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রপ্তানি, রাজস্ব আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। নতুন কারখানা স্থাপন না হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যায়। উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়লে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও দুর্বল হয়।

ইতোমধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া, শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহে সংকোচন ও নতুন বিদেশি পুঁজির প্রবাহে পতন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি অর্থবছরে আমদানি দায় পরিশোধ প্রায় স্থির থাকলেও নতুন এলসি খোলায় সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিছুটা আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বড় মূলধনী বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের সতর্কতা এখনো কাটেনি।

আস্থা ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, উদ্যোক্তারা বিনিয়োগবিমুখ নন; বরং অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামানো, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা এবং কর ও বাণিজ্যনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

eight + nine =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য