‘যতটা স্মরণ করতে পারি, গত ১১ বছরের চাকরি জীবনে আমি নিজের ভাবনার চেয়েও বেশি আপস করেছি। একই সঙ্গে আমরা কোথাও দখলদারির বিরুদ্ধে, আবার কোথাও দখলদারির পক্ষে অবস্থান নিতে পারি না। একই সঙ্গে আমরা কোথাও স্বাধীনতার পক্ষে, আবার কোথাও বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারি না।’
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের চাকরি ছাড়ার চিঠিতে এ কথা লিখেছেন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যশ পল।
পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক-সামরিক ব্যুরোতে পরিচালক ছিলেন তিনি। এই ব্যুরো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেয়।
ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসকে দমনের নামে গাজাসহ ফিলিস্তিনের অন্যত্র অভিযান চালাতে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও অস্ত্র সহযোগিতার বিষয়টি যশ পল এবার আর মেনে নিতে পারেননি। গত ১৮ অক্টোবর পদত্যাগের সময় এর কারণ ব্যাখ্যা করে দুই পৃষ্ঠার চিঠি লেখেন তিনি।
সেখানে যশ পল লিখেছেন, তিনি যতটা মনে করতে পারেন, গত ১১ বছরে তার চেয়েও বেশি আপস করেছেন।
মার্কিন প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ আছে। ১৯৭১ সালে ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড দখলদার পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের নীতির বিরোধিতা করে বার্তা পাঠিয়েছেন। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এক মাস আগে কাবুলের আমেরিকান কূটনীতিকরা মার্কিন নীতির বিরোধিতা করে ওয়াশিংটনে বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
এবারের ভিন্নমত পোষণের বিষয়টি ঘটেছে খোদ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। এ নিয়ে ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরের সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নও উঠেছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলারের জবাব ছিল, নীতির বিরোধিতা প্রকাশের সুযোগ থাকার কথা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন অনেকবার বলেছেন। আত্মরক্ষায় ইসরায়েলের সামর্থ্য বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে।
ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি যশ পল।
কিন্তু ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার চর্চা করতে গিয়ে কত নিরপরাধ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা রাখছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
হামাসের হামলাকে দানবীয় বলে অভিহিত করে যশ পল তাঁর বিদায়ি চিঠিতে লিখেছেন, হামাসের মতো দানব আরো অনেক আছে। ইরান বা হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীর কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। যশ পল লিখেছেন, ‘আমি অন্তরের অন্তস্থল থেকে বিশ্বাস করি, হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল যা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার সমর্থনে ও দখলদারির পক্ষে যা করেছে, তা ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি—উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য আরো দুর্ভোগ ডেকে আনবে। আর এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বিপরীত।’
ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ও কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়াকে পক্ষপাতিত্বমূলক, বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব বলে অভিহিত করেন যশ পল। তিনি লিখেছেন, ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ওই আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত হতাশাজনক। এর মাধ্যমে নিরাপত্তা বা শান্তি আশা করা যায় না।
যশ পল লিখেছেন, বাস্তবতা হলো, এক পক্ষের প্রতি অন্ধ সমর্থন দীর্ঘ মেয়াদে উভয় পক্ষের জনগণের স্বার্থের জন্য ধ্বংসাত্মক। যুক্তরাষ্ট্র আবারও বিগত দশকগুলোর ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছে বলে তাঁর আশঙ্কা।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যশ পাল তাঁর পড়াশোনা ও গবেষণার কথা তুলে ধরেছেন চিঠিতে। তিনি লিখেছেন, তাঁর মাস্টার্সের গবেষণার বিষয় ছিল ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত ও নাগরিক অধিকার। তিনি রামাল্লাহতে থেকেছেন। মার্কিন নিরাপত্তা সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দুই পক্ষের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে গভীর জানাশোনা আছে। যশ পল চিঠিতে লিখেছেন, ‘যাঁরা আমাকে ভালোভাবে চেনেন, তাঁরা জানেন যে আমার মতামত আছে এবং সেগুলো জোরালো।’
যশ পল মনে করেন, বিশ্বের সব জায়গারই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি—দুই পক্ষেরই প্রাপ্য। সন্ত্রাসী যে-ই হোক না কেন, তাদের দ্বারা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা সেই প্রত্যাশার বিরোধী। ইসরায়েলের কিবুত্জ থেকে বা অন্য কোনো গ্রাম থেকে শিশুদের বন্দুকের মুখে অপহরণের ঘটনাগুলো আমাদের প্রত্যাশার শত্রু।
যশ পল লিখেছেন, সম্মিলিতভাবে কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর শাস্তি, তাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া, জাতিগতভাবে নির্মূল করা, দখলদারি ও জাতিবিদ্বেষও ওই জনগোষ্ঠীর বিকাশের শত্রু। এই সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মতো তৃতীয় পক্ষের উচিত বিবদমান কোনো গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের পক্ষে না থেকে সংঘাতের মধ্যে আটকে পড়া লোকদের পক্ষে থাকা।
যশ পলের মতে, মানবাধিকার ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত। মানবাধিকার লঙ্ঘন যে-ই করুক না কেন, তা স্বীকার করার ও জবাবদিহি করার সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের থাকা উচিত।
