সেদিন স্ত্রীকে নিয়ে সুপারশপে গিয়েছিলাম। দরকার ছিল শুকনো খাবার রাখার জন্য কয়েকটা বক্স। আর কিছু না। আমি ধরে নিয়েছিলাম এক থেকে দুই হাজার টাকা সর্বোচ্চ খরচ হবে। কিন্তু কাউন্টারে ফিরে এলাম দশটারও বেশি জিনিস নিয়ে। বিল হলো দশ হাজারেরও বেশি।
বাসায় ফিরে এই বিষয়টা মস্তিষ্কে বেশ চাপ দিল। এটা তো নতুন না। প্রতিবারই হয়। প্রতিবারই একটা দুইটা প্রোডাক্ট নিতে যাই। কিন্তু বেরিয়ের আসি এক্সট্রা কিছু নিয়ে। এক্সট্রা প্রোডাক্ট গুলো আমার এখন না হলেও চলতো।
এই বিষয়টা নিয়ে নিজেদেরই দোষ দিলাম যে, “আমাদের আসলে কন্ট্রোল নেই।” কিন্তু সত্যিই কি ব্যাপারটা তাই? মানে দোষ কি শুধু আমাদেরই? নাকি এর পেছনে কোনো স্ট্রাকচারড ইঞ্জিনিয়ারিং আছে?
আসুন, একটু কল্পনা করি।
ধরুন টাইম ট্রাভেল করে, আমি ১৯১৬ সালের একজন মুদি দোকানের মালিক হয়েছি। আমেরিকার মেমফিস শহরে আমার দোকান। তখনকার দোকান কেমন ছিল জানেন? আপনি ঢুকে কাউন্টারে একটা লিস্ট ধরিয়ে দিতেন। কর্মচারী পেছনের তাক থেকে জিনিসগুলো এনে দিত। আপনি টাকা দিয়ে বেরিয়ে যেতেন।
ব্যস। আপনি শুধু যা চেয়েছেন, তা-ই পেয়েছেন। এখন আমি মালিক হিসেবে বসে হিসাব করছি। মানুষটা দশ টাকার জিনিস চাইল, দশ টাকারই কিনল। আমার দোকানে আরও দুইশ রকম পণ্য আছে, কিন্তু সে তো ওগুলো দেখলই না। কাউন্টারের ওপাশে থাকল সব। বিক্রেতা হিসেবে আমি চাই যে ক্রেতারা আমার অন্যান্য পণ্য গুলোও কিনুক।
কিন্তু সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো, ক্রেতা জানেই না আমার কাছে আর কী কী ধরণের পণ্য আছে।
আমি একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলাম। কাউন্টারটাই তুলে দিলাম। মানুষকে বলব, ভেতরে আসুন। নিজের হাতে দেখুন, নিজে বেছে নিন। আমরা আপনাকে স্বাধীনতা দিচ্ছি। সেল্ফ সার্ভিস নিন আপনারা।
শুনতে কী দারুণ লাগছে, তাই না? গ্রাহকের স্বাধীনতা। কিন্তু আমি তো ব্যবসায়ী। আমি স্বাধীনতা বেচি না। তাই দোকানটা আমি এমনভাবে সাজাব, যাতে ভেতরে ঢুকলে আপনাকে একটা নির্দিষ্ট পথ ধরে হাঁটতেই হয়। এঁকেবেঁকে যাওয়া একটা পথ, যেটা দোকানের প্রতিটা তাকের পাশ দিয়ে যায়।
এক দরজা দিয়ে ঢুকবেন, এক দরজা দিয়ে বেরোবেন। মাঝখানে আমার সব পণ্য দেখতে বাধ্য। আর সবচেয়ে দরকারি জিনিসগুলো, দুধ, রুটি, গোস্ত, মাছ আমি রাখব একদম পেছনে।
কেন? কারণ আপনি তো ওগুলোর জন্যই এসেছেন। ওগুলো সামনে রাখলে আপনি নিয়ে সাথে সাথে বেরিয়ে যাবেন। পেছনে রাখলে আপনাকে হেঁটে যেতে হবে। আর হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়বে আরও অনেক কিছু।
এবার থামুন। এতক্ষণ যা পড়লেন, ওটা আমার কল্পনা ছিল। কিন্তু ঘটনাটা কল্পনা না।
১৯১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। আমেরিকার টেনেসি স্টেইটের মেমেমফিস শহর। ‘ক্ল্যারেন্স সন্ডার্স’ নামে এক ভদ্রলোক খুললেন পৃথিবীর প্রথম সেলফ-সার্ভিস মুদির দোকান।
নাম “পিগলি উইগলি।”
দোকানে ঢোকার মুখে টার্নস্টাইল এন্ট্রি। ভেতরে এঁকেবেঁকে যাওয়া একমুখী পথ। দরকারি জিনিসগুলো একদম পেছনে। শিশুদের পণ্য গুলো ছোট র্যাকে।
এমন ইউনিক দোকান সে সময়ের মানুষদের মধ্যে ব্যপক সারা ফেলেছিল। ব্যবসায় পেয়েছে দারুণ লাভ।
যেহেতু সন্ডার্স সে সময়ে এই টাইপের উদ্ভাবন প্রথম করেছিল, এজন্য পরের বছর সে নিজেই এটার পেটেন্ট নিল সরকারের কাছে থেকে। পেটেন্ট (Patent) নেওয়া মানে হলো নিজের কোনো নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের ওপর সরকারের কাছ থেকে একটি আইনি বা একচেটিয়া অধিকার লাভ করা।
পেটেন্টের আবেদনপত্রে তিনি নিজের হাতে লিখেছিলেন, এই ব্যবস্থায় ক্রেতা নিজেই নিজের সেবা করতে পারবে, আর সেটা করতে গিয়ে দোকানের সমগ্র পণ্যসম্ভার দেখতে বাধ্য হবে।
“বাধ্য হবে।”
শব্দটা আমি লিখি নি। তাঁর নিজের। সরকারি নথিতে লেখা। মানে আপনি যেটাকে “স্বাধীনভাবে ঘুরে দেখা” ভাবেন, সেটা আসলে ডিজাইন করা বাধ্যবাধকতা।
আর একটা তথ্য শেয়ার করি।। সন্ডার্সের এই মডেলে দোকানে চুরি বেড়ে গিয়েছিল, কারণ পণ্য এখন সবার হাতের নাগালে। কিন্তু হিসাব করে দেখা গেল, চুরির ক্ষতির চেয়ে অপরিকল্পিত কেনাকাটার লাভ অনেক বেশি।
তাই এই ব্যবস্থাটা টিকে গেল।
গল্পটা এখানেই শেষ না। বিশ বছর পর আরেকজন এলেন।
১৯৩৭ সাল। ওকলাহোমা শহর। সিলভান গোল্ডম্যান নামে এক দোকান-মালিক একটা সমস্যা লক্ষ্য করলেন। মানুষ হাতে ঝুড়ি নিয়ে ঘুরত। ঝুড়ি ভারী হয়ে গেলেই তারা কেনা বন্ধ করে কাউন্টারের দিকে হাঁটা দিত। তিনি নিজেই বলেছিলেন, ঝুড়ি ভরে গেলে বা ভারী হয়ে গেলে মানুষের কেনাকাটা থামিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল।
সমস্যাটা তাহলে কী? ঝুড়ির বোঝা।
তাই তিনি একজন মিস্ত্রি ডাকলেন। একটা ভাঁজ করা চেয়ারের ওপর দুটো ঝুড়ি বসিয়ে চাকা লাগিয়ে দিলেন। আর এর থেকে জন্ম নিল “শপিং কার্ট”।
এখন আর হাত ব্যথা করে না। এখন আর ওজন টের পাওয়া যায় না। এখন আপনি ততক্ষণ কিনতে পারবেন, যতক্ষণ কার্ট ভরে না। আর কার্টগুলো বড়, বেশ বড়।
এখানেও সাইকোলজিক্যাল ডিজাইন আছে। একটা খালি জায়গা মানুষের মনে তাগিদ তৈরি করে। এটা ভরতে হবে। একটা লজ্জাবোধও কাজ করে। এতবড় কার্ট নিয়ে মাত্র দুইটা পণ্য?
এবার আজকের সুপারশপটার কথা ভাবুন। যেখানে আপনি গতকালও গিয়েছিলেন। দরকারি জিনিসগুলো কি সামনে ছিল, নাকি পেছনে? ক্যাশ কাউন্টারের লাইনে দাঁড়িয়ে আপনার চোখের সামনে কী কী সাজানো ছিল? চকলেট? চুইংগাম? ছোট ছোট জিনিস, যেগুলো ভাবতে হয় না, শুধু হাত বাড়ালেই হয়? আপনার সন্তানের চোখের উচ্চতায় কোন জিনিসগুলো রাখা ছিল? সবই সাজানো। একটাও এলোমেলো না।
তার মানে কী দাঁড়াল?
আপনি যে দশটা বাড়তি জিনিস নিয়ে ফিরলেন, সেটা আপনার দুর্বলতা না। সেটা কারও সাফল্য। একশো বছর ধরে হাজার হাজার মানুষ গবেষণা করে, পরীক্ষা করে, রেজাল্ট দেখে এই ব্যবস্থাটা বানিয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে না, আপনার স্বভাবের সাথে মিলিয়ে।
আপনি একা একটা সুপারশপে ঢোকেন। আর সুপারশপটা দাঁড়িয়ে আছে একশো বছরের গবেষণা নিয়ে। এই লড়াইটা সমান না।
আর এখানেই কুরআনের একটা সূরা মনে পড়ে যায়। খুব ছোট একটা সূরা, কিন্তু গায়ে কাঁটা দেয়।
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। যতক্ষণ না তোমরা কবরে গিয়ে পৌঁছো।”
(সূরা আত-তাকাসুর, ১০২:১-২)
শব্দটা খেয়াল করুন। “মোহাচ্ছন্ন।” আল্লাহ বলেননি সম্পদ হারাম। তিনি বলেছেন, বেশি বেশি জমানোর প্রতিযোগিতাটা আপনাকে ভুলিয়ে রাখে। কী ভুলিয়ে রাখে? আসল কাজটা। আসল গন্তব্যটা। আর দেখুন, এই ভোলানোর কাজটাই তো একটা গোটা শিল্প পেশা হিসেবে করছে।
আল্লাহ আরও বলেছেন,
“খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।”
(সূরা আল-আরাফ, ৭:৩১)
চৌদ্দশ বছর আগের কথা। যখন সুপারশপ ছিল না, কার্ট ছিল না, ক্যাশ কাউন্টারের পাশে চকলেট ছিল না।
তবু সতর্কবার্তাটা এসেছিল। কারণ সমস্যাটা দোকানে না। সমস্যাটা মনে।
তাহলে আমরা কী করব? সুপারশপে যাওয়া বন্ধ করব?
না। এটা বাস্তব সমাধান না। শুধু একটা কাজ করুন। যাওয়ার আগে লিস্ট বানান। আর ফিরে এসে মিলিয়ে দেখুন। লিস্টে যা ছিল না, সেগুলো কেন এলো?
উত্তরটা খুঁজতে খুঁজতেই আপনি ব্যবস্থাটা চিনে ফেলবেন।
আর একবার চিনে ফেললে, ফাঁদটা আর কাজ করে না। কারণ ফাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আপনার অজ্ঞতা।
আল্লাহ আমাদের প্রয়োজন আর লোভের পার্থক্য বোঝার তাওফিক দিন। আর যে হাত আমাদের অজান্তে আমাদের ইচ্ছা তৈরি করে দিচ্ছে, সেই হাতটা চিনে নেওয়ার বিবেক দিন।
আমীন। ![]()
