২৭ রজব তথা ২৬ রজব দিবাগত রাতে পবিত্র মিরাজ। এই রাতে রাসুল (সা.) পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদে আকসা হয়ে আল্লাহপাকের সান্নিধ্যে গমন করেন। মিরাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ ওপরে আরোহণ করা, ঊর্ধ্বগমন করা ইত্যাদি। পবিত্র মক্কায় মসজিদুল হারাম থেকে বিদ্যুতের চেয়েও দ্রুতগতিসম্পন্ন বাহন (বোরাক) সহযোগে রাসুল (সা.) প্রথমে জেরুজালেমে মসজিদে আকসায় যাত্রা বিরতি দেন।
রাসুল (সা.) ঊর্ধ্বাকাশে গমনের আগে এখানে নবী-রাসুলদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। অতঃপর অলৌকিক পাথর হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন।
আমরা পত্রপত্রিকায়, ক্যালেন্ডারে আট ভাঁজে গোলাকৃতির সোনালি আবরণে এক গম্বুজে এ মসজিদে গম্বুজে সাখরা প্রায় দেখে থাকি। এখান থেকে মাত্র দেড় শত মিটার দূরত্বে মূল মসজিদে আকসা। তার পশ্চিম পাশে বোরাকের স্থান। যেখানে বোরাক বাহনকে রাখা হয়েছিল।
রাসুল (সা.) গভীর রাতে মসজিদুল হারামের উম্মেহানি মতান্তরে হাতিম থেকে মসজিদে আকসায় আসেন। এখানে সমস্ত নবী-রাসুলকে নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। অতঃপর ঊর্ধ্বাকাশে মহান আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যে গমন করেন। আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে রাসুল (সা.) তাঁর উম্মতের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়ে আসেন, যা উম্মতে মুহাম্মদির জন্য ফরজ।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে রাসুল (সা.)-এর মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর এ ঘটনা ইসলামবিদ্বেষীরা সম্পূর্ণ মিথ্যা অবান্তর বলে আখ্যায়িত করতে থাকে।
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর রাসুল (সা.) বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও গোত্রপ্রধানদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি প্রেরণ করেন। তেমনি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে পত্র পাঠান। ওই সময় তিনি জেরুজালেমে অবস্থান করেছিলেন। পত্রবাহক মহান সাহাবা দাহয়িয়া ইবনে কালবি (রা.) জেরুজালেম পৌঁছেন। সম্রাট দোভাষীর মাধ্যমে চিঠি পড়ে আরব ও রাসুল (সা.)-এর অবস্থা জানতে জেরুজালেমে কোনো আরবীয় বণিক থাকলে তাদের দরবারে হাজির করতে নির্দেশ দেন। ওই সময় ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে কয়েকজন সঙ্গীসহ আবু সুফিয়ান জেরুজালেম অবস্থান করছিলেন। আবু সুফিয়ানকে সদলবলে সম্রাটের দরবারে হাজির করা হয়।
সম্রাটের ১০/১২টি প্রশ্নের মধ্যে আবু সুফিয়ান অন্য সব প্রশ্নের জবাব সঠিক দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু মিরাজের ঘটনাকে টেনে এনে এটাকে মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক অগ্রহণযোগ্য বলেন সম্রাটকে। এ সময় সম্রাটের পেছনে দাঁড়ানো লাট পদবি প্রধান জাজক ও পণ্ডিত মিরাজের ঘটনা সত্য বলে দৃঢ়কণ্ঠে বলেন। এতে সম্রাট হতচকিত হয়ে বিষয়টি জানতে চান। ফলে প্রধান জাজক মিরাজের রাতে মসজিদে আকসার সব দরজা বন্ধ করতে পারলেও কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া একটি দরজা বন্ধ করতে অক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত দরজা খোলা রাখতে হয়েছিল। কিন্তু ধর্মযাজক ভোরে এসে অবাক হন দরজায় কোনো ত্রুটি নেই। আর তা স্বাভাবিকভাবে খোলা ও বন্ধ করা যাচ্ছে।
ধর্মযাজক এও অনুধাবন করেন, এখানে রাতে অনেকের আগমন হয়েছে ইবাদতের উদ্দেশ্যে। অতএব তিনি পবিত্র মক্কা থেকে আগত আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) ছাড়া আর কেউ নন।
ধর্মযাজকের কথা শুনে আবু সুফিয়ান লজ্জিত হন, সম্রাট অভিভূত হন। প্রকৃতপক্ষে রাসুল (সা.)-এর অনেক মুজিজার মধ্যে মিরাজ অন্যতম। পবিত্র মিরাজে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীর উদ্দেশ্যে সালাম, রহমত ও বরকতের বাণী পৌঁছালেন। তোহফাস্বরূপ বরাদ্দ করা ৫০ ওয়াক্ত সালাত অনুরোধক্রমে কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত মঞ্জুর করে নেন। শবেমেরাজ পবিত্রতম রাত, এটি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বিস্ময়কর মুজিজা।
