মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো রমজান মাসে প্রতিদিন তোপধ্বনি দিয়ে সাহরি ও ইফতারের সময় জানিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষায় এটাকে ‘মিদফা আল-ইফতার’ (রমজান কামান) বলা হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে দুই শ বছর আগে মিসরের তোপধ্বনির প্রচলন শুরু হয়েছিল। যখন দেশটি উসমানীয় গভর্নর খোশ কদম শাসন করত।
আর তা হয়েছিল দুর্ঘটনাক্রমে। পরবর্তী সময়ে লেবাননসহ আরব দেশগুলোতে এটা জনপ্রিয়তা পায়।
লেবানিজ সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চার মহোত্তম সুযোগ মনে করা হয়। রমজানে লেবাননে আরবীয় সংস্কৃতিগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। এই সময়ে মসজিদে ও দেশের প্রাচীন সড়কগুলোয় ভিড় বাড়ে। জনসমাগমের স্থানে গণ-ইফতারের আয়োজন করা হয়। লেবাননের একটি রমজান সংস্কৃতি হলো ‘ইসতিবনাতু রামাদান’। এটা হলো পার্ক ও সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়ানো, যেন রমজানের চাঁদ দেখতে পারে এবং চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিতে পারে। নিকট অতীতেও যারা চাঁদ দেখত, তারা ‘দার আল-ফাতাওয়া’তে (রাষ্ট্রীয় ফতোয়া বিভাগ) গিয়ে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিত এবং প্রধান মুফতি তার ভিত্তিতে চাঁদ দেখার ঘোষণা দিতেন।
কিন্তু লেবাননে বিপুলসংখ্যক খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর বসবাস হওয়ায় মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায় পরস্পর দ্বারা প্রভাবিত। ফলে বহু খ্রিস্টানকে রোজা রাখতে ও ইফতারে অংশ নিতে দেখা যায়। বিপরীতে কোনো কোনো মুসলিম রোজার দিনে খ্রিস্টানদের সঙ্গে পানাহার করে। সূর্যাস্তের সময় ইফতার করা একটি সামাজিক আচারে পরিণত হয়েছে। এ জন্য মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিস্টান পরিবার, ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও সংগঠনগুলো ইফতারের আয়োজন করে থাকে। এই ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে লেবাননের প্রেসিডেন্ট, যিনি সাংবিধানিকভাবে একজন খ্রিস্টান হন, তিনি গণ-ইফতারের আয়োজন করেন। তাঁর আমন্ত্রণে সেখানে উপস্থিত হন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতা, রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় নেতারা।
লেবাননের ইফতার আয়োজনে থাকে মুখরোচক সব খাবার। মূল খাবারের সঙ্গে স্যুপ, সালাদ ও মিষ্টান্নকে অপরিহার্য মনে করে লেবানিজরা। ইফতারে লেবাননের জনপ্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে আছে মসুর ডালের স্যুপ, আরবীয় মিষ্টান্ন বাকলাভা, ফাতুশ সালাদ ইত্যাদি। এ ছাড়া জিলাব নামের একটি পানীয়ও লেবাননের মুসলিমদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। জিলাব তৈরি হয় আঙুর, চিনি ও গোলাপজল দিয়ে। চিনাবাদাম ও বরফযোগে তা পরিবেশন করা হয়। পরিবারের সব সদস্য মিলেই ইফতার প্রস্তুত করে। ফলে এই সময় একটি পারিবারিক আড্ডাও হয়।
লেবাননে রমজান মাসে সারা রাত দোকান খোলা থাকে, যেন মুসলিমরা তরতাজা রুটি, সবজি, ফল, মসলাসহ অন্যান্য খাবার কিনতে পারে। কেউ কেউ হোটেল-রেস্টুরেন্টে সাহরি তথা শেষ রাতের খাবার গ্রহণ করে। পরিবারের সদস্যরা ঘরে ও বাইরে দলবদ্ধভাবে ইফতার ও সাহরি গ্রহণ করে।
তথ্যসূত্র : উইগো ডটকম
